ঢাকা, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬
Sharenews24

ইরানের পাশে নেই মুসলিম দেশগুলো, কিন্তু কেন?

২০২৬ মার্চ ১৮ ১৫:০৫:১৪
ইরানের পাশে নেই মুসলিম দেশগুলো, কিন্তু কেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক: দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলার মুখে রয়েছে ইরান। সংঘাতের এই পরিস্থিতিতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অনেক দেশই প্রভাবিত হলেও মুসলিম বিশ্বের বড় অংশ কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর কেউই দৃশ্যত ইরানের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে না; বরং অনেকেই দেশটিকে নিজেদের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘প্যান-মুসলিম’ ঐক্যের ধারণা বাস্তবে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। সাম্প্রদায়িক বিভাজন, পারস্পরিক সন্দেহ, জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক—সব মিলিয়ে মুসলিম দেশগুলো ইরানের পক্ষে সক্রিয় অবস্থান নিতে অনাগ্রহী। তাছাড়া অনিশ্চিত পরিণতির যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তারা নিতে চাইছে না।

দীর্ঘদিন ধরে তেহরান নিজেকে মুসলিম বিশ্বের অভিভাবক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। তবে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রমজান মাসের মধ্যেই আরব দেশগুলোর দিকে হামলার অভিযোগ ইরানের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

পারমাণবিক শক্তি অর্জন এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইরানকে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দ্বন্দ্বে রেখেছে। সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে আরব দেশগুলোতে ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ অনেকের চোখে কৌশলগত ভুল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাস্তবে মুসলিম বিশ্ব কোনো একক রাজনৈতিক সত্তা নয়—প্রতিটি রাষ্ট্রই নিজস্ব স্বার্থে পরিচালিত হয়। ফলে শুধুমাত্র ধর্মীয় সংহতির ভিত্তিতে ইরানকে সহায়তা করার প্রবণতা খুব কম। উপরন্তু, ইরান আরব নয় এবং শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হওয়ায় সুন্নি-প্রধান দেশগুলোর সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক দূরত্বও এই অবস্থানকে প্রভাবিত করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংঘাতে ধর্মের ভূমিকা সীমিত হলেও সুন্নি-শিয়া বিভাজন মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার রাজনীতিতে এখনও গুরুত্বপূর্ণ। শিয়া অধ্যুষিত ইরান যখন সুন্নি দেশগুলোর সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়, তখন ঐক্যের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়ে।

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরান নিজেকে একটি আদর্শিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে এবং সেই আদর্শ অন্য দেশেও বিস্তারের চেষ্টা করেছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ গড়ে তুলে লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া ও ইরাকে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়েছে। তবে অনেক আরব দেশ এই কর্মকাণ্ডকে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখে।

এদিকে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ফলে ইরানের উত্থান তাদের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। যদিও ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়, সাম্প্রতিক সংঘাত সেই ভারসাম্যকে আবারও নড়বড়ে করে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আশঙ্কা করছে—ইরান তাদের অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক জোট ও কূটনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে, এমনকি কিছু দেশ ইসরাইলের কাছাকাছি চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতাও আগের তুলনায় কমে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সংঘাতে এসব গোষ্ঠী দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাবেও প্রভাব ফেলছে।

সর্বশেষ পরিস্থিতিতে ইরান ক্রমেই আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতি এখনো অনিশ্চিত হলেও এটি স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে এবং সেই প্রক্রিয়ায় ইরানের অবস্থান নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।

মিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে