ঢাকা, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Sharenews24

জাতীয় সংসদে কমছে আইনজীবী, বাড়ছে ব্যবসায়ী আধিপত্য

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ১১ ১৭:৪৯:২৫
জাতীয় সংসদে কমছে আইনজীবী, বাড়ছে ব্যবসায়ী আধিপত্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় সংসদে আইনজীবীদের ক্রমহ্রাসমান উপস্থিতি এখন আর কেবল একটি পরিসংখ্যানগত প্রবণতা নয়; এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে আইনজীবী প্রার্থীর সংখ্যা সামান্য বাড়লেও সামগ্রিক বাস্তবতায় জাতীয় রাজনীতিতে তাদের প্রবেশাধিকার ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে। নির্বাচনব্যবস্থার ব্যয়বহুল চরিত্র, রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়া এবং সংসদের কার্যক্রমের বাস্তব চর্চা মিলিয়ে আইনজীবীদের জন্য সংসদে জায়গা করে নেওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।

সংসদের মূল কাজ আইন প্রণয়ন হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ সংসদ সদস্য স্থানীয় উন্নয়ন, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার ও নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়েই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। এর ফলে আইনসভায় পেশাগত ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। আইনজীবীদের সংখ্যা কমে গিয়ে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর উপস্থিতি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন শুধু পেশাগত প্রতিনিধিত্বের সংকট তৈরি করছে না, বরং রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার মতো সমস্যাও বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংসদ যখন আইন প্রণয়নের কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে উন্নয়ন ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই অর্থশালী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রাধান্য বাড়ে। এতে আইন প্রণয়নে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত আইনজীবীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। নির্বাচনী রাজনীতির ক্রমবর্ধমান ব্যয়, এলাকায় শক্ত অবস্থান বজায় রাখার প্রয়োজন এবং পেশিশক্তিনির্ভর পরিবেশ একজন পেশাদার আইনজীবীর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনজীবীদের দাবি, কোটি কোটি টাকার নির্বাচনী সংস্কৃতিতে টিকে থাকা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ফলে সংসদে এমন প্রতিনিধির সংখ্যা কমছে, যারা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া গভীরভাবে বোঝেন। এর প্রভাব পড়ছে আইন প্রণয়নের মানে—গুরুত্বপূর্ণ অনেক আইন পর্যাপ্ত বিতর্ক ও বিশ্লেষণ ছাড়াই পাস হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য উদ্বেগজনক।

তাদের মতে, সংসদকে যদি কেবল আইন প্রণয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হতো এবং উন্নয়ন বা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ না দেওয়া হতো, তাহলে সংসদের চরিত্র ভিন্ন হতো। আইন প্রণয়ন যুক্তি, জ্ঞান ও বিশ্লেষণনির্ভর কাজ হওয়ায় সেখানে আইনজীবীদের স্বাভাবিকভাবেই বেশি প্রতিনিধিত্ব থাকত। সংসদ সদস্য হওয়ার প্রেরণাও তখন ব্যক্তিগত সুবিধা নয়, বরং নীতিনির্ধারণমূলক দায়িত্ব পালনের দিকে ঝুঁকত।

নির্বাচনী তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে আইনজীবী প্রার্থীর হার ১১ দশমিক ৫৬ শতাংশ, বিপরীতে ব্যবসায়ীদের হার ৪৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের অংশ ছিল ৪৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ২০১৪ সালের দশম নির্বাচনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৬ দশমিক ৯১ শতাংশ। ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের অংশ ছিল ৫১ দশমিক ২০ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচনে তা আরও বেড়ে হয় ৫৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যদিকে, একাদশ নির্বাচনে আইনজীবী প্রার্থীর হার ছিল ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং দ্বাদশ নির্বাচনে তা কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৪০ শতাংশে।

গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, নির্বাচনে অংশ নিতে আর্থিক সক্ষমতা এখন প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বল্প আয়ের বা অন্যান্য পেশার মানুষ বাস্তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পান না। তার মতে, সংসদ আইন সংস্কার ও নতুন আইন প্রণয়নের কেন্দ্র হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি; বরং সংসদ সদস্যরা স্থানীয় সরকারের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় নিয়ে বেশি সময় ব্যয় করেন।

সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, স্বাধীনতার পর সংসদে আইনজীবীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল, কারণ তখন সংসদকে মূলত আইন প্রণয়নের স্থান হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু যখন সংসদের সঙ্গে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যুক্ত হলো, তখন ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে গেল। তার ভাষায়, ব্যবসায়ীরা লাভকেন্দ্রিক মানসিকতা নিয়ে আইন প্রণয়নে যুক্ত হলে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নির্বাচন আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট মহসিন রশিদ মনে করেন, আইনসভায় আইনজীবীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ উপস্থিতি থাকা উচিত। আইন প্রণয়ন একটি বিশেষায়িত কাজ; এখানে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অপরিহার্য। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, জামিনযোগ্য মামলায় আসামিকে বিচারকালীন সময়ে হাজিরা সাপেক্ষে মুক্ত রাখা এবং বিচার শেষে প্রয়োজনে গ্রেপ্তার করার মতো বাস্তবসম্মত চিন্তা আইনজীবীদের মধ্য থেকেই আসে। তার প্রস্তাব, কমপক্ষে ৩০ শতাংশ মনোনয়ন আইনজীবীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা উচিত এবং সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা প্রয়োজন।

সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান বলেন, নির্বাচন এখন অবৈধ অর্থনির্ভর হয়ে পড়েছে। কালো টাকার ব্যবহার এবং ব্যাংক ঋণ অনাদায়ের সংস্কৃতি রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। আইনজীবীরা আইনি কাঠামোর মধ্যে থাকার চেষ্টা করেন বলেই এ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন।

বাংলাদেশ কংগ্রেসের মহাসচিব ও সাতক্ষীরা-১ আসনের প্রার্থী অ্যাডভোকেট ইয়ারুল ইসলাম বলেন, অনেক সময় ভোটাররাই এমন প্রার্থী চান, যিনি অনৈতিক সুবিধা দিতে সক্ষম। একজন আইনজীবী আইনবহির্ভূত সুবিধা দিতে পারেন না বলেই তারা পিছিয়ে পড়েন। তার মতে, দেশ পরিচালনায় সময়োপযোগী আইন প্রণয়নে আইনজীবীদের দক্ষতা অপরিহার্য।

বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, সংসদে আইন বোঝেন এমন প্রতিনিধির সংখ্যা সীমিত। আমলাদের তৈরি করা খসড়া আইন অনেক সময় যথাযথ পর্যালোচনা ছাড়াই পাস হয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, সংসদকে সংবিধান অনুযায়ী কেবল আইন প্রণয়নের জায়গায় ফিরিয়ে আনা এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই প্রবণতা বদলানো সম্ভব নয়। অন্যথায় সংসদে ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব অব্যাহত থাকবে এবং এমপি হওয়া ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম হিসেবেই বিবেচিত হবে।

সিরাজ/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে