ঢাকা, শনিবার, ২ মে ২০২৬

শেয়ারবাজারের ১০ ব্যাংক নামছে জেড ক্যাটাগরিতে

২০২৬ মে ০২ ২৩:৩১:৪২
শেয়ারবাজারের ১০ ব্যাংক নামছে জেড ক্যাটাগরিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে ব্যাংক খাতে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। টানা দুই বছর ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে ব্যর্থ হওয়ায় আরও অন্তত ১০টি তালিকাভুক্ত ব্যাংক ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সর্বনিম্ন ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামতে যাচ্ছে, যা সাধারণত জাঙ্ক স্টক হিসেবে পরিচিত।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে এবি ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক। সিদ্ধান্তটি কার্যকর হলে এই ব্যাংকগুলো প্রথমবারের মতো সর্বনিম্ন ক্যাটাগরিতে পড়বে।

ডিএসইর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস থেকেই ব্যাংকগুলোকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামানো হবে।

এর আগে গেল সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক ও এসবিএসি ব্যাংককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামানো হয়।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক খাতে ডিভিডেন্ড না দেওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে শ্রেণিকৃত ঋণ ও বিনিয়োগের বিপরীতে বড় ধরনের প্রভিশন ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি থাকে তারা ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারে না।

নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণে বেশ কয়েকটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডিফারাল সুবিধা নিয়েছে, যার ফলে আর্থিক দায় কিছুটা স্থগিত থাকলেও তারা মুনাফা বণ্টন করতে পারছে না।

২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যাংকগুলোর চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এবি ব্যাংক প্রায় ৩,৮৮৯ কোটি টাকার লোকসান করেছে এবং প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৬,৮৭৪ কোটি টাকা। আইএফআইসি ব্যাংকের লোকসান ২,৫৬০ কোটি টাকা, প্রভিশন ঘাটতি ১৮,৫৫৭ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, কিছু ব্যাংক সামান্য মুনাফা করলেও চাপ কাটাতে পারেনি। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ২৩.২৫ কোটি এবং ওয়ান ব্যাংক ২৯.৮৪ কোটি টাকা মুনাফা করলেও তাদের প্রভিশন ঘাটতি যথাক্রমে ৫,০০০ কোটি ও ১,৭০০ কোটির বেশি।

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ৮৫ কোটি টাকা মুনাফার বিপরীতে প্রায় ৪,৯৯৮ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মুনাফা ১২১ কোটি হলেও ঘাটতি ২,১৬১ কোটি টাকা।

এনআরবি ব্যাংক ১৩.৮১ কোটি এবং এনআরবিসি ব্যাংক ১৩.২৫ কোটি টাকা মুনাফা করলেও তাদের প্রভিশন ঘাটতি যথাক্রমে ১৮০ কোটি ও ১,০০৬ কোটি টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংক প্রায় ৯৯৩ কোটি টাকার লোকসানের পাশাপাশি ৬,০৮৯ কোটি টাকার ঘাটতিতে রয়েছে।

রূপালী ব্যাংক ২৩.২৫ কোটি টাকা মুনাফা করলেও প্রভিশন ঘাটতি ১৪,০১৪ কোটি টাকা। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৮৪,৬১৫ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে, যদিও তারা ১৩৬ কোটি টাকা মুনাফা দেখিয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ডাউনগ্রেড ব্যাংক খাতের মৌলিক দুর্বলতা—বিশেষ করে কর্পোরেট সুশাসন, সম্পদের মান এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি—উন্মোচিত করছে।

‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়। এসব শেয়ারের ক্ষেত্রে টি+২-এর বদলে টি+৩ সেটেলমেন্ট, শুধুমাত্র নগদ লেনদেন এবং মার্জিন ঋণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাজারে তারল্য কমে যায়।

বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারে ৩৬টি ব্যাংক তালিকাভুক্ত। নতুন ১০টি ব্যাংক যুক্ত হলে জাঙ্ক ক্যাটাগরিতে মোট ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৫টি, যা মোট তালিকাভুক্ত ব্যাংকের প্রায় ৪২ শতাংশ।

এছাড়া, আরও পাঁচটি ব্যাংক—সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক—মার্জার প্রক্রিয়ার কারণে বর্তমানে লেনদেন স্থগিত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি এবং অতীতে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ বিতরণ এই সংকটের মূল কারণ। ২০২৪ সালের পর থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারিতে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

একজন জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক বলেন, খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ জরুরি হলেও এর খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। ডিভিডেন্ড কমে যাওয়ায় তাদের আয়ের পথ সংকুচিত হচ্ছে।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে