ঢাকা, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬

বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের নিকট বিনিয়োগকারীর খোলা চিঠি

২০২৬ আগস্ট ১০ ১৮:৫৮:৫০
বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খানের নিকট বিনিয়োগকারীর খোলা চিঠি

বিএসইসির মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয়, আপনার প্রতি শ্রদ্ধা এবং সন্মান রেখে বলছি, পুঁজিবাজারে আমার দীর্ঘ পথ চলার অভিজ্ঞতা থেকে দুই চারটা কথা আমি আপনাকে বলতে চাই -------

আমাদের পুঁজিবাজার মুলত একটা ডুবন্ত পুঁজিবাজার, দীর্ঘ পনের বছরে নানা অনিয়ম দুর্নীতি আর লুটপাটের কারনে এই বাজারে পুঁজি হারিয়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়েছেন , বাজারের প্রতি তাদের ঘৃণা সৃষ্টি হয়েছে এবং তারা বাজার ছেড়ে চলে গেছে । ২০১০ সালে যেখানে পুঁজিবাজারের বিও হিসাব ছিল ৩৩-৩৪ লাখ , ২০২৬ এ সেটা নেমে এসেছে ১৬-১৭ লাখে।

গত ১৫ বছর ধরে পুঁজিবাজারের দুরবস্থার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতি। এসব অনিয়মের মধ্যে অন্যতম ছিল আইপিও ও প্লেসমেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা।

একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় বিভিন্ন কারসাজি চক্র পুঁজিবাজারে নানা ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ লুটপাট করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থের বড় একটি অংশ পরবর্তীতে বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বাজারকে স্থিতিশীল ও গতিশীল করতে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের প্রণোদনা ও উদ্যোগ ঘোষণা করা হলেও সেগুলোর অধিকাংশই ছিল লোক দেখানো বা সাময়িক পদক্ষেপ। পুঁজিবাজারের মৌলিক সমস্যা চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এবং কার্যকর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বাজারে সুশাসন, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পুঁজিবাজার তার কাঙ্ক্ষিত গতি ও স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি। তাই গত ১৫ বছরেও দেশের পুঁজিবাজার একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব বাজার হিসেবে গড়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে।

মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয় , বর্তমান সরকার আপনার মতো একজন জ্ঞানী গুনী দক্ষ সৎ এবং যোগ্য ব্যাক্তিকে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসাবে নিয়োগ দেয়ায় আমরা বিনিয়োগকারীরা খুশী হয়েছি এবং নতুন করে আশায় বুক বেঁধেছি , আপনার পরিচালনায় বাজার ভালো হবে এবং আমরা আমাদের হারানো পুঁজি ফিরে পাবো।

আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, পুঁজিবাজার পরিচালনায় মূলত দুই ধরনের নীতি অনুসরণ করতে হয়। বাজার যখন তলানিতে নেমে যায়, তখন বাজারকে ঘুরে দাঁড় করাতে নিয়মনীতি কিছুটা শিথিল করে বিনিয়োগকারী ও বাজারকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতে হয়। অন্যদিকে বাজার যখন অতিমাত্রায় ‘বাবল’ অবস্থায় চলে যায়, তখন ধীরে ধীরে এসব সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে বাজারের লাগাম টেনে ধরতে হয়।

১৯৯৬ সালে বাজারে বড় পতনের পর বাজারকে পুনরুদ্ধারে বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অমনিবাসের মতো বিশেষ অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ, ক্যাপিটাল গেইনের ওপর এনবিআরের আরোপিত কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা, ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের নিয়ম শিথিল করা, কাগুজে শেয়ারকে ইলেকট্রনিক শেয়ারে রূপান্তরের উদ্যোগ, মার্জিন ঋণের অনুপাত বাড়ানো এবং ফোর্সড সেল বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ উল্লেখযোগ্য। এ ধরনের আরও বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ তখন বাজারকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছিল।

আমরা জানি পুঁজিবাজার ভালো করার বিষয়ে আপনি অনেক আন্তরিক। তাই আপনার জ্ঞাতার্থে বলতে চাই বাজার ভালো করতে হলে আপনাকে বাজারের প্রতি এবং বিনিয়োগকারীদের প্রতি কিছুটা নমনীয় হতে হবে। সেই সাথে বাজারের জন্য ভালো হয় এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং বাজারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আপনার যে সিদ্ধান্তের কারণে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না , সেগুলো হলো:

১. মার্জিন রুলের সংশোধনী নিয়ে আপনি সময়ক্ষেপন করছেন যে কারণে অনেক বিনিয়োগকারীই অপেক্ষায় আছেন সংশোধনী দেখে তারপর বিনিয়োগ করবে। এই জন্য বাজারের লেনদেন কমে গেছে বাজার ভালো হচ্ছে না । ২. মার্জিন রুলে আপনি পিবি রেশিও যোগ করতে চেয়েছেন , যেটার সাথে আমরা পরিচিত নই। তাই সেটা আমরা চাই না ।৩. আপনি বলেছেন বিএসইসির লাইসেন্সধারী ব্যাক্তি-প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ কোন সিকিউরিটিজ শেয়ার নিয়ে আলোচনা করতে বা এনালাইসিস দিতে পারবে না , যেটার কারণে অনেকেই মনঃক্ষুণ্ণ এবং আতংকিত হয়েছে ।৪. ম্যানুপুলেশন এবং স্পেকুলেশন হয় না এমন কোন পুঁজিবাজার বিশ্বের কোথাও নেই। অথচ এটাকে আপনি রোধ করতে চেয়েছেন ।৫. হঠাৎ হঠাৎ ট্রেড সাসপেন্ড করছেন যেটাতে বিনিয়োগকারীরা আতংকিত।৬. আইপিও ইস্যু ডিএসই এর উপর ছেড়ে দিয়েছেন যেটা করা মোটেও ঠিক হয়নি।৭. T+0 চালু করতে চেয়েছেন যেটা আমাদের কারোরই পছন্দ নয় , কারণ এতে বিনিয়োগকারী ক্ষতি গ্রস্থ হবে হাউজ মালিকগণ লাভবান হবে।৮. দুর্বল কোম্পানিকে বাজার থেকে ছাটাই করে ফেলতে চেয়েছেন যার কারণে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।৯. নতুন আইপিও আনতে চেয়েছেন, যেটা আমাদের কাম্য নয়, কারণ বর্তমানে বাজারে ডিমান্ডের চেয়ে সাপ্লাই অনেক বেশী ।

বাজার ভালো করতে হলে কিছু প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, সেগুলো হলো:

১. সংশোধিত মার্জিন রুল যেন পূর্বের যেকোন সময়ের চেয়ে ভালো হয়, বাজার বান্ধব হয়, সেভাবে চুড়ান্ত মার্জিন রুল তৈরী করতে হবে এবং সেখানে পিবি রেশীও বাদ দিতে হবে। সব শেয়ারই যেন মার্জিন পায় সেটার চেস্টা করতে হবে অথবা পিই রেশিও ৫০ যেসব কোম্পানীর সেই সমস্ত কোম্পানিকে মার্জিন সুবিধা দিতে হবে ।২. ক্যাপিটাল গেইনের উপর আরোপ করা এনবিআরে ট্যাক্স বাতিল করতে হবে। না হলে ক্যাপিটাল গেইনের পরিসীমা বাড়াতে হবে।৩. অডিটর ফার্ম গুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। যারা টাকা খেয়ে ভুয়া রিপোর্ট দিবে তাদেরকে পুঁজিবাজারের অডিটর তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে ।৪. প্রাক্তন চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ বলেছেন বাজার ভালো করতে হলে গ্যাম্বলারদের সাথে সমোঝতা করে চলতে হয়। বাজারের স্বার্থে সেটা করতে হবে।৫. এসএমই মার্কেট বন্ধ করতে হবে। মার্কেট থাকবে একটাই।৬. অনেক কোম্পানীর উদ্দোক্তা পরিচালক শেয়ার ধারনের ৩০% কোটা পুরণ করে নাই তাদেরকে ৩০% কোটা পুরণ করতে বাধ্য করতে হবে।৭. আইসিবির মাধ্যমে বাজারকে তারল্য সাপোর্ট দিতে হবে।৮. ফোর্সড সেলের আইন সংশোধন করতে হবে।৯. কোন কোম্পানি যে লাভ করবে তার নুন্যতম ৮০% ডিভিডেন্ড দিতে হবে। যে বছর লাভ করতে পারবে না সে বছরে রিজার্ভ থেকে ডিভিডেন্ড দিতে হবে।১০. কোন কোম্পানি শুধুমাত্র স্টক ডিভিডেন্ট দিতে পারবে না, যদি স্টক দেয় তাহলে সমপরিমাণ ক্যাশ ডিভিডেন্ট দিতে হবে।১১. মিউচ্যুয়াল ফান্ড গুলোর আয় করমুক্ত করতে হবে এবং মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে দেয়া কর রেয়াত সুবিধা বহাল রাখতে হবে ।১২. আইপিও আসার আগে কোন কোম্পানি প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু করতে পারবে না।১৩. ফেস ভ্যালুর নিচে থাকা শেয়ারের ক্ষেত্রে বাইব্যাক আইন চালু করতে হবে।১৪. এক্সপোজার সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।১৫. ব্যাংকের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কোন ব্যাংক তার CRR ( Cash Reserve Ratio ) এর ২৫ % পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে।১৬. পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।১৭. দেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনে আবার অমনিবাস একাউন্ট চালু করতে হবে।১৮. কোন শেয়ারের দাম বাড়লে যেমন কোয়ারি দেয়া হয়, দাম কমলেও কোয়ারি দিতে হবে।১৯. বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।২০. শেয়ারবাজারের স্বার্থে ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স, ডিভিডেন্ড ট্যাক্স, টার্নওভার ট্যাক্স এবং মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোর আয়কে কর মুক্ত করতে হবে।২১. বাজারের গড় লেনদেন ৩ হাজার কোটি টাকা না হওয়া পর্যন্ত মৌলভিত্তি বা মাল্টি ন্যাশনাল কোন কোম্পানিই আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আনা যাবে না।২২. বাজার ভালো করার জন্য প্রয়োজনে মার্কেট মেকার বা বাজার সৃষ্টিকারী তৈরী করতে হবে।মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয়, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে কেউ যদি মুনাফা না পায় তাহলে কোন নতুন বিনিয়োগকারী এই বাজারে আসবে না। যারা এখন আছে তারাও থাকবে না। মনে রাখবেন, যে ফুলে মধু নেই সেই ফুলে মৌমাছি বসে না । বিনিয়োগকারীরা যখন মুনাফা পাবে তখন পুঁজিবাজার নিয়ে রিকশায় চড়ে গল্প হবে, চায়ের দোকানে গল্প-আড্ডা হবে, ফেসবুক মিডিয়ায় আলোচনা হবে। তখন নতুন নতুন বিনিয়োগকারী আসবে, লেনদেনও বাড়বে, বিদেশী বিনিয়োগও আসবে, বাজার বাবল হবে, তাছাড়া বাজার ভালো হবে না । আশা করছি বিষয়টি আপনার দৃষ্টিগোচর হবে এবং আপনি বাজার ভালো করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। আমার এই কথাগুলোর মধ্যে কোন ভুলত্রুটি থাকলে সেটা ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন । আপনার সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করছি ।

মোঃ আব্দুল খালেক

পুঁজিহারা একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী

সহকারী অধ্যাপক

সরকারী সাঁড়া মাড়োয়ারী মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ

ঈশ্বরদী, পাবনা

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে