ঢাকা, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
Sharenews24

খাদের কিনারা থেকে প্রত্যাবর্তনের পথে পিপলস লিজিং

২০২৬ এপ্রিল ১১ ১৮:৫৩:৪৭
খাদের কিনারা থেকে প্রত্যাবর্তনের পথে পিপলস লিজিং

নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট কাটিয়ে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড। আদালতের তত্ত্বাবধান, বাংলাদেশ ব্যাংক-এর নজরদারি এবং নতুন ব্যবস্থাপনার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটি পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। তবে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে সরকারের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছে কোম্পানিটি।

সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)-এর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে পাঠানো এক ব্যাখ্যাপত্রে কোম্পানিটি তাদের বর্তমান অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাগির হোসেন খান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে জানানো হয়, ২০২১ সালের ১২ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনার আলোকে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে কাজ চলছে।

গত প্রায় পাঁচ বছরে কোম্পানিটি খেলাপি ঋণ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। একই সময়ে আমানতকারীদের প্রায় ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং বর্তমানে তৃতীয় ধাপের পরিশোধ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

কোম্পানির মতে, পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনার সময়কার অনিয়ম, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণই তাদের আর্থিক সংকটের মূল কারণ। এ বিষয়ে পরিচালিত ফরেনসিক অডিটে সাবেক পরিচালকদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য দায়ও চিহ্নিত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৭৫০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছে, যা পেতে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে।

পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কোম্পানিটি ঋণ পুনঃতফসিল, এককালীন সমঝোতা, আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে ঋণ আদায় এবং ব্যয় সংকোচনের মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে সীমিত পরিসরে ব্যবসায়িক কার্যক্রমও পুনরায় শুরু করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে প্রায় ২৫ কোটি টাকার সম্পূর্ণ জামানতভিত্তিক ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এসএমই ও সুরক্ষিত ঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

এছাড়া দায়কে ইকুইটিতে রূপান্তর, সাবেক উদ্যোক্তাদের শেয়ার যাচাই এবং অংশীজনদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে দায় পুনর্গঠনের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বকেয়া সব বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আদালতের অনুমোদনে সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি কঠোর নিয়ন্ত্রক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।

কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাগির হোসেন খান জানান, তারা সাবেক চার পরিচালকের কাছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে, যা ফরেনসিক অডিটে উঠে এসেছে। আদালতের মাধ্যমে এই অর্থ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই অর্থ উদ্ধার সম্ভব হলে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ধারাবাহিক পুনর্গঠন কার্যক্রম এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে আস্থা ফিরে পেতে পারে। তবে টেকসইভাবে পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে আর্থিক সহায়তা, শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর তদারকি অপরিহার্য।

সর্বশেষ আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত বছরে কোম্পানিটি কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। ২০১৪ সালে সর্বশেষ ১০ শতাংশ বোনাস ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৪ টাকা ৯৫ পয়সা। একই সময়ে ঋণাত্মক শেয়ারপ্রতি নিট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লো (এনওসিএফপিএস) হয়েছে ২২ পয়সা এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্য (এনএভিপিএস) ঋণাত্মক ১৪৯ টাকা ৫০ পয়সা।

২০০৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির বর্তমান ক্যাটাগরি ‘জেড’। মোট পরিশোধিত মূলধন ২৮৫ কোটি ৪৪ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং মোট শেয়ার সংখ্যা ২৮ কোটি ৫৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৯৭টি। ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত উদ্যোক্তাদের হাতে ১৮.১৫ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৯.২২ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে ০.৬৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৭১.৯৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

উল্লেখ্য, ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশের ৯টি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যার মধ্যে পিপলস লিজিং অন্যতম।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে