ঢাকা, শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
Sharenews24

অনিশ্চয়তার মুখে গ্রামীণফোনের বিলিয়ন ডলারের ‘সালিশ’ প্রস্তাব

২০২৬ জানুয়ারি ৩১ ১৪:২৪:৩৪
অনিশ্চয়তার মুখে গ্রামীণফোনের বিলিয়ন ডলারের ‘সালিশ’ প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শীর্ষ টেলিকম অপারেটর গ্রামীণফোনের সাথে সরকারের কয়েক বিলিয়ন ডলারের যে রাজস্ব সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে, তা সালিশি বা আরবিট্রেশনের মাধ্যমে আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির পরিকল্পনা আপাতত থমকে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে এ বিষয়ে ইতিবাচক আগ্রহ দেখালেও জাতীয় নির্বাচনের আগে বড় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পথে হাঁটছে। মূলত বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) নিজস্ব আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি না হওয়ায় মীমাংসার এই পুরো প্রক্রিয়াটি এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

এই দীর্ঘস্থায়ী টানাপোড়েনের মূলে রয়েছে ২০১৯ সালের একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদন, যার ভিত্তিতে ১৯৯৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়কালের জন্য গ্রামীণফোনের কাছে প্রায় ১২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার রাজস্ব দাবি করে বিটিআরসি। এই বিশাল অঙ্কের পাওনার মধ্যে বিটিআরসির পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেরও (এনবিআর) বড় অংশ রয়েছে। গ্রামীণফোন এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে ওই বছরই ঢাকার আদালতে মামলা দায়ের করে, যা গত ছয় বছর ধরে ঝুলে আছে। এর মধ্যে আপিল বিভাগের নির্দেশে ২০২০ সালে ২ হাজার কোটি টাকা জমা দিলেও বাকি পাওনা নিয়ে এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।

গত বছরের জুলাই মাসে গ্রামীণফোন তাদের এই জটিল সমস্যাটি আদালতের বাইরে একটি বিশেষজ্ঞ সালিশি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সমাধানের আবেদন জানায়। কোম্পানির যুক্তি হলো, দেওয়ানি আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি প্রক্রিয়ার কারণে দ্রুত রায় পাওয়া কঠিন, যা বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তারা মনে করে, বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত সালিশের মাধ্যমে একটি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী সমাধান সম্ভব, যা সব পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে। তবে বিটিআরসির ভেতর এ নিয়ে দুই ধরনের আইনি পরামর্শ উঠে আসায় জটিলতা বেড়েছে।

বিটিআরসির একটি আইন উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান ‘জাস্টিসিয়ার্স’ মনে করে যে, সালিশ আইন ২০০১-এর আওতায় উভয় পক্ষের সম্মতিতে এটি সীমিত পরিসরে নিষ্পত্তি করা সম্ভব। এর বিপরীতে ‘ক্যাপিটাল ল চেম্বার’ এবং কমিশনের প্যানেল আইনজীবীরা এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতে, যেহেতু এটি টেলিযোগাযোগ আইনের অধীনে একটি বিধিবদ্ধ পাওনা, তাই এটি সাধারণ বাণিজ্যিক চুক্তির মতো কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নয় যে তা সালিশে যাবে। তারা আরও সতর্ক করেছেন যে, সালিশে গেলে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হতে পারে এবং ভবিষ্যতে রেগুলেশন বা নিয়মকানুন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এমদাদ উল বারী এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানিয়েছেন, তারা পুরো বিষয়টির অর্থনৈতিক ও আইনগত প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। সরকার শুরুতে গ্রামীণফোনের প্রস্তাবকে একটি ‘উইন-উইন সমাধান’ হিসেবে স্বাগত জানালেও এখন আইনগত ঝুঁকির কথা ভেবে আরও বিস্তারিত পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। বিশেষ করে সরকারি রাজস্বের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আদালতের বাইরে সালিশে নেওয়া কতটা নিরাপদ হবে, তা নিয়ে নতুন করে আইনজীবীদের মতামত চাওয়া হচ্ছে।

গ্রামীণফোনের পাশাপাশি একই ধরনের সংকটে রয়েছে রবি আজিয়াটা। ২০১৯ সালে তাদের বিরুদ্ধেও ৮৬৭ কোটি ২৪ লাখ টাকার নিরীক্ষা দাবি তোলা হয়েছিল। রবিও আদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে সেখানেও আইনি জটিলতা বিদ্যমান। সম্প্রতি ১১ জানুয়ারি গ্রামীণফোন মামলার মধ্যস্থতার একটি শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ২৬ এপ্রিল নির্ধারণ করা হয়েছে। রবির মামলার শুনানিও একইভাবে এপ্রিলে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে আইনি অনিশ্চয়তা ও সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দেশের দুই শীর্ষ অপারেটরের বিলিয়ন ডলারের এই অডিট বিবাদ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।

সালাউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে