ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রক সীমা লঙ্ঘন, ঢাকা ইন্স্যুরেন্সে আর্থিক ঝুঁকির ইঙ্গিত

২০২৬ জুন ২৩ ১৮:৫০:০৮
ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ ও নিয়ন্ত্রক সীমা লঙ্ঘন, ঢাকা ইন্স্যুরেন্সে আর্থিক ঝুঁকির ইঙ্গিত

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি ঢাকা ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি ও ঝুঁকির বিষয় উঠে এসেছে। কোম্পানির নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান কাজী জহির খান অ্যান্ড কোং, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীতে “Qualified Opinion” প্রদান করেছে। পাশাপাশি প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে “Emphasis of Matter” উল্লেখ করে বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের নিয়ন্ত্রক সীমা অতিক্রম, দীর্ঘদিন গ্র্যাচুইটি তহবিলের জন্য পর্যাপ্ত সংস্থান না রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে রাখা এফডিআরের বিপরীতে অনিশ্চয়তা, অমীমাংসিত কর ও ভ্যাট মামলা, অবিতরিত লভ্যাংশ এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিভিন্ন হিসাব কোম্পানির আর্থিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে নিয়ন্ত্রক সীমা লঙ্ঘন

নিরীক্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বীমা শাখা কর্তৃক জারি করা এসআরও নং ২৮০-আইন/২০১৮ অনুযায়ী নির্ধারিত Expenses of Management সীমা অতিক্রম করেছে ঢাকা ইন্স্যুরেন্স।

২০২৫ সালে কোম্পানির প্রকৃত ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়েছে ১২ কোটি ৮১ লাখ ২৯ হাজার ৮২০ টাকা, যেখানে অনুমোদিত সীমা ছিল ১১ কোটি ৮০ লাখ ৭৯ হাজার ৫৮৬ টাকা। অর্থাৎ কোম্পানি অনুমোদিত সীমার চেয়ে ১ কোটি ৫০ হাজার ২৩৪ টাকা বেশি ব্যয় করেছে। নিরীক্ষকের মতে, এটি নিয়ন্ত্রক বিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

গ্র্যাচুইটি তহবিলে দীর্ঘদিন কোনো নতুন সংস্থান নেই

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কোম্পানি ২০১৮ অর্থবছর পর্যন্ত গ্র্যাচুইটি তহবিলের জন্য এককালীন ৬৭ লাখ টাকা সংস্থান করেছিল। তবে এরপর থেকে এ তহবিলের জন্য আর কোনো সমন্বয় বা নতুন সংস্থান করা হয়নি। ফলে কর্মচারী সুবিধা সংক্রান্ত দায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকের এফডিআর নিয়ে অনিশ্চয়তা

নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, কোম্পানির বিভিন্ন ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রয়েছে, যার কিছু ব্যাংক থেকে অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এ কারণে কোম্পানি এসব অকার্যকর বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকের এফডিআরের বিপরীতে সন্দেহজনক বিনিয়োগের জন্য সংস্থান করেছে। এছাড়া এসব এফডিআরের ওপর অর্জিত সুদ আয়ও স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বিষয়টি কোম্পানির ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহ ও বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অবিতরিত লভ্যাংশ ও সিএমএসএফে অর্থ স্থানান্তর

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনা অনুযায়ী, তিন বছর ধরে অবিতরিত বা অনাদায়ী নগদ লভ্যাংশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে (সিএমএসএফ) স্থানান্তর করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কোম্পানির অবিতরিত ও অনাদায়ী লভ্যাংশের পরিমাণ ছিল ৬৪ লাখ ৯৯ হাজার ৭২৭ টাকা (সুদ ব্যতীত)। এর মধ্যে ৫৪ লাখ ১২ হাজার ২০৮ টাকা ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল সিএমএসএফে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সুদের অর্থ পরবর্তীতে পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কোম্পানি।

সাধারণ বীমা করপোরেশনের সঙ্গে হিসাব মিলছে না

আর্থিক বিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ বীমা করপোরেশনের (এসবিসি) কাছে কোম্পানির নিট প্রদেয় দেখানো হয়েছে ৭ কোটি ৭৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭৩৫ টাকা।

তবে এ হিসাবের মধ্যে ৪ কোটি ২০ লাখ ৮১ হাজার ১৮৪ টাকা প্রাপ্য সমন্বয় করা হয়েছে। নিরীক্ষকদের মতে, এ হিসাব যথাযথভাবে যাচাই করতে পক্ষভিত্তিক লেজার মিলিয়ে পুনর্মিলন করা প্রয়োজন।

আইএফআরএস-১৭ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেই

নিরীক্ষকরা উল্লেখ করেছেন, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নির্দেশনা অনুযায়ী ভবিষ্যৎ সময়ে আর্থিক বিবরণী হালনাগাদ করার জন্য কোম্পানিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ নতুন হিসাবমান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোম্পানির প্রস্তুতি এখনও সম্পূর্ণ নয়।

দীর্ঘদিনের শেয়ার আবেদন অর্থ ঝুলে আছে

কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে ১ কোটি ১৭ লাখ ৫৭ হাজার ৬৪১ টাকা শেয়ার আবেদন অর্থ দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত অবস্থায় রয়েছে।

নিরীক্ষকরা জানিয়েছেন, এ অর্থের বিষয়ে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল-এর প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

অন্যান্য বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত হিসাব

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অন্যান্য বীমা ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোম্পানির কিছু পাওনা ও দেনার হিসাব দীর্ঘদিন ধরে বহন করা হচ্ছে। এসব হিসাবের বিপরীতে কোনো নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। ফলে হিসাবগুলোর যথার্থতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

কর ও ভ্যাট নিয়ে মামলা চলমান

কোম্পানির কর সংস্থান এবং অগ্রিম আয়কর সংক্রান্ত কিছু বিষয় এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। কারণ সংশ্লিষ্ট কর নির্ধারণ কার্যক্রম ও উচ্চ আদালতে দায়ের করা রিট আবেদন বিচারাধীন রয়েছে।

এছাড়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ভ্যাট-সংক্রান্ত মামলাও চলমান রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ

নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, উল্লিখিত বিষয়গুলোর কারণে তারা Qualified Opinion প্রদান করেছে। তবে Emphasis of Matter অংশে বর্ণিত বিষয়গুলোর জন্য তাদের মতামত পরিবর্তন করা হয়নি। অর্থাৎ আর্থিক বিবরণীতে উল্লেখিত এসব ঝুঁকি ও অমীমাংসিত বিষয় বিনিয়োগকারীদের বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

ঢাকা ইন্স্যুরেন্সের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে, কোম্পানিটি শুধু নিয়ন্ত্রক সীমা অতিক্রম করে ব্যয়ই করেনি, বরং গ্র্যাচুইটি তহবিল, ঝুঁকিপূর্ণ এফডিআর, অবিতরিত লভ্যাংশ, সাধারণ বীমা করপোরেশনের সঙ্গে হিসাব সমন্বয়, দীর্ঘদিনের শেয়ার আবেদন অর্থ এবং কর-ভ্যাট জটিলতার মতো একাধিক অমীমাংসিত বিষয় বহন করছে। এসব বিষয় দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যতে কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে