ঢাকা, বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬

যার নামে মৃত্যুদণ্ড, তিনি নাকি আসামিই নন! 

২০২৬ আগস্ট ১২ ১৫:৫৮:০৮
যার নামে মৃত্যুদণ্ড, তিনি নাকি আসামিই নন! 

নিজস্ব প্রতিবেদক: কক্সবাজারে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, মামলার নথিতে যে ব্যক্তিকে ‘সোনা মিয়া’ নামে আসামি করা হয়েছিল এবং পরে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, তিনি ওই মামলার প্রকৃত আসামি নন। বরং ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি অন্য একজনের পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন বলে তদন্তে জানা গেছে।

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি নিজের নাম সোনা মিয়া বললেও তার প্রকৃত নাম রমজান। তিনি প্রকৃত সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনের কাগজ ব্যবহার করে পুলিশের কাছে নিজের পরিচয় দেন। সেই পরিচয়েই মামলার এজাহার, পরবর্তী তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যায়। এর ফলে প্রকৃত সোনা মিয়া নিজের অজান্তেই ওই মাদক মামলার আসামি হয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত তার নামেই মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়।

ঘটনার বিষয়টি আরও নাটকীয় মোড় নেয় চলতি বছরের ২৩ জুন। ওই দিন একটি ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে র‌্যাব-১৫ সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠায়। কিন্তু কারাগারে যাওয়ার দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই তিনি জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই এবং তিনি ওই মামলার আসামি নন।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের ২ মার্চ। ওই দিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে একজনকে মামলার এজাহারে ২ নম্বর আসামি হিসেবে ‘সোনা মিয়া’ নামে উল্লেখ করা হয়।

এজাহারে সোনা মিয়ার বাবার নাম নজির আহমদ, বর্তমান ঠিকানা কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবদিয়াপাড়া এবং স্থায়ী ঠিকানা রামু উপজেলার গর্জনিয়া উল্লেখ করা হয়।

পুলিশের নথি অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের সময় ওই ব্যক্তির কাছে থাকা একটি জন্মনিবন্ধনের ফটোকপির ভিত্তিতে তার পরিচয় সোনা মিয়া হিসেবে লেখা হয়। কিন্তু পরবর্তী তদন্তেই তার দেওয়া নাম ও ঠিকানা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২ নম্বর আসামি সোনা মিয়ার নাম-ঠিকানা যাচাই করতে কক্সবাজার সদর ও রামু থানার মাধ্যমে অনুসন্ধান করা হয়েছিল। কিন্তু অনুসন্ধানে তার দেওয়া পরিচয় ও ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি।

এমনকি তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, আসামির নাম-ঠিকানা সঠিক না হওয়ায় তাকে জেলহাজতে রেখে পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য আদালতের কাছে অনুরোধ করা হচ্ছে।

অর্থাৎ তদন্তের পর্যায়েই পুলিশের কাছে আসামির পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই সন্দেহের ভিত্তিতে প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা হয়নি বলে এখন প্রশ্ন উঠেছে।

পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন থাকার পরও মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলতে থাকে। ২০২২ সালের ১৩ জুন কক্সবাজার জেলা জজ আদালত থেকে ‘সোনা মিয়া’ জামিন পান। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান।

এরপর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত ‘সোনা মিয়াসহ’ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।

রায়ের পর পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৩ জুন র‌্যাব-১৫ ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। তাকে কারাগারে পাঠানোর পরই সামনে আসে নতুন তথ্য।

কারাগারে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে লিখিত আবেদন করেন। তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে যে মামলা রয়েছে, সেটির সঙ্গে তিনি সম্পূর্ণভাবে জড়িত নন।

জেল সুপার বিষয়টি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে অবহিত করেন। পরে আদালত ঘটনার সত্যতা যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন।

তদন্ত শেষে গত ২ জুলাই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম রমজান।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, রমজান ও প্রকৃত সোনা মিয়া একই সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরে তারা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় দীর্ঘদিন একই ঘরে বসবাস করেন।

কোনো একসময় প্রকৃত সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধনের কাগজ রমজানের কাছে থেকে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের সময় রমজান সেই জন্মনিবন্ধনের কপি ব্যবহার করে নিজেকে সোনা মিয়া হিসেবে পরিচয় দেন।

ফলে পুলিশের মামলার নথিতে রমজানের বদলে প্রকৃত সোনা মিয়ার নাম চলে আসে। একপর্যায়ে সেই ভুল পরিচয়ই আদালতের বিচারিক কার্যক্রমেও ব্যবহৃত হয়।

ঘটনাটি যাচাই করতে গিয়ে দুই সময়ের কারাগারের নথি ও ছবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারাগার সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির ছবি এবং ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার ছবির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

শুধু ছবি নয়, দুই ব্যক্তির পারিবারিক ও শারীরিক পরিচয়েও বেশ কিছু অমিল পাওয়া গেছে।

২০২০ সালের নথিতে বাবার নাম মৃত নজির আহমদ, মায়ের নাম সোনারা বেগম এবং স্ত্রীর নাম আয়েশা উল্লেখ করা হয়। সেখানে দুই ছেলে ও দুই মেয়ের কথাও রয়েছে। ওই ব্যক্তির উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং ওজন ৫০ কেজি উল্লেখ করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়ার নথিতে বাবার নাম একই হলেও মায়ের নাম মাহমুদা খাতুন এবং স্ত্রীর নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৪২ কেজি।

দুই ব্যক্তির শনাক্তকরণ চিহ্নেও রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য। ২০২০ সালের নথিতে বাম ও ডান গালে এবং ডান বাহুতে ক্ষত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে বর্তমান সোনা মিয়ার নথিতে ডান বাহু, পেটের বাম পাশে এবং পিঠের মাঝখানে তিল থাকার তথ্য রয়েছে।

ঘটনার পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে। কারণ, পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রেই বলা হয়েছিল যে ‘সোনা মিয়া’র নাম-ঠিকানা যাচাই করে সঠিক পাওয়া যায়নি।

তারপরও কীভাবে প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত না করেই মামলার বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে গেল, কীভাবে ওই ব্যক্তি জামিন পেলেন এবং পরবর্তী সময়ে প্রকৃত সোনা মিয়ার নামে মৃত্যুদণ্ডের রায় হলো—এসব বিষয় নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল মান্নানের মতে, মামলার শুরু থেকে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত তদন্তে গুরুতর গাফিলতি ছিল। কারও জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তি নিজের পরিচয় দিলে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার দায়িত্ব তদন্ত কর্মকর্তার—কিন্তু এই ঘটনায় তা যথাযথভাবে করা হয়নি বলে তিনি মনে করেন।

সোনা মিয়ার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জানিয়েছেন, তার স্বামীর বাড়ি মহেশখালীতে। তারা আগে কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকতেন এবং পরে চকরিয়ার ডুলহাজারায় চলে যান।

তার দাবি, স্বামীর বিরুদ্ধে আগে কোনো মামলা ছিল না এবং তিনি কখনো কারাগারেও যাননি। র‌্যাব তাকে গ্রেপ্তারের পরই তারা জানতে পারেন, ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের একটি মামলায় তার স্বামীর নাম রয়েছে।

জান্নাতুল ফেরদৌসের দাবি, তার স্বামী রোহিঙ্গা নন। কুতুবদিয়াপাড়ায় থাকার সময় রমজান নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল। সেই রমজানই ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি জানান, এতদিন তারা জানতেন রমজান ওই মামলায় কারাগারে আছেন। পরে জানতে পারেন, মামলায় রমজানের পরিবর্তে তার স্বামীর নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এখন তারা এ ঘটনায় ন্যায়বিচার চান।

আদালতের নির্দেশে পুলিশ ইতোমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলীও প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এ ঘটনায় প্রকৃত আসামি কে, কীভাবে পরিচয় বদলে মামলা ও বিচারিক কার্যক্রম এতদূর এগিয়ে গেল এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রকৃত সোনা মিয়ার বিষয়ে আদালত কী সিদ্ধান্ত নেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন আদালতের আদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। বুধবার (১২ আগস্ট) এ বিষয়ে আদালতে আদেশ দেওয়ার কথা রয়েছে।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে