ঢাকা, রবিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৫
Sharenews24

ফাঁস হল আইএফআইসি ব্যাংকের ২৭ হাজার কোটির খেলাপি ঋণ

২০২৫ নভেম্বর ৩০ ২১:৫০:৪৩
ফাঁস হল আইএফআইসি ব্যাংকের ২৭ হাজার কোটির খেলাপি ঋণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বেসরকারি খাতের আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের উল্লম্ফন সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির মোট বিতরণকৃত ঋণের হার ১০ শতাংশ থেকে লাফিয়ে প্রায় ৬১ শতাংশে পৌঁছে গেছে। ব্যাংকিং রিফর্ম টাস্কফোর্সের নির্দেশে বিদেশি অডিট ফার্মের ফরেনসিক অডিট চলাকালীন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে পুরোনো লুকানো খেলাপি ঋণগুলো পুনরায় শ্রেণিবিন্যাস করায় এমন ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতার সময় বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী আইএফআইসি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন। যদিও ওই সময় এই বিপুল পরিমাণ ঋণগুলো মূলত খেলাপি হয়েছিল, কিন্তু সেগুলিকে তৎকালীন ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত দেখানো হয়েছিল।

ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস শেষে আইএফআইসি ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৭ হাজার ৫৫ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে, যা মোট ঋণের ৬০.৬৩ শতাংশ। গত বছর সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯.৯২ শতাংশ বা ৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে খেলাপি ঋণ ৫১৬.৪২ শতাংশ বা ২২ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা বেড়েছে।

সরকারের ব্যাংকিং রিফর্ম টাস্কফোর্সের সুপারিশে আইএফআইসি ব্যাংকের ওপর বর্তমানে একটি বিদেশি অডিট ফার্ম ফরেনসিক অডিট চালাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে অডিটররা ইতোমধ্যে সম্পদের গুণগত মান এবং ঋণের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস যাচাই করছেন। জানা গেছে, আওয়ামী লীগ আমলে ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালীন সালমান এফ রহমান তার ক্ষমতা ব্যবহার করে ২৯টি বেনামি প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যাংক থেকে ১৩ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিলেন, যার কোনো জামানত ছিল না। নিজস্ব ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় তিনি এই পন্থা অবলম্বন করেন।

এই ২৯টি বেনামি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩টিই খোলা হয় ২০২২ সালের জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে। এগুলোর বিপরীতে মাত্র এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়, যেখানে ব্যাংক যথাযথ ডিউ ডিলিজেন্স বজায় রাখেনি। এছাড়াও, পূর্বের ঋণের সুদ আদায় না করেই নতুন করে ঋণসীমা বাড়ানো হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে যে প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণের অর্থ ব্যবসায়িক কাজে না লাগিয়ে বেক্সিমকো গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করে, এবং সেসব ঋণের পুরোটাই বর্তমানে খেলাপির খাতায় চলে যাওয়ায় ব্যাংকের সামগ্রিক খেলাপি ঋণের পরিমাণ আকাশ ছুঁয়েছে।

খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আইএফআইসি ব্যাংক নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এই বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৫০ কোটি টাকা, যা গত বছরের সেপ্টেম্বরের মাত্র ৫৭৪ কোটি টাকার ঘাটতির তুলনায় প্রায় ১৮ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা বেশি। প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারার কারণে ব্যাংকটি বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতেও পড়েছে। গত জুন শেষে মূলধন ঘাটতি ছিল ৪ হাজার ৫১ কোটি টাকা।

প্রভিশন এবং মূলধন ঘাটতি কমানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ব্যাংকের কাছে একটি কর্মপরিকল্পনা চাইলেও, ব্যাংকটি এই ঘাটতি নিরসনের জন্য ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময় প্রয়োজন বলে জানিয়েছে—যা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এই ধরনের ব্যাংকগুলোকে ব্যাংক রেজুলেশন ডিপার্টমেন্টে (বিআরডি) পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) সুদ আয় না থাকায় ব্যাংকের লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা, যেখানে গত বছরের একই সময়ে ৭০ কোটি টাকা মুনাফা ছিল।

মূলত, এই ৯ মাসে ব্যাংকের নিট সুদ আয় ঋণাত্মক ১ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা হয়েছে, অর্থাৎ সুদ থেকে আয়ের চেয়ে সুদ ব্যয় বেশি হয়েছে, যার কারণে ব্যাংকটি বড় লোকসান করেছে। আইএফআইসি ব্যাংকের ডিএমডি ও মুখপাত্র রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর পটপরিবর্তনের পর ম্যানেজমেন্ট ঋণ পর্যালোচনা করে খারাপ ঋণগুলো চিহ্নিত করেছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করেছে।

তিনি দাবি করেন যে অনেকে বিদেশে পালানো বা আত্মগোপনে থাকায় ঋণ আদায় না হওয়ায় এই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তবে তিনি আশাবাদী যে ২৪টি মামলা করার পর কিছু টাকা আদায় শুরু হয়েছে এবং আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণ ৫০ শতাংশে নেমে আসবে।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে