ঢাকা, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Sharenews24

ভোটের উত্তাপে দেশের শেয়ারবাজার: সুযোগ নাকি ঝুঁকি?

২০২৬ ফেব্রুয়ারি ০৭ ১৪:৪৫:১৩
ভোটের উত্তাপে দেশের শেয়ারবাজার: সুযোগ নাকি ঝুঁকি?

সাইফুল ইসলাম পিপন: বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় একটি যুগোপযোগী বাস্তবতার জন্ম— ভোটের উত্তাপ আর বাজারের ওঠানামা একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে গেছে। গত কয়েকমাস ধরে যখন দেশে রাজনৈতিক আস্থাহীনতা, ধারাবাহিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক ইস্যু এবং ধীর গতি সেই সব বাস্তবতায় বিনিয়োগকারীদের মনোভাবকে প্রভাবিত করছিল, ঠিক তখনই রাজনীতির ভরাডুবি কিছুটা স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে এসেছে— এতে বাজারে কিছুটা আস্থা ফিরে আসার লক্ষণও দেখা গেছে।

সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ একটি উল্লেখযোগ্য উর্ধ্বমুখী রূপ ধারণ করেছে এবং লেনদেনের ভলিউমও বাড়েছে, বিশেষত ব্যাংকিং খাতে শক্তিশালী অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে— যা অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন নির্বাচন ঘিরে কিছুটা আশাবাদ থেকেই বাজারে দৃশ্যমান হয়েছে।

এই গতিশীলতার পেছনের গল্পটা কোথায়?

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে গত কয়েক বছরে সংকট দীর্ঘায়িত হয়েছে। বহু সময় নীতি-সংস্কার সীমাবদ্ধ রূপে থাকায় নতুন প্রাণ ফিরানো কঠিন হয়েছে। বাজারে আইপিও-র অভাব, তালিকাভুক্তির সংকট এবং কার্যকর মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি— এসব মিলিয়ে বাজারের নীচমুখী প্রবণতা দীর্ঘসময় ধরে বিরাজমান ছিল।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যখন তীব্র হয়, যেমন বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার পর শেয়ারবাজারে পতন লক্ষ্য করা গেছে— বিশেষত যখন রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও সামাজিক অস্থিতিত্ব বাজারে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বল্প মেয়াদে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমানোর মনোভাব নেন। এই নীচমুখী দৃশ্যপটের ঠিক পরেই যখন নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়েছে, বিনিয়োগকারীর মনস্তত্ত্বে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে এবং মার্কেট-বুলিশ সেন্টিমেন্টের ছোঁয়া দেখা গেছে।

সুযোগ কি আসলেই আছে?

হ্যাঁ— একটি নির্বাচনকে সামনে রেখে তৈরি হওয়া উত্তাপ বাজারকে কিছু স্বল্প মেয়াদি বৃদ্ধির সুযোগ দিতে পারে। প্রেক্ষাপটটা অনেকটাই এমন: রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও স্থিতিশীলতা প্রত্যাশায় বেশ কিছু বিনিয়োগকারী আবার অংশগ্রহণ করছেন, যা সূচকের বৃদ্ধির পেছনে একটি ব্যাকিং ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল শেয়ারবাজারে এটা প্রায় স্বাভাবিক যে, নির্বাচনের দিকে এগোলে বিনিয়োগকারীরা ‘আশা-ভিত্তিক অ্যাকিউমুলেশন’ শুরু করেন। তারা মনে করেন— নতুন সরকার যদি বাজারবান্ধব নীতি প্রচলন করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজারের উন্নয়ন দৃশ্যমান হবে। এছাড়াও কিছু বড়-ক্যাপ শেয়ার ও ব্যাংকিং সেক্টরের দিকে খেয়াল করে দেখা যাচ্ছে— এই অংশগুলোতে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হয়েছে।

কিন্তু ঝুঁকি কম নয়!

তবে সুযোগ থাকলেও ঝুঁকিগুলোও অস্বীকার করার নয়। প্রথমত, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি বাজারকে দ্রুত পতনের দিকে ঠেলে দিতে পারে— বিশেষত যদি রাজনৈতিক সহিংসতা বা অস্থিরতা আবার প্রকট হয়ে ওঠে। এমন সময় সূচকগুলো খুব দ্রুত নিচে নামতে পারে, কারণ বিনিয়োগকারীরা নীচের দিকে ঝুঁকি নিয়েই বাড়তি বিক্রিতে নামে।

দ্বিতীয়ত, এখনও পর্যন্ত বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ও বিদেশী বিনিয়োগের প্রবেশ খুব দৃঢ় নয়। অনেক বড় বিনিয়োগকারী এখনও অপেক্ষা করছেন— কেউবা আবার ভোটের ফলাফলের ওপর। এটা একটি ঝুঁকি-সম্মত পজিশন, কারণ দীর্ঘ-মেয়াদে বাজার উন্নয়নের জন্য টেকসই প্রবেশ দরকার। এই প্রবেশ না হলে ভলিউমের পুনরুদ্ধান স্থায়ী হবে না। তৃতীয়ত, নির্বাচন-সংক্রান্ত গুজব, ভুল তথ্য এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ বাজারে অতিরিক্ত ভলাটিলিটি সৃষ্টি করতে পারে, যা স্বল্প মেয়াদে বিনিয়োগকারীদের ভুল সিদ্ধান্তে ঠেলে দেয়।

আন্তর্জাতিক তুলনা: নির্বাচন এবং বাজারের সম্পর্ক

এখন যদি আমরা একটু আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তাকাই— শেয়ারবাজার ও নির্বাচনের সম্পর্ক সব দেশেই একই রকম হয় না। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যমেয়াদি নির্বাচনগুলোর আগেও বাজারে স্বাভাবিকভাবেই ওঠা-নামা দেখা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে ভোটের ফলাফল বাজারের উপরে স্থায়ী প্রভাব কম ফেলে।

ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য বড় নির্বাচনে দেখা গেছে— বাজার কিছু সময় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভলাটাইল থাকে, কিন্তু যখন ফলাফল ঘোষণা হয় এবং নীতি-ধারায় ধারাবাহিকতা দেখা যায়, তখন বাজার আবার দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এ ধরনের আন্তর্জাতিক উদাহরণ এসবই মনে করিয়ে দেয় যে— নির্বাচনের সময়কাল মাত্রই ঝুঁকি বাড়ায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাজারের ভিত্তিমূল্য, নীতি-ধারাবাহিকতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর।

সুযোগের সতর্কতা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভোটের উত্তাপে যে শেয়ারবাজারে কিছু স্বস্তির স্পন্দন দেখা যাচ্ছে, সেটা নিশ্চয়ই এক ধরনের সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু এই সুযোগের সঙ্গে আছে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি। বিনিয়োগকারীদের উচিত হবে বাজারের মৌলিক ভিত্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া— স্টক নির্বাচনে শুধু রাজনৈতিক উত্তাপকে নয়, কোম্পানির আয়, ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘ-মেয়াদে নীতি-স্থিতিশীলতা বিবেচনা করা।

সুপারিশটা খুব সহজ— অস্থির মনোভাব নয়, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ আর বাস্তব দৃষ্টিকোণ নিয়েই বাজারে পদক্ষেপ নেওয়া। কারণ ভোটের উত্তাপ অস্থায়ী— কিন্তু বাজারের মূল ভিত্তি স্থায়ী হলে সেই সুযোগই ভবিষ্যতের লাভে রূপান্তরিত হবে।

লেখক একজন শেয়ারবাজার বিশ্লেষক

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে