ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরাতে স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের ওপর জোর নতুন চেয়ারম্যানের

২০২৬ জুন ০৪ ১৮:৩৪:৩৫
শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরাতে স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের ওপর জোর নতুন চেয়ারম্যানের

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, দেশের শেয়ারবাজারে আরও ভালো ও মানসম্পন্ন কোম্পানি নিয়ে আসতে বিদ্যমান প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) অনুমোদন প্রক্রিয়াকে সহজ ও কার্যকর করা হবে। তার মতে, বর্তমানে আইপিও অনুমোদনের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ মাসুদ খানকে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরে বিকেলে বিএসইসি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে একটি কোম্পানি কী ধরনের সুবিধা পেতে পারে, সে বিষয়টি উদ্যোক্তাদের কাছে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। তালিকাভুক্তির সুফল সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরি হলে আরও বেশি প্রতিষ্ঠান বাজারে আসতে আগ্রহী হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, গত কয়েক বছরে অনেক প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে আসার আগ্রহ প্রকাশ করলেও বিভিন্ন কারণে শেষ পর্যন্ত তালিকাভুক্ত হয়নি।

সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে মাসুদ খান বলেন, এ বিষয়ে শুধু আলোচনা নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে ফলাফল দেখাতে চান তারা। ভবিষ্যতে কী করা সম্ভব হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

কর সুবিধা ও নীতিগত সমন্বয়ে গুরুত্ব

তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের ব্যবধান বাড়ানোর বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, শেয়ারবাজারের টেকসই উন্নয়নের জন্য বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, শেয়ারবাজার-সংক্রান্ত অনেক বিষয় একাধিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাত, শেয়ারবাজার এবং রাজস্ব নীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।

আগের কমিশনের পদক্ষেপ নিয়ে মন্তব্য

বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মাসুদ খান বলেন, এসব বিষয়ে তদন্ত ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আইন যেভাবে নির্দেশনা দেবে, কমিশন সেভাবেই পদক্ষেপ নেবে।

‘গল্প নয়, কাজ দিয়েই মূল্যায়ন করুন’

সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে নতুন চেয়ারম্যান বলেন, অতীতের কমিশনগুলোও নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—এমন সমালোচনার কথা তিনি শুনেছেন। তবে বর্তমান কমিশনকে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, এটি তাদের প্রথম সংবাদ সম্মেলন। তারা কী বলছেন তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা কী করছেন। এক বছর পর যদি কথার সঙ্গে কাজের মিল না পাওয়া যায়, তখন সমালোচনা করা যেতে পারে। তবে দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই ব্যর্থতার তকমা দেওয়া উচিত নয়।

মাসুদ খান আরও বলেন, শেয়ারবাজারের নানা সমস্যা ও বাস্তবতা সম্পর্কে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি লাফার্জহোলসিম সিমেন্টের (তৎকালীন) প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা হিসেবে দেশের অন্যতম বড় আইপিও পরিচালনায় সম্পৃক্ত ছিলেন। ফলে বাজারের অংশীজন ও মধ্যস্থতাকারীদের বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে তিনি পরিচিত।

জবাবদিহি ও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক

জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন বা সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি কমিশন বিবেচনা করবে।

তবে তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধু নেতিবাচক সংবাদ নয়, ইতিবাচক উন্নয়ন ও অগ্রগতির বিষয়গুলোও তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ অতিরিক্ত নেতিবাচক বার্তা অনেক সময় বাজারে আস্থার সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর প্রতিশ্রুতি

কমিশনের সদস্যদের সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কমিশনের সদস্যরা বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্র থেকে এসেছেন। ফলে কিছু ক্ষেত্রে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, যদি কোনো সময় ব্যক্তিগত স্বার্থ জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তাহলে সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট মহল অবশ্যই বিষয়টি তুলে ধরবে।

তথ্য প্রকাশে বাড়বে স্বচ্ছতা

আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে ব্যর্থ কোম্পানি এবং তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ বিষয়ে মাসুদ খান বলেন, কমিশনের কার্যক্রমে আরও বেশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।

তার মতে, ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ বৃদ্ধি করা হবে, যাতে বাজার-সংশ্লিষ্টরা সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে পারেন। তদন্ত কার্যক্রম এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আইএফআরএস অনুযায়ী প্রভিশন নিশ্চিতের আশ্বাস

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) অনুযায়ী যথাযথ প্রভিশনিং না করার অভিযোগ প্রসঙ্গে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, এ ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা বাড়ানো হবে।

তিনি বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন নিশ্চিত করতে আইএফআরএস অনুযায়ী যথাযথ প্রভিশনিং হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক ঝুঁকি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা লাভ করতে পারবেন।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে