ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

সঞ্চয়কারীদের জন্য বড় ঘোষণা আসছে বাজেটে

২০২৬ মে ১৪ ০৮:৪৯:৩৮
সঞ্চয়কারীদের জন্য বড় ঘোষণা আসছে বাজেটে

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংকে জমা রাখা অর্থের ওপর আবগারি শুল্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কমে যাওয়া প্রকৃত সুদহার এবং ব্যাংক খাতে আস্থার সংকটের মধ্যে এই শুল্ককে অনেকেই সঞ্চয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ হিসেবে দেখছেন।

এমন প্রেক্ষাপটে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্কে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাবে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা থাকলে কোনও আবগারি শুল্ক দিতে হবে না। বর্তমানে এই সীমা ৩ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বিপুল সংখ্যক ক্ষুদ্র আমানতকারী সরাসরি উপকৃত হবেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ ঘোষণা দিতে পারেন। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, ব্যাংকিং খাতে সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখা এবং ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের স্বস্তি দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে ব্যাংক হিসাবে বছরে সর্বোচ্চ যে স্থিতি থাকে, তার ওপর ভিত্তি করে আবগারি শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ বছরের যেকোনও সময় হিসাবের ব্যালেন্স নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে সেই অনুযায়ী শুল্ক কাটা হয়।

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী: ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত জমায় কোনও শুল্ক নেই, ৩ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জমায় ৫০০ টাকা শুল্ক, এরপর ধাপে ধাপে শুল্কের পরিমাণ বাড়ে ৫ কোটি টাকার বেশি জমায় বছরে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়

নতুন প্রস্তাবে শুধু প্রথম স্তরের সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ৫ লাখ টাকার নিচে থাকলে কোনও আবগারি শুল্ক দিতে হবে না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, আপাতত ক্ষুদ্র আমানতকারীদের ওপর চাপ কমাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

দেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট, আর্থিক অনিয়ম এবং আস্থার ঘাটতিসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত সুদহারও কমে গেছে। ফলে সঞ্চয়কারীরা অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত লাভের বদলে ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

ব্যাংকারদের মতে, অনেক গ্রাহক আবগারি শুল্ক এড়াতে টাকা বিভিন্ন হিসাবে ভাগ করে রাখেন অথবা নির্দিষ্ট সীমার নিচে রাখার চেষ্টা করেন। এতে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে নগদ অর্থ রাখার প্রবণতা বাড়ে।

নীতিনির্ধারকদের ধারণা, শুল্কমুক্ত সীমা বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের আগ্রহ এবং ব্যাংকে অর্থ রাখার প্রবণতা বাড়তে পারে।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে সরকার বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা আবগারি শুল্ক আদায় করে। নতুন সীমা কার্যকর হলে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে সরকারের মতে, ক্ষুদ্র আমানতকারীদের স্বস্তি দেওয়া এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে আরও বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্কের সমালোচনা করে আসছেন। তাদের মতে, এটি সঞ্চয়কে উৎসাহিত করার বদলে নিরুৎসাহিত করে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-এর সিনিয়র গবেষক মনে করেন, আবগারি শুল্ক ধীরে ধীরে পুরোপুরি তুলে দেওয়া উচিত।তার ভাষায়, “ব্যাংকে টাকা রাখার জন্য মানুষকে এক ধরনের জরিমানা দিতে হচ্ছে। এটি ন্যায়সঙ্গত করব্যবস্থা নয়।”

তিনি আরও বলেন, আধুনিক সম্পদ কর বা ওয়েলথ ট্যাক্সভিত্তিক কাঠামো চালুর মাধ্যমে উচ্চ সম্পদের মালিকদের ওপর করের চাপ বাড়ানো যেতে পারে, তবে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের ওপর এমন শুল্ক আরোপ যৌক্তিক নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার আপাতত সীমা বাড়ানোর পথে হাঁটলেও ভবিষ্যতে পুরো আবগারি শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যাংকিং বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয়বান্ধব নীতির গুরুত্ব আরও বাড়বে।

তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয়ের ওপর নির্দিষ্ট শুল্কের পরিবর্তে আয় ও সম্পদভিত্তিক আধুনিক কর কাঠামো বেশি কার্যকর হতে পারে।

ওমর আলী/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

অর্থনীতি এর সর্বশেষ খবর

অর্থনীতি - এর সব খবর



রে