ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬

মূলধন সংকট ও প্রভিশন ঘাটতিতে নাজুক অবস্থায় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক

২০২৬ জুন ০২ ২০:১৫:৩৪
মূলধন সংকট ও প্রভিশন ঘাটতিতে নাজুক অবস্থায় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক: আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ঘিরে একাধিক গুরুতর আর্থিক দুর্বলতা ও নিয়ন্ত্রক বিচ্যুতির তথ্য উঠে এসেছে। ব্যাংকটির নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান কেএম আলম অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস তাদের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ‘এমফ্যাসিস অব ম্যাটার’ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছে, বিভিন্ন খাতে মোট ৫ হাজার ৩৯৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদনের কারণে এই ঘাটতির স্বীকৃতি স্থগিত রাখা হয়েছে, ফলে ব্যাংকটি মুনাফা দেখাতে সক্ষম হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিনিয়োগ, অফ-ব্যালেন্স শিট আইটেম, অন্যান্য সম্পদ, নন-ব্যাংকিং সম্পদ, অন্যান্য ব্যাংকে স্থাপিত অর্থ এবং গ্র্যাচুইটি দায়ের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বহিঃনিরীক্ষক এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিনিয়োগ ও অফ-ব্যালেন্স শিট আইটেমের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ ৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা হলেও ব্যাংকটি সংরক্ষণ করেছে মাত্র ১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। ফলে এ খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৯৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। একই সঙ্গে ব্যাংকের নন-পারফর্মিং ইনভেস্টমেন্ট (এনপিআই) অনুপাত ১৭ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় চলতি বছরের জন্য কোনো লভ্যাংশ বিতরণযোগ্য নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষকরা আরও জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত বিনিয়োগ ১ হাজার ৯৭১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বেড়েছে। যদিও একই সময়ে ৫২৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে, পর্যাপ্ত মুনাফা না থাকায় শ্রেণিকৃত বিনিয়োগের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকটি মোট বিনিয়োগের ১৬ শতাংশেরও বেশি অংশ পুনঃতফসিল করেছে। নিয়ন্ত্রক নীতিমালার আওতায় এ পুনঃতফসিলীকরণ করা হলেও দীর্ঘ গ্রেস পিরিয়ড ও আদায় বিলম্বের কারণে নগদ প্রবাহ ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে প্রকৃত ঋণঝুঁকি আড়াল হওয়ার আশঙ্কাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে ১৫৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা প্রভিশন প্রয়োজন হলেও ব্যাংক সংরক্ষণ করেছে ৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। নন-ব্যাংকিং সম্পদের বিপরীতে ৩ কোটি ১ লাখ টাকা এবং তারল্য সংকটে থাকা অন্যান্য ব্যাংকে স্থাপিত অর্থের বিপরীতে ২০৬ কোটি ১৯ লাখ টাকার কোনো প্রভিশনই রাখা হয়নি। একইভাবে গ্র্যাচুইটি দায় ৪২৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা হলেও সংশ্লিষ্ট তহবিলে রয়েছে ৩৪২ কোটি টাকা। ফলে এসব খাতে মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৯৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল জারি করা এক চিঠির মাধ্যমে মোট ৫ হাজার ৩৯৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতি আপাতত স্বীকৃতি না দেওয়ার অনুমতি দেয়। এর ফলে ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণী সেই নির্দেশনা অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয়েছে।

নিরীক্ষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করে আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা হলেও এতে ব্যাংকের প্রকৃত ঋণঝুঁকি ও সম্ভাব্য ক্ষতির চিত্র পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। ব্যাংকটি ২০২৫ সালে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা দেখিয়েছে ৮৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা। তবে প্রয়োজনীয় সব প্রভিশন সংরক্ষণ করা হলে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী লোকসান দাঁড়াত ৫ হাজার ৩০৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা এবং মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) নেতিবাচক হয়ে যেত।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ‘প্রফিট রেন্ট সাসপেন্স’ হিসাব থেকে আদায় ছাড়াই ২০ কোটি টাকা আয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পাশাপাশি আয়করের বিপরীতে ২১ কোটি ৪০ লাখ টাকার প্রয়োজনীয় সংরক্ষণও করেনি। এর ফলে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ৪১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বেশি দেখানো হয়েছে।

মূলধন পর্যাপ্ততা সম্পর্কিত তথ্যে দেখা যায়, ব্যাংকটির সিআরএআর ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ১২ দশমিক ৫০ শতাংশের চেয়ে কম। ফলে এ খাতে ঘাটতি রয়েছে ৬৮৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। তবে প্রভিশন ঘাটতির পুরো অঙ্ক বিবেচনায় নিলে মূলধন পর্যাপ্ততা হার নেতিবাচক হয়ে যায়, যা ব্যাংকটির মূলধন অবস্থানকে অত্যন্ত দুর্বল হিসেবে নির্দেশ করে।

ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এআইবি ক্যাপিটাল মার্কেট সার্ভিসেস লিমিটেডের ক্ষেত্রেও প্রভিশন ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে। নিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগের বাজারমূল্য ১৪২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা কমে গেলেও সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ফলে প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ৯২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের অংশ ৫৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, কারণ প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যাংকের মালিকানা ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে বিএসইসির বিশেষ অনুমোদনের কারণে এই প্রভিশন ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে ‘অদার ম্যাটার’ অংশে নিরীক্ষক উল্লেখ করেছেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্পন্সর ও পরিচালকগণের সম্মিলিতভাবে পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বিধান থাকলেও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ, যা নিয়ন্ত্রক নির্দেশনার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে