ঢাকা, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬
Sharenews24

ড্রোন, বাণিজ্য ও ভূরাজনীতি: ইউক্রেন–চীন সমীকরণে জটিল কৌশল

২০২৫ ডিসেম্বর ১৮ ১১:৫১:২৫
ড্রোন, বাণিজ্য ও ভূরাজনীতি: ইউক্রেন–চীন সমীকরণে জটিল কৌশল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর যখন ইউক্রেন একটি নবীন পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ করে, তখন চীনের কাছে দেশটির গুরুত্ব সীমাবদ্ধ ছিল কাঁচামাল সরবরাহে—আকরিক লোহা, শস্য ও সূর্যমুখী তেলের মতো পণ্যে। কিন্তু সময়ের প্রবাহে এই সম্পর্কের চরিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। পরিত্যক্ত সোভিয়েত অস্ত্রভান্ডার থেকে শুরু করে আধুনিক ড্রোননির্ভর যুদ্ধ—গত তিন দশকে কিয়েভ ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক ঘুরপাক খেয়েছে এক জটিল কৌশলগত বৃত্তে।

এই সম্পর্কের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় শুরু হয় ১৯৯৮ সালে, যখন ইউক্রেন সোভিয়েত আমলের বিশাল বিমানবাহী রণতরী ‘ভারিয়াগ’ চীনের কাছে বিক্রি করে দেয়। মাইকোলাইভ বন্দরে পড়ে থাকা এই জাহাজটি মাত্র ২০ মিলিয়ন ডলারে কেনে বেইজিং। সে সময় দাবি করা হয়েছিল, এটি ভাসমান ক্যাসিনো ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই জাহাজ রূপ নেয় চীনের প্রথম কার্যকর বিমানবাহী রণতরী লিয়াওনিং-এ—যা বিশ্ব প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের বিস্মিত করে।

একটি রণতরীতেই থেমে থাকেনি সহযোগিতা। চীনের আধুনিক প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে ইউক্রেনের কারিগরি অবদান ছিল নীরব কিন্তু গভীর। হেলিকপ্টার ও ভারী ট্যাংক ইঞ্জিনের নকশা, গ্যাস টারবাইন প্রযুক্তি, এমনকি নৌবাহিনী ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডার জ্ঞান—এসব ক্ষেত্রে কিয়েভের প্রযুক্তি চীনের সামরিক সক্ষমতাকে দ্রুত এগিয়ে দেয়।

ইউক্রেন পরবর্তীতে স্বীকার করে যে, এক পর্যায়ে তারা অবৈধভাবে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ছয়টি ‘কেএইচ-৫৫’ ক্রুজ মিসাইল চীনে পাঠিয়েছিল। এই প্রযুক্তি হস্তান্তর বেইজিংয়ের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে কয়েক দশক এগিয়ে দেয় বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকেরা।

বর্তমান রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ এই সম্পর্ককে পুরোপুরি নতুন মোড়ে নিয়ে গেছে। আজ ইউক্রেনীয় ড্রোন বিশেষজ্ঞরাই প্রকাশ্যে বলছেন, যুদ্ধের গতি অনেকাংশে নির্ভর করছে বেইজিংয়ের সিদ্ধান্তের ওপর। কিয়েভের ড্রোন যুদ্ধের অগ্রদূত আন্দ্রেই প্রোনিন আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, চীন চাইলে মাত্র একদিনেই যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারে—ড্রোন যন্ত্রাংশের রপ্তানি বন্ধ করলেই যথেষ্ট।

ইউক্রেনের আকাশে যে বিপুলসংখ্যক ড্রোন উড়ছে, তার প্রায় প্রতিটি অংশেই রয়েছে চীনা শিল্পের ছাপ। ফ্রেম, মোটর, ফ্লাইট কন্ট্রোলার, লিথিয়াম ব্যাটারি থেকে শুরু করে নেভিগেশন মডিউল—সবই উৎপাদিত হচ্ছে চীনের কারখানায়।

‘স্নেক আইল্যান্ড’ নামে একটি সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের ড্রোন শিল্প এখন কার্যত চীনা আমদানিনির্ভর। নিওডিমিয়াম ম্যাগনেট কিংবা থার্মাল সেন্সরের মতো কৌশলগত উপকরণে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য কিয়েভকে কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অবস্থানে ফেলেছে।

এই বাস্তবতায় ইউক্রেনের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, যুদ্ধ–পরবর্তী পুনর্গঠনে চীনই হতে পারে সবচেয়ে বড় কৌশলগত অংশীদার। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচের আমলে যে ‘কৌশলগত অংশীদারি’ শুরু হয়েছিল, কিয়েভ এখন সেটির আধুনিক ও বাস্তবমুখী সংস্করণ চায়।

এ ছাড়া চীনের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পে ইউক্রেনের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর–পূর্ব চীন থেকে মধ্য এশিয়া ও ককেশাস পেরিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর পথে ইউক্রেনকে একটি প্রধান লজিস্টিক হাব বা সেতুবন্ধনকারী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় বেইজিং।

তবে বিশ্লেষক ইগার তিশকেভিচের মতে, ইউরোপীয় বাজারে চীনের প্রবেশ সহজ করতে হলে ইউক্রেনকে সোভিয়েত আমলের চওড়া রেললাইন বদলে পশ্চিমা মানদণ্ডের ন্যারো গেজ ট্র্যাকে রূপান্তর করতে হবে।

যুদ্ধ চললেও বাস্তব বাণিজ্য থেমে নেই। চীন এখনো ইউক্রেনীয় ইস্পাত, ভোজ্য তেল ও সয়াবিনের অন্যতম প্রধান ক্রেতা। এই বাণিজ্যই যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনীয় অর্থনীতিকে ন্যূনতমভাবে সচল রাখছে।

বিশ্লেষক অ্যালেক্সি কুশ মনে করেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে ব্যর্থ হওয়া ইউক্রেনের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঐতিহাসিক ভুল হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, কিয়েভের কূটনীতি কেবল পশ্চিমমুখী হলে চলবে না; চীনসহ পুরো ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে হবে। সমরাস্ত্রের গোপন অতীত আর ড্রোননির্ভর অনিশ্চিত বর্তমান পেরিয়ে ইউক্রেন এখন এমন এক ভবিষ্যতের কল্পনা করছে—যেখানে দেশটি হবে পূর্ব ও পশ্চিমের বাণিজ্যিক সংযোগস্থল, যুদ্ধের সৈন্য নয়, চলবে পণ্যবাহী ট্রেন ও জাহাজ।

এমজে/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে