ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

শেয়ারবাজারে আস্থার সংকট, এবার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের ঢল

২০২৬ জুলাই ২৮ ১০:০০:৪৬
শেয়ারবাজারে আস্থার সংকট, এবার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের ঢল

নিজস্ব প্রতিবেদক: টানা তিন মাসের মন্দা কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের জাতীয় সঞ্চয়পত্রের বাজার। ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট, দীর্ঘদিনের শেয়ারবাজারের মন্দা এবং নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা—এই তিন কারণে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ আবারও সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে গত এপ্রিলে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৬০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরুতে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। বিশেষ করে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত টানা তিন মাস সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক ছিল। তবে এপ্রিলে বড় ধরনের উত্থানের ফলে বাজার আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে।

তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারিতে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা ঋণাত্মক ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা এবং মার্চে ঋণাত্মক ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকায় নেমে যায়।

এর আগে ডিসেম্বরে নিট বিক্রি হয়েছিল ৩৮৫ কোটি টাকা। নভেম্বরে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক ২৯৩ কোটি টাকা।

তবে অর্থবছরের প্রথম চার মাস—জুলাই থেকে অক্টোবর—সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রবণতা ছিল। এরপর কয়েক মাসের মন্দার পর এপ্রিলে এসে আবারও বড় ধরনের ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্র দেখা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, গত কয়েক মাসে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমতে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেক বিনিয়োগকারী নতুন করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। তবে আগামী ছয় মাসের জন্য বিদ্যমান মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে থাকা অনিশ্চয়তা অনেকটাই দূর করেছে।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশের মধ্যে অপরিবর্তিত থাকবে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় গত ২ জুলাই প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ আবারও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়েছেন। বিশেষ করে ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকে আমানতের সুদহার কিছুটা বাড়লেও ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। গত কয়েক বছরের আর্থিক অনিয়ম, দুর্বল ব্যাংকের সংকট এবং আমানতকারীদের উদ্বেগের কারণে অনেকেই বড় অঙ্কের অর্থ ব্যাংকে রাখতে স্বস্তি বোধ করছেন না।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরেই শেয়ারবাজারে প্রত্যাশিত গতি নেই। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মূলধন সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি তুলনামূলক ভালো মুনাফার আশায় সঞ্চয়পত্রকে বেছে নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, ব্যাংকিং খাতে এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীলতা আসেনি। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের সঞ্চয় করার সক্ষমতাও কমেছে।

তাঁর মতে, যাদের কিছু অর্থ সঞ্চয়ের সুযোগ রয়েছে, তারা এখন নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম খুঁজছেন। মূলধন হারানোর ঝুঁকি কম থাকা, প্রয়োজনে সহজে নগদায়নের সুযোগ এবং তুলনামূলক ভালো মুনাফা—এই তিনটি কারণ সঞ্চয়পত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ানোর পেছনে ভূমিকা রাখছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের অন্যতম বড় উৎস জাতীয় সঞ্চয়পত্র। তবে বর্তমানে সরকারের ঋণের প্রয়োজন আগের তুলনায় কমেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে সংশোধন করে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়।

তবে জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে সরকার নতুন করে যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, তার চেয়ে ৪২৯ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করেছে। ফলে এই সময়ে সরকারের নিট ঋণ ঋণাত্মক রয়েছে।

এ কারণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন বাজেটে সঞ্চয়পত্রের কর ব্যবস্থায়ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে নেওয়া হয় এবং সেটিকেই চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করা হয়।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, উৎসে কাটা কর আর চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচিত হবে না। বিনিয়োগকারীকে আয়কর রিটার্নের মাধ্যমে ওই কর সমন্বয় করতে হবে।

যদি কোনো বিনিয়োগকারীর প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কর কেটে নেওয়া হয়, তাহলে আবেদন করে অতিরিক্ত অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকবে। তবে এই নিয়মে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ ভোগান্তিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে যেসব বিনিয়োগকারীর টিআইএন নেই, অতিরিক্ত কর ফেরত পেতে তাদের নতুন করে টিআইএন নিতে হতে পারে। পাশাপাশি আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজনও হতে পারে।

অন্যদিকে নিয়মিত করদাতারা আয়কর রিটার্নের মাধ্যমে আবেদন করে অতিরিক্ত কাটা কর ফেরত নিতে পারবেন। যাচাই-বাছাই শেষে ১২০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রির ক্ষেত্রে গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করার অভিযোগও উঠেছে। এ ধরনের অভিযোগের পর দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা এবং ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজারে অনিশ্চয়তার প্রভাবেই সঞ্চয়পত্রের বাজারে নতুন করে গতি ফিরেছে। তবে ভবিষ্যতে মুনাফার হার, করব্যবস্থা এবং সরকারের ঋণনীতির পরিবর্তন সঞ্চয়পত্রের বাজারে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে