ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
Sharenews24

ঋণখেলাপিদের ছবি ও পরিচয় জনসমক্ষে আনতে চায় ব্যাংকগুলো

২০২৬ জানুয়ারি ২৯ ২১:১৮:১৭
ঋণখেলাপিদের ছবি ও পরিচয় জনসমক্ষে আনতে চায় ব্যাংকগুলো

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংকিং খাতে জেঁকে বসা বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ উদ্ধারে এবার কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে ব্যাংকগুলো। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটাতে ঋণখেলাপিদের ছবি ও পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশের আইনি অনুমতি চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। মূলত ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতেই এবিবির পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবগুলো জমা দেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক শাখা পর্যায়ে খেলাপিদের তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিলেও ব্যাংক মালিকদের সংগঠন ‘বিএবি’-এর হস্তক্ষেপে ও আদালতের নির্দেশে তা স্থগিত হয়ে যায়। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালেও একই ধরনের চেষ্টা চললেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি ২০২১ সালেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সভায় এই প্রস্তাব উঠলেও শেষ পর্যন্ত তা ফাইলবন্দিই থেকে যায়।

বর্তমান ব্যাংকিং খাতের সংকট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে গভীর। গত ৭ ডিসেম্বর সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এবিবি চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিনের সই করা একটি চিঠি গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের কাছে পাঠানো হয়, যেখানে একগুচ্ছ কঠোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ১৮ লাখ তিন হাজার ৮৪০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকাই এখন খেলাপি। শতাংশের হিসেবে এটি মোট ঋণের প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০২৩ সালের শুরুতে যেখানে ঋণখেলাপির সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ লাখ ৮৬ হাজার জন, বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সেই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪.৮ গুণ বেড়েছে। এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরা মনে করছেন, দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা ও পদ্ধতিগত বাধা দূর না করলে এই বিশাল অর্থের পাহাড় উদ্ধার করা সম্ভব নয়।

এবিবির প্রস্তাবিত তালিকায় খেলাপিদের জন্য বেশ কিছু কড়া নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে। ব্যাংকগুলো চায়, আদালতের সুনির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া কোনো খেলাপি যেন বিদেশ ভ্রমণ করতে না পারেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার এবং নাম-ছবিসহ তালিকা প্রকাশের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। এছাড়া ঋণ আদায়ের মামলা নিয়ে উচ্চ আদালতে যাওয়ার আগে গ্রাহকদের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা ডাউন পেমেন্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ করে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) শ্রেণিবিভাগের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ পাওয়ার যে আইনি পথ রয়েছে, সেটি বন্ধ করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

আইনি লড়াইয়ের ধীরগতির কারণে ব্যাংকিং খাত এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত বছরের জুন পর্যন্ত তথ্যমতে, অন্তত এক হাজার বড় ঋণগ্রহীতার ১.৬৩ লাখ কোটি টাকার ঋণ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে খেলাপি হিসেবে দেখানো যাচ্ছে না। এমনকি রাজনৈতিক ময়দানেও এর প্রভাব স্পষ্ট; গত নির্বাচনে ৩১ জন প্রার্থী সিআইবি রিপোর্টের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে লড়েছেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবিবি প্রস্তাব করেছে যে, ব্যাংকগুলো যেন আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই খেলাপি ও তাদের জামিনদারদের ব্যাংক ব্যালেন্স, সম্পদের মালিকানা, আয়কর রিটার্ন এবং পাসপোর্টের তথ্য সরাসরি সংগ্রহ করতে পারে।

সবশেষে, ব্যাংকগুলো এই আইনের প্রয়োগ আরও শক্তিশালী করতে চায়। যে জেলাগুলোতে খেলাপির সংখ্যা বেশি, সেখানে বিশেষায়িত অর্থঋণ আদালত স্থাপন এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দ্রুত কার্যকরের দাবি জানানো হয়েছে। ঋণের গুরুত্ব বিবেচনা করে আটকের মেয়াদ বর্তমানের ৬ মাস থেকে বাড়িয়ে ৭ বছর করার প্রস্তাবও এসেছে। পাশাপাশি কারিগরি সংস্কারের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী খেলাপি ঋণের আংশিক রাইট-অফ বা অবলোপন এবং লিয়েন শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়া আরও সহজ করার কথা বলা হয়েছে। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় মৃত্যু, দুরারোগ্য ব্যাধি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ঋণ সমন্বয়ের শর্ত কিছুটা শিথিল করার আবেদনও রেখেছে এবিবি।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে