×
ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

তাহসিফের মৃত্যুতে মামলা না করার বিষয়ে যা বললেন বাবা

২০২৬ অক্টোবর ৩০ ১৯:১৭:৪০
তাহসিফের মৃত্যুতে মামলা না করার বিষয়ে যা বললেন বাবা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও পাইলট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় আপাতত মামলা করার কথা ভাবছে না তার পরিবার। মামলা করলে আদালতে দৌড়াদৌড়িসহ নানা ধরনের ঝামেলায় পড়তে হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন তাহসিফের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম।

তবে ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আন্তরিকভাবে কাজ করবে বলে আশা করছেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সময়ে মামলা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তাহসিফের বাবা।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন এ কে এম এনায়েতুল করিম।

মামলা করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলার ব্যাপারে আমরা এখনো ভাবিনি। আমরা পারিবারিকভাবে এটা আলোচনা করব, পরে সিদ্ধান্ত নেব। তবে মামলার কেন প্রয়োজন হবে? সরকার নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবে এবং অত্যন্ত আন্তরিক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

মামলা না করার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘মামলা মানেই তো আমাদের দেশে একটা ঝামেলা। কোর্টে দৌড়াদৌড়ি, কে চায় এই ঝামেলার মধ্যে পড়তে? যেখানে আমাদের চমৎকার সরকার রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে আমি ইতোমধ্যে লক্ষ্য করেছি, তারা অত্যন্ত দায়িত্ববান এবং অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।’

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তার বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তার বাবা। বিশেষ করে একজন সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাকে পুলিশের ধাওয়া করার দাবিকে অবিশ্বাস্য বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

এনায়েতুল করিম বলেন, ‘একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ধাওয়াতে দৌড় দেবে, এটা হাস্যকর বক্তব্য না? এটা তো প্রশ্নই আসে না।’

তিনি জানান, দীপের সঙ্গে তার ছেলের দীর্ঘদিনের পরিচয় ও সম্পর্ক ছিল। তাহসিফ চাকরির পাশাপাশি যে ছোট ব্যবসা পরিচালনা করতেন, সেটিও দীপ দেখাশোনা করতেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের ব্যবসার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।

তাহসিফের বাবা বলেন, দীপ মাঝেমধ্যে তাদের বাসায় আসতেন এবং পরিবারের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করতেন। এমনকি দীপের বাবা-মা ও ছোট ভাইও একবার তাদের বাসায় এসেছিলেন।

এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় ছায়াতদন্ত করতে গিয়ে দীপের দেওয়া বিভিন্ন তথ্যে অসংগতি পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার রাতের বিষয়ে দীপ বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তবে তার সব বক্তব্য তদন্তকারীদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। তাই প্রতিটি তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

শুক্রবার গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, ‘ছায়াতদন্তের একটা পর্যায়ে আমরা জানতে পেরেছি, সাউরি যেদিন রাতে নিখোঁজ হন, সেদিন তার সঙ্গে একজন বন্ধু ছিলেন। তার নাম দীপ। তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন। দীপ নানা তথ্য দিয়েছেন। আসলে সেই তথ্যগুলোর সব আমরা বিশ্বাসও করি না। প্রতিটি বিষয় আমরা যাচাই করে দেখছি।’

পিবিআইয়ের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, নিখোঁজ হওয়ার রাতে তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় অবস্থান করছিলেন। দীপের দাবি, সেখানে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। তবে পুলিশের ধাওয়ার ঘটনা কিংবা তাহসিফের নদে ঝাঁপ দেওয়ার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ওই এলাকায় পুলিশের একটি দল তাদের ধাওয়া করলে দীপ বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে লুকান। অন্যদিকে তাহসিফ নদে ঝাঁপ দেন বলে দীপ দাবি করেছেন। পরে সুযোগ বুঝে দীপ সেখান থেকে চলে যান এবং রাত আড়াইটার দিকে নিজের বাড়িতে ফেরেন।

ঘটনার রাতে তাহসিফ ও দীপ কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান।

তিনি বলেন, তারা ওই এলাকায় গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন। কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, সে বিষয়েও তথ্য দিয়েছেন। তবে সব তথ্য বিশ্বাস না করে যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

পুলিশের ধাওয়ার বিষয়ে দীপের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীপের দাবি, দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখে তারা দৌড় দিয়েছিলেন। তবে ওই ব্যক্তিরা প্রকৃতপক্ষে পুলিশের সদস্য ছিলেন কি না, তাদের কোনো দায়িত্ব ছিল কি না কিংবা তারা পুলিশের পোশাক পরেছিলেন কি না, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তাহসিফের বাবা জানান, নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে ছেলের কাছ থেকে তার মা একটি ছোট বার্তা পেয়েছিলেন। সেখানে তাহসিফ জানিয়েছিলেন, তিনি রওনা হয়েছেন এবং শিগগিরই বাসায় ফিরবেন। কিন্তু এরপর থেকে তার মোবাইল ফোনে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, ছেলের মা সারা রাত অপেক্ষা করেছিলেন। কিছুক্ষণ পরপর ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

পরদিন সকালে ছেলেকে বাসায় না পেয়ে তিনিও ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু ফোন বন্ধ পান। পরে দুপুরে তুরাগ থানায় গিয়ে খোঁজ নেন। সন্ধ্যার কিছু আগে উত্তরখান থানা থেকে ফোন করে তার পরিচয় নিশ্চিত করার পর জানানো হয়, রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তার ছেলের মরদেহ পাওয়া গেছে।

ছেলের আত্মহত্যার সম্ভাবনা নাকচ করে এনায়েতুল করিম বলেন, তাহসিফ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। তাই তার আত্মহত্যা করার কোনো কারণ দেখছেন না তিনি।

তার ভাষ্য, তাহসিফ সাধারণত বন্ধুদের সঙ্গে গুলশান-বনানী এলাকায় যেতেন। ওই এলাকায় যাওয়ার বিষয়ে পরিবারের জানা থাকলেও যে স্থানে তার মরদেহ পাওয়া গেছে, সেখানে তিনি কখনো গিয়েছেন বলে মনে করেন না।

ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য উদঘাটনে আন্তরিকভাবে কাজ করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। ওই দিন গভীর রাতে মাকে বার্তা পাঠিয়ে বাসায় ফেরার কথা জানালেও শেষ পর্যন্ত আর ফেরেননি তিনি।

পরদিন বুধবার বিকেলে রাজধানীর উত্তরখান থানাধীন রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।

তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে আসা বিভিন্ন তথ্য, দীপের বক্তব্য এবং পুলিশের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।

জাহিদ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর

উ
প
রে