×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পিংক বাসে প্রতিদিনই লোকসান, যাত্রী না পাওয়ার নেপথ্যে ৫ কারণ

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২২ ০৯:১৩:৩৯
পিংক বাসে প্রতিদিনই লোকসান, যাত্রী না পাওয়ার নেপথ্যে ৫ কারণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: নারীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করতে চালু করা বিআরটিসির ‘পিংক বাস’ সেবা এক মাস পার হলেও আশানুরূপ যাত্রী পাচ্ছে না। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচল করা এসব বাসের অধিকাংশ ট্রিপেই আসন ফাঁকা থাকছে। ফলে যাত্রীস্বল্পতার পাশাপাশি লোকসানও গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনকে (বিআরটিসি)।

গত ১৮ আগস্ট নারীদের জন্য ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু করে বিআরটিসি। একই দিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়া জেলায় ১৪টি পিংক বাস উদ্বোধন করা হয়। ভবিষ্যতে বাসের সংখ্যা ও রুট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষায়িত এই সেবা কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রাজধানীর জোয়ারসাহারা ডিপো থেকে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে একটি পিংক বাস ছাড়ার সময় যাত্রী ছিল খুবই কম। পরে আবদুল্লাপুর হয়ে মতিঝিলের পথে বিভিন্ন স্টপেজ থেকে কিছু যাত্রী উঠলেও অধিকাংশ আসন ফাঁকাই ছিল। ফার্মগেটে সকাল ৯টার দিকে প্রায় ১০ মিনিট যাত্রীর অপেক্ষায় বাসটি দাঁড়িয়ে থাকলেও মাত্র কয়েকজন যাত্রী ওঠেন। ৭৫ আসনের বাসটিতে ওই ট্রিপে প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন যাত্রী ছিল বলে জানান চালক।

রাজধানীর অন্যান্য রুটেও প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। শাহবাগ এলাকায় একটি পিংক বাসে অপেক্ষমাণ কয়েকজন নারী যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা সেবাটিকে স্বস্তিদায়ক মনে করলেও নিয়মিত বাস না পাওয়ার সমস্যার কথা জানিয়েছেন। ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজানা হক চৈতি বলেন, তিনি কয়েকবার পিংক বাসে যাতায়াত করেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, বাস বেশির ভাগ সময় ফাঁকা থাকলেও সেবার মান অন্যান্য গণপরিবহনের তুলনায় ভালো।

বাসসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে যাত্রীস্বল্পতার পেছনে অন্তত পাঁচটি কারণ সামনে এসেছে।

স্বল্প ট্রিপ ও অনিয়মিত সময়সূচি: পিংক বাসে যাত্রী কম হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সীমিত ট্রিপ ও সময়সূচি। একটি রুটে দিনে মাত্র এক বা দুটি ট্রিপ থাকায় অনেক যাত্রী প্রয়োজনের সময় বাসটি পান না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না চেয়ে তাঁরা বিকল্প গণপরিবহন ব্যবহার করেন। ফলে যাত্রী পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ে পর্যাপ্ত বাস না থাকায় সেই চাহিদা কাজে লাগছে না।

সীমিত রুট: রাজধানীর কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে প্রতিদিন একাধিক এলাকা অতিক্রম করে গন্তব্যে যেতে হয়। পিংক বাসের রুট ও চলাচলের পরিধি সীমিত হওয়ায় অনেকের যাতায়াতের সঙ্গে এসব রুটের মিল হচ্ছে না। ফলে বাসটি নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হলেও প্রয়োজনের সময় অনেক যাত্রীর জন্য এটি কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না।

অপর্যাপ্ত বাস: একটি রুটে পর্যাপ্তসংখ্যক বাস না থাকায় অপেক্ষার সময়ও বেড়ে যাচ্ছে। বিআরটিসি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে ১৩টি পিংক বাস চলাচল করছে। এসব বাস পরিচালনায় ১৫ জন নারী চালক ও ২৪ জন হেল্পার রয়েছেন। আরও ৩২ জন নারী চালক ও হেল্পার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাসের সংখ্যা বাড়ানো গেলে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমার পাশাপাশি সেবাটির ওপর আস্থাও বাড়তে পারে।

চালকসংকট ও দক্ষতার বিষয়: পিংক বাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নারী চালক ও হেল্পার দিয়ে পরিচালনা। তবে প্রয়োজনের তুলনায় নারী চালকের সংখ্যা এখনো কম। নতুন চালকদের একটি অংশ প্রশিক্ষণের মধ্যেও রয়েছেন। বিশেষ করে বড় বা দ্বিতল বাস চালানোর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা তৈরি হতে সময় লাগছে। ফলে জনবল সংকটের পাশাপাশি দক্ষ ও অভিজ্ঞ চালক তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রচার ও যাত্রীদের অভ্যাস: অনেক নারী এখনো পিংক বাসের রুট, সময়সূচি ও স্টপেজ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানেন না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। একই সঙ্গে অনেক নারী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে চলাচল করেন। ফলে শুধু নারীদের জন্য নির্ধারিত বাস সব ধরনের যাত্রায় তাঁদের জন্য উপযোগী হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পিংক বাস নিয়ে নেতিবাচক প্রচারের কথাও কিছু যাত্রী উল্লেখ করেছেন।

যাত্রীস্বল্পতার প্রভাব পড়ছে বিআরটিসির আয়ে। সংস্থাটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাজধানীর ১০টি রুট মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতে নারীদের জন্য চালু হওয়া কিছু বিশেষ বাসসেবা যাত্রীস্বল্পতার কারণে টেকসই হয়নি। সেই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন সেবার রুট, ট্রিপের সংখ্যা, সময়সূচি ও যাত্রীদের প্রকৃত চাহিদা আরও বিশদভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ে গবেষণা ও যাত্রীদের যাতায়াতের ধরন বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা করা গেলে পিংক বাসের বর্তমান সমস্যাগুলোর কিছুটা সমাধান হতে পারে।

এদিকে পিংক বাসের সংখ্যা ও রুট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে বিআরটিসি। সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মোস্তাকিম ভূঞা জানান, ভবিষ্যতে বাসের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমানে যাত্রীস্বল্পতা ও লোকসানের বিষয়ে বিআরটিসির প্রশাসন ও অপারেশন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে