×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

সম্পদের চেয়ে দেনা বেশি: অস্তিত্ব সংকটে আইএফআইসি ব্যাংক

২০২৬ অক্টোবর ২৭ ১৭:৫৫:৪২
সম্পদের চেয়ে দেনা বেশি: অস্তিত্ব সংকটে আইএফআইসি ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক: আর্থিক সংকটের চরম অতল গহ্বরে পতিত হয়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি। একদিকে পাহাড়সম খেলাপি ঋণের বোঝা আর অন্যদিকে প্রকৃত আয়ের তীব্র খরা ব্যাংকটিকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ব্যাংকটির নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে পর্যাপ্ত নগদ অর্থপ্রবাহ তৈরি না হওয়ায় এর আর্থিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঋণাত্মক মূলধন ছাড়িয়ে গেছে হাজার কোটি টাকার ঘর। সহজ কথায়, ব্যাংকটিতে এখন সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের নিজেদের বলতে কানাকড়িও নেই।

এই গভীর সংকটের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে আদায় না হওয়া খেলাপি ঋণের পাহাড়। বিতরণের পর ঋণগুলো সময়মতো পুনরুদ্ধার করতে না পারায় ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে গেছে। এর ফলে নিয়মিত সুদ আয় তো আসেইনি, উল্টো অনাদায়ী সুদ স্থগিত রাখতে হচ্ছে। এর ওপর যোগ হয়েছে খেলাপি ঋণের বিপরীতে বাধ্যতামূলক বিশাল অঙ্কের সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ। ফলশ্রুতিতে, একদিকে সুদ আয় তলানিতে ঠেকে লোকসান লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যাংকের সামগ্রিক সম্পদের মানও দ্রুত অবনতিশীল হচ্ছে।

চলতি হিসাব বছরের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংকটি ১ হাজার ৬৬৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বিশাল লোকসানের মুখে পড়েছে। অথচ এর আগের বছরের একই সময়ে লোকসানের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১২৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির লোকসান বেড়েছে ৫৪১ কোটি টাকার বেশি। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে শেয়ারপ্রতি লোকসানও ৫ টাকা ৮৭ পয়সা থেকে লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ৬৯ পয়সায়। সবচেয়ে ভীতিকর তথ্য হলো, ব্যাংকটির মোট দায় এখন এর মোট সম্পদকেও ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছরের ৩০ জুন শেষে ব্যাংকটির মোট দায় ঠেকেছে প্রায় ৫৯ হাজার ৮৯৯ কোটি ২৯ লাখ টাকায়, যেখানে বিপরীতে মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৮ হাজার ৮০০ কোটি ৬২ লাখ টাকা। অর্থাৎ সম্পদের তুলনায় দায় বেশি রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা, যার জেরে শেয়ারহোল্ডারদের মূলধন এখন পুরোপুরি ঋণাত্মক।

ঋণ বিতরণ করে সুদ আয় করাই ব্যাংকের মূল ব্যবসা হলেও, সেই মৌলিক খাতেই এখন ভয়াবহ ধস নেমেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির নিট সুদ আয় ঋণাত্মক ১ হাজার ৫৩৪ কোটি ৫০ লাখ টাকায় নেমে গেছে। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে সুদ আয়ের ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ৫৬৫ কোটি টাকা। শুধু ব্যবসায়িক আয় কমা নয়, বরং সম্পদের মানের অবনতিই ব্যাংকটির এই শোচনীয় লোকসানের পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে বলে আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে ব্যাংকের আদায়হীন ঋণের জাঁতাকলে পড়ে স্থগিত সুদের পরিমাণও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত পুঞ্জীভূত স্থগিত সুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৪০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যা আগের বছরের ৩১ ডিসেম্বরে ছিল ৩ হাজার ৭৩৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে স্থগিত সুদ ফুলেফেপে উঠেছে প্রায় ৬০৭ কোটি টাকা।

কাগজ-কলমের লোকসানের পাশাপাশি ব্যাংকের দৈনন্দিন নগদ অর্থের প্রবাহেও মারাত্মক টান পড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক হয়ে গেছে ৮২২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে এই নগদ প্রবাহ ছিল ইতিবাচক প্রায় ৯৬৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। নগদ প্রবাহের এই নেতিবাচক ধাক্কা স্পষ্ট হয়েছে শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহেও; আগের বছরের ৫ টাকা ১ পয়সার ইতিবাচক অবস্থান থেকে তা নেমে এসেছে ঋণাত্মক ৪ টাকা ২৮ পয়সায়। এর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে নতুন নগদ অর্থ তৈরির সক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

অন্যদিকে, ঋণের বিপরীতে মোটা অঙ্কের সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে ব্যাংকটি। গত ৩০ জুন শেষে ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে মোট সঞ্চিতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ২৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, যার মধ্যে শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট সঞ্চিতি রয়েছে প্রায় ৭৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে