ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

অকার্যকর তিন এনবিএফআই, অনিশ্চয়তায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা

২০২৬ আগস্ট ১১ ১৮:২২:৪০
অকার্যকর তিন এনবিএফআই, অনিশ্চয়তায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণায় অকার্যকর বা ‘নন-ভায়েবল’ হিসেবে চিহ্নিত তিনটি তালিকাভুক্ত ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়নের পথে রয়েছে। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো—ফারইস্ট ফাইন্যান্স, ফাস ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থের কতটা ফেরত পাবেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় অনিশ্চয়তা।

রোববার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা, আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের স্বার্থ রক্ষা এবং আর্থিক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘নন-ভায়েবল’ ঘোষণা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে সরাসরি অবসায়নের কথা উল্লেখ না থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর শেষ পরিণতি অবসায়নই হতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রতিষ্ঠান তিনটি দীর্ঘ সময় ধরে লোকসানে রয়েছে এবং তাদের দায়ও বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। ফলে সম্পদ বিক্রি করে সব দায় পরিশোধ করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে না। এ কারণে সরকারকে তারল্য সহায়তা দিতে হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়ন কার্যকর করতে সরকারের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দিতে পারে বলেও তিনি জানান।

এদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দেওয়া এক চিঠিতে সরকারের সম্ভাব্য তারল্য সহায়তা থেকে ‘ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের’ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। একই সঙ্গে এনবিএফআইগুলোর অবসায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বিএসইসিকেও সম্পৃক্ত করার দাবি জানিয়েছিল সংস্থাটি।

বিএসইসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যদি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ অবসায়নের মাধ্যমে বন্ধ করা হয় এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো অর্থ অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে এ বিষয়ে তাদের কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকবে না।

সাধারণ অবসায়ন প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে প্রথমে দায়-দেনা পরিশোধ করা হয়। সব দায় মেটানোর পর কোনো অর্থ অবশিষ্ট থাকলে তা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচ্য তিন এনবিএফআইয়ের সম্পদ দিয়ে দায় মেটানোর সুযোগ খুবই সীমিত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিএসইসির ওই কর্মকর্তা বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার যদি আর্থিক সহায়তা দেয়, তাহলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিষয়টিও ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, অবসায়নের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তা-পরিচালকেরা কোনো অর্থ পাবেন না। তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কিছু পাবেন কি না, তা শিগগির ঘোষণা হতে যাওয়া একটি বিশেষ স্কিমের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

এদিকে আরও ছয়টি এনবিএফআইকে অবসায়ন অথবা একীভূত করার বিষয়ে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে একটি তালিকাভুক্ত নয়—এমন প্রতিষ্ঠানকেও রোববার ‘নন-ভায়েবল’ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অবসায়নের অনিশ্চয়তার মধ্যেও আশ্চর্যজনকভাবে গত ডিসেম্বর থেকে চলতি জুন পর্যন্ত ফারইস্ট ফাইন্যান্সে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে কোম্পানিটির ৪৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকলেও চলতি বছরের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ দশমিক ৭৫ শতাংশে।

এ সময়ে ফারইস্ট ফাইন্যান্সের শেয়ারদরেও বড় ধরনের অস্বাভাবিক উত্থান দেখা যায়। ১২ জানুয়ারি থেকে ১৫ মার্চের মধ্যে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৯৫৪ শতাংশ বেড়ে ৩ টাকা ৯০ পয়সায় পৌঁছায়। পরে ১৩ জুলাই তা কমে ১ টাকা ১০ পয়সায় নেমে আসে। এরপর আবারও শেয়ারটিতে বড় উত্থান দেখা যায় এবং গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দর ১২৭ শতাংশ বেড়ে ২ টাকা ৫০ পয়সায় দাঁড়ায়।

ফাস ফাইন্যান্সের শেয়ারদরেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। জুন শেষে কোম্পানিটির ৭৮ দশমিক ১১ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ছিল। জুলাই শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৯ দশমিক ২২ শতাংশে।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ছিল। চলতি বছরের জুনে সেই অংশ বেড়ে ৪৪ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছায়।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, অবসায়নের পথে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পেছনে কারসাজির আশঙ্কা রয়েছে। অসাধু বিনিয়োগকারীরা কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে থাকতে পারেন এবং তাদের পেছনে অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারীও না বুঝে অনুসরণ করেছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মামুন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে