ঢাকা, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

ফার্স্ট ফাইন্যান্সে গভীর আর্থিক সংকট, টিকে থাকা নির্ভর করছে নিয়ন্ত্রক সহায়তার ওপর

২০২৬ জুলাই ০৫ ১৬:২৪:১৪
ফার্স্ট ফাইন্যান্সে গভীর আর্থিক সংকট, টিকে থাকা নির্ভর করছে নিয়ন্ত্রক সহায়তার ওপর

নিজস্ব প্রতিবেদক : শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট ফাইন্যান্স পিএলসি-এর ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনে একাধিক গুরুতর অনিয়ম, আর্থিক দুর্বলতা এবং টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষক। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কাজী জহির খান অ্যান্ড কোং, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস-এর অংশীদার মোহাম্মদ আলমগীর কবির এফসিএ কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে ‘Qualified Opinion’, ‘Emphasis of Matter’, ‘Other Matters’ এবং ‘Material Uncertainty’ সংযুক্ত করেছেন।

নিরীক্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানি আর্থিক বিবরণীতে ক্যাশ রিজার্ভ রিকোয়ারমেন্ট (CRR) এবং স্ট্যাটিউটরি লিকুইডিটি রেশিও পরিপালনের দাবি করলেও ২০২১ সাল থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ আমানত, ঋণদাতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাওনা পুরোপুরি পরিশোধ করতে পারেনি। একই সঙ্গে এসএলআরের মধ্যে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস-এর কাছে পাওনা ২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এছাড়া এসব বিনিয়োগ থেকে দীর্ঘদিন কোনো সুদ আদায় না হওয়ায় অর্জিত সুদও আয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানির ঋণ ও লিজ পোর্টফোলিওর ৮৮.২৪ শতাংশ শ্রেণিকৃত (খেলাপি)। আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে ৫৮ কোটি ১৬ লাখ টাকার ঋণ অশ্রেণিকৃত রাখা হয়েছে; অন্যথায় মোট খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৯৬.০৩ শতাংশে পৌঁছাত। পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ ৩৭১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা, যা মোট পোর্টফোলিওর ৪৯.৭৩ শতাংশ। এর মধ্যে ৩৪৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এখনও শ্রেণিকৃত। অন্যদিকে পুনর্গঠিত ঋণ রয়েছে ৪০ কোটি ৩ লাখ টাকা, যার মধ্যে ২৭ কোটি ১ লাখ টাকা খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।

নিরীক্ষক আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ ছাড়ের আওতায় কোম্পানি ৪৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ঋণ ক্ষতি সংরক্ষণ (Loan Loss Provision) স্থগিত রেখেছে। যদিও কোম্পানি ৯৯.১৮ শতাংশ ক্রেডিট-ডিপোজিট রেশিও (CDR) দেখিয়েছে, তবে ৩৭ কোটি ১১ লাখ টাকার টার্ম ডিপোজিট দায় এবং ১১৩ কোটি ৭ লাখ টাকার সুদ পরিশোধযোগ্য দায় ‘ডিপোজিট’ হিসেবে না দেখিয়ে ‘অন্যান্য দায়’-এর আওতায় উপস্থাপন করায় প্রকৃত সিডিআর ভিন্ন হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন নিরীক্ষক। এছাড়া পুরো বছরে মাত্র ১২ কোটি ৪ লাখ টাকা মূল ঋণ আদায় হয়েছে, যা মোট ঋণ পোর্টফোলিওর মাত্র ১.৬১ শতাংশ। আরও ৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হলেও তা এখনো যথাযথ হিসাবে সমন্বয় করা হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বকেয়া ঋণ আদায়ের জন্য কোম্পানি আর্থ ঋণ আদালত আইন ও নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট-এর আওতায় ৯৭৫টি মামলা করেছে। এসব মামলায় জড়িত ঋণের পরিমাণ ৬৪৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, যা মোট ঋণ পোর্টফোলিওর ৮৬.৬০ শতাংশ। অর্থাৎ ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় পরিসরে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কোম্পানির উৎসে কর (Withholding Tax) বাবদ ৩৯ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক বাবদ ৪৩ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত সময়ে জমা দেওয়া হয়নি। এছাড়া আয়করের জন্য গৃহীত সংরক্ষণ সম্ভাব্য করদায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে না। এ অবস্থায় কোম্পানিটি আয়কর আইন, ২০২৩ এবং অন্যান্য আইনের আওতায় জরিমানা, সুদ ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলমান তারল্য সংকটের কারণে কোম্পানি মেয়াদোত্তীর্ণ আমানত ফেরত দিতে পারছে না। বর্তমানে ৩০৬ কোটি ৯১ লাখ টাকার আমানত উচ্চ সুদ বহন করছে, যা মোট আমানতের ৪৯.১১ শতাংশ। একই সঙ্গে জমাকৃত সুদ বেড়ে ১১৩ কোটি ৭ লাখ টাকা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বেশি। এছাড়া টিডিআর দায় রয়েছে ৩৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে কোম্পানির ঋণ ১২৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা। বছরে ১৩ কোটি ৭ লাখ টাকা অর্থায়ন ব্যয় হলেও মূল ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

মূলধন পর্যাপ্ততার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী ন্যূনতম ১২.৫০ শতাংশ CRAR বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও নিয়ন্ত্রক ছাড় বিবেচনায় নিয়েও কোম্পানির CRAR নেগেটিভ ৭১.১৮ শতাংশ। ফলে টিয়ার-১ মূলধনে ৫৯১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত মূলধন সংযোজনসহ কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া কোম্পানি ২ কোটি টাকার গ্র্যাচুইটি সংরক্ষণ করলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনুমোদন পাওয়ার পরও গ্র্যাচুইটি ফান্ড এখনো কার্যকর হয়নি এবং প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর কোনো নিরীক্ষাও হয়নি।

Emphasis of Matter অংশে নিরীক্ষক জানিয়েছেন, কোম্পানির নিজস্ব Core Business Solution (CBS) সফটওয়্যার ব্যবস্থায় সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, স্বয়ংক্রিয় সমন্বয় এবং আর্থিক তথ্য নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা রয়েছে। ফলে ঋণ তথ্য, সাবসিডিয়ারি লেজার এবং জেনারেল লেজারের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে এবং নিরীক্ষাকালে ব্যাপক ম্যানুয়াল সমন্বয় করতে হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন হিসাবের সরাসরি ব্যালেন্স নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি এবং ব্যাংক এশিয়ার একটি নিষ্ক্রিয় হিসাবের স্টেটমেন্টও নিরীক্ষকদের দেওয়া হয়নি।

Other Matters অংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী কোম্পানির Workers Profit Participation Fund (WPPF) ও Workers Welfare Fund (WWF) গঠন করা বাধ্যতামূলক হলেও তা এখনও করা হয়নি। পাশাপাশি ১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকার নন-ব্যাংকিং সম্পদ সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে কোম্পানির কাছে রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে Material Uncertainty অংশে নিরীক্ষক উল্লেখ করেছেন, ২০২৫ সালে কোম্পানির নিট সুদ আয় ঋণাত্মক ৫১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, অপারেটিং আয় ঋণাত্মক ৫১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা এবং অপারেটিং নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ছিল। এছাড়া শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি ঋণাত্মক ৫৪৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, সম্পদ-দায় পরিপক্বতা ব্যবধানও একই পরিমাণ ঋণাত্মক। ২০১৭ সাল থেকে কোম্পানি তীব্র তারল্য সংকটে রয়েছে এবং গত সাত বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নিয়ন্ত্রক সহায়তার আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, সম্ভাব্য IFRS-9 Expected Credit Loss বাস্তবায়নের প্রভাব এবং আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়ায় আমানত হ্রাস—সব মিলিয়ে কোম্পানির চলমান প্রতিষ্ঠান (Going Concern) হিসেবে টিকে থাকা নিয়ে উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে নিরীক্ষকের মতামত পরিবর্তন করা হয়নি।

প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী বাজারে ফার্স্ট ফাইন্যান্সের শেয়ার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্ক ও নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে প্রায় ৯০ শতাংশ খেলাপি ঋণ, নেগেটিভ মূলধন, দীর্ঘস্থায়ী তারল্য সংকট, মেয়াদোত্তীর্ণ আমানত পরিশোধে ব্যর্থতা, উচ্চ মূলধন ঘাটতি, কর বকেয়া এবং নিরীক্ষকের Qualified Opinion ও Material Uncertainty বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকির বিষয়ে আরও সচেতন করতে পারে। ফলে স্বল্পমেয়াদে শেয়ারটির ওপর বিক্রির চাপ বা দুর্বল বিনিয়োগ আগ্রহ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তা, মূলধন পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ আদায়ে অগ্রগতি এবং তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে