×
ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারে বড় উত্থানের পূর্বাভাস গবেষণা প্রতিষ্ঠানের

২০২৬ অক্টোবর ১৯ ০০:২২:০০
পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারে বড় উত্থানের পূর্বাভাস গবেষণা প্রতিষ্ঠানের

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারে ৪৪ থেকে ৮১ শতাংশ পর্যন্ত দরবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএএল বাংলাদেশ। ব্যাংক খাতে সংস্কার কার্যক্রমের ফলে শক্তিশালী আর্থিক অবস্থানে থাকা ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ ও বাজার হিস্যা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক এবং পূবালী ব্যাংক।

‘ব্যাংকিং অন দ্য নেক্সট সাইকেল’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে সিএএল বাংলাদেশ সম্পদের গুণগত মান, মূলধন পর্যাপ্ততা, তহবিলের সক্ষমতা এবং ঋণ বিতরণের সামর্থ্য বিবেচনায় ১৪টি ব্যাংককে ‘সাইকেল-রেডি’ বা ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এসব ব্যাংক খাতটির চলমান আর্থিক পুনর্বিন্যাসের ধাক্কা সামলানোর পাশাপাশি ঋণের চাহিদা পুনরুদ্ধারের সুফল নিতে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।

প্রতিবেদনে পাঁচ ব্যাংকের সম্ভাব্য লক্ষ্যদরও উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৫ অক্টোবরের সমাপনী দর বিবেচনায় ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারের লক্ষ্যদর নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৭ টাকা ৪৫ পয়সা। ওই দিন শেয়ারটির সমাপনী দর ছিল ৬৫ টাকা। সে হিসাবে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ। সিটি ব্যাংকের লক্ষ্যদর ৪৮ টাকা ৩৬ পয়সা, যেখানে ভিত্তিমূল্য ২৯ টাকা ৭০ পয়সা; সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ।

ইস্টার্ন ব্যাংকের লক্ষ্যদর ৩৪ টাকা ৩৮ পয়সা, যা ২২ টাকা ৮০ পয়সার সমাপনী দরের তুলনায় ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের ক্ষেত্রে ৪৫ টাকা ৫০ পয়সা থেকে লক্ষ্যদর ৬৭ টাকা ২৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, ৩৮ টাকা ৮০ পয়সা সমাপনী দরের বিপরীতে পূবালী ব্যাংকের লক্ষ্যদর ৫৫ টাকা ৮৮ পয়সা, যা ৪৪ শতাংশ সম্ভাব্য উত্থানের ইঙ্গিত দেয়। এসব হিসাবের মধ্যে নগদ লভ্যাংশ থেকে সম্ভাব্য আয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

শক্তিশালী ব্যাংকের ঋণ সম্প্রসারণের সুযোগ

সিএএল বাংলাদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশন সংরক্ষণের কঠোর শর্ত ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। এর ফলে আমানত এবং ভবিষ্যৎ ঋণ সম্প্রসারণের সুযোগ তুলনামূলক ভালো মূলধনসম্পন্ন ব্যাংকগুলোর দিকে যেতে পারে।

২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের মোট অনুপাত দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২ দশমিক ২ লাখ কোটি টাকা। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সংকটে থাকা ১০টি ব্যাংকের হাতে ছিল মোট খেলাপি ঋণের ৭৪ শতাংশ। এতে ব্যাংক খাতের সম্পদের গুণগত সমস্যার কেন্দ্রীভবনের চিত্র উঠে এসেছে।

এর বিপরীতে, ‘সাইকেল-রেডি’ হিসেবে চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের মধ্যম অনুপাত ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ছিল ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ, যা গবেষণায় ব্যবহৃত ১২ দশমিক ৫ শতাংশের মানদণ্ডের চেয়ে বেশি। ওই সীমার অতিরিক্ত এসব ব্যাংকের মূলধনের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। ঋণের চাহিদা বাড়লে এই বাড়তি মূলধন ঋণ বিতরণ সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিএএল বাংলাদেশের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে ২০২৬ সালের জুনের তুলনায় দেশের বেসরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ ৬ দশমিক ২৩ লাখ কোটি টাকা বাড়তে পারে। প্রত্যাশিত এই ঋণ সম্প্রসারণের ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ আসতে পারে চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংক থেকে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যক্তি পর্যায়ের ঋণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) অর্থায়ন, ভোক্তা ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়তে পারে। পরবর্তী সময়ে করপোরেট ঋণ, আমদানি অর্থায়ন এবং বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট সেবায় গতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে সিএএল বাংলাদেশ বলেছে, ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি, এসএমই খাতে শক্তিশালী অবস্থান এবং মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশে অংশীদারত্ব ব্যাংকটির সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করছে। সিটি ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড, পেমেন্ট ও খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসার মাধ্যমে ভোক্তা ব্যয় পুনরুদ্ধারের সুফল পেতে পারে।

ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওতে পর্যাপ্ত প্রভিশন এবং লেনদেনভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রমকে প্রবৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। পূবালী ব্যাংকের দেশজুড়ে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঋণ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের কম খরচের আমানত এবং বিস্তৃত বিতরণ নেটওয়ার্ক অতিরিক্ত তারল্যকে ঋণে রূপান্তরের সক্ষমতা জোগাতে পারে।

সংকট ও সুদহারের সীমায় ঝুঁকিও রয়েছে

শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর সামনে সম্ভাবনা থাকলেও কয়েকটি ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছে সিএএল বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক সংকট থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে চাপ ছড়িয়ে পড়া, ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধানের ওপর নিয়ন্ত্রক সীমা এবং বড় করপোরেট গ্রাহকদের কাছে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূত থাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি লোকসান করেছে। এ ছাড়া ১৯টি ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত আইনগত ন্যূনতম সীমার নিচে ছিল। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুরবস্থা পুরো খাতে তারল্যচাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ঋণ ও আমানতের ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশে সীমিত রাখার বিধান কার্যকর করাও ব্যাংকগুলোর নিট সুদ আয় বা নেট ইন্টারেস্ট মার্জিনে চাপ তৈরি করতে পারে। সিএএল বাংলাদেশের হিসাবে, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৫৫টি ব্যাংক নির্ধারিত সীমার ওপরে ছিল। এ তালিকায় ‘সাইকেল-রেডি’ হিসেবে চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংকের মধ্যে ১৩টিও রয়েছে।

বড় করপোরেট ঋণগ্রহীতাদের কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত থাকাও আরেকটি ঝুঁকি। কোনো বড় ঋণ পুনর্গঠন করতে হলে কিংবা ঋণকে নতুন করে শ্রেণীকরণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রভিশন রাখতে হতে পারে। এতে কোনো কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েও সিএএল বাংলাদেশ মনে করছে, নিজস্ব মূলধনের বিপরীতে আয় বা রিটার্ন অন ইকুইটির তুলনায় সুপারিশ করা পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের মূল্যায়ন আকর্ষণীয়। তবে লক্ষ্যদর অনুযায়ী সম্ভাব্য মুনাফা অর্জন নির্ভর করবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি, ঋণের চাহিদা এবং ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান ও নিয়ন্ত্রক ঝুঁকি সামাল দেওয়ার সক্ষমতার ওপর।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর

উ
প
রে