ঢাকা, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬
Sharenews24

ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে শেয়ারবাজারভিত্তিক শিল্পায়ন চায় সরকার

২০২৬ মার্চ ০৮ ২৩:০৬:৩২
ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে শেয়ারবাজারভিত্তিক শিল্পায়ন চায় সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শিল্পখাতে অতিরিক্ত ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শেয়ারবাজারভিত্তিক অর্থায়ন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহে উৎসাহ দেওয়া হবে। কে ব্যাংকঋণ পাবে আর কে শেয়ারবাজার থেকে অর্থ তুলবে— এ বিষয়ে নীতিগত কাঠামো তৈরি করা হবে। এজন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রূপান্তরমূলক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত শেয়ারবাজার বিষয়ক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। ‘শেয়ারবাজারের নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে শেয়ারবাজার বিষয়ক রিপোর্টারদের সংগঠন ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ)।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। এছাড়া বক্তব্য দেন বিএসইসি কমিশনার মো. সাইফুদ্দিন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান, অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ এবং বাংলাদেশ মার্চেন্টস ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমিত পোদ্দার।

সিএমজেএফ সভাপতি মনির হোসেনের সভাপতিত্বে আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সিনিয়র সহসভাপতি মনিরুজ্জামান। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সিএমজেএফের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব। বক্তারা বলেন, দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসেবে শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে একটি গভীর ও কার্যকর শেয়ারবাজার গড়ে তোলা জরুরি।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, শেয়ারবাজারকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে সর্বসাধারণের অংশগ্রহণমূলক একটি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ ‘ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে তারা সহজেই দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, মুসলিম বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে দেশের শেয়ারবাজারে ইসলামিক ফাইন্যান্স মার্কেট সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বাজারের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা জোরদার করতে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।

অডিট প্রতিষ্ঠান, সম্পদ মূল্যায়নকারী সংস্থা এবং ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, যারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে তাদের জন্য প্রণোদনা এবং অনিয়মকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারণ বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় অডিট প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করেই সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অডিট প্রতিবেদনে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ভালো দেখালেও পরে সম্পদ বিক্রি করতে গিয়ে তার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, অডিটরদের যথাযথ প্রত্যয়ন নিশ্চিত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) এবং বিএসইসিসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে শেয়ারবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।

তিতুমীর বলেন, অতীতে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো মূলত ভোগনির্ভর ছিল, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। একটি টেকসই অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি। শুধু ঋণনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কখনো স্থিতিশীল হতে পারে না। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন এবং জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নতুন সরকার সেই পরিবর্তন আনতে চায়।

তিনি জানান, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের শেয়ারবাজারকে ‘ফ্রন্টিয়ার মার্কেট’ থেকে ‘ইমার্জিং মার্কেট’-এ উন্নীত করার জন্য কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে— কাঠামোগত সংস্কার, ব্যবস্থাপনাগত সংস্কার এবং বাজারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের বাজার মূলধন জিডিপির মাত্র ১২ শতাংশ, যা প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় কম। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়িয়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে এনে একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ বলেন, কমিশন ইতোমধ্যে মোট ১২৬টি তদন্ত সম্পন্ন করেছে এবং এসব মামলায় প্রায় ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। তিনি জানান, জরিমানা পরিশোধের জন্য নয় মাস সময় দেওয়া হয় এবং অনেকেই আদালতে যাওয়ায় কিছু আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এনফোর্সমেন্ট বিভাগের মাধ্যমে তিন শতাধিক মামলার নিষ্পত্তি করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো ১৬টি মানি লন্ডারিংয়ের মামলা দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখিয়ে অর্থ থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়ম বন্ধে ব্যাংকের অফিস সফটওয়্যার ব্রোকারেজ হাউসে স্থাপন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ডিএসইর ২৮০টি ব্রোকারেজ হাউসে এই সফটওয়্যার বসানো হয়েছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, দেশে আইন অনেক থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এত আইন থাকা সত্ত্বেও কেন শেয়ারবাজার শক্তিশালী করা সম্ভব হয়নি। তার মতে, শেয়ারবাজারের কাঠামোগত ব্যবস্থাতেই কিছু সমস্যা রয়েছে।

তিনি বলেন, অতীতে বাজারে ধসের সময়ও বিভিন্ন কর প্রণোদনা কার্যকর ছিল। তাই শুধু কর সুবিধা দিলেই বাজার ভালো হবে— এমন ধারণা সঠিক নয়। অনেক কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হলেও বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে এমন কোনো কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়, যারা লভ্যাংশ দিতে সক্ষম নয়। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে যাতে কোনো প্রতিষ্ঠান মিথ্যা তথ্য দিয়ে শেয়ারবাজারে প্রবেশ করতে না পারে। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হারের পার্থক্য সাড়ে ৭ শতাংশ, যা তিনি বাজারের জন্য যথেষ্ট বলে উল্লেখ করেন।

মূল প্রবন্ধে মনিরুজ্জামান বলেন, দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় বর্তমানে তিনটি বড় সমস্যা রয়েছে— শেয়ারবাজারে তারল্য সংকট, ব্যাংকিং খাতে চাপ এবং কর আহরণ কম হওয়া। তবে এগুলো আলাদা সমস্যা নয়; বরং সঞ্চয় ও মূলধন বণ্টনের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার ফল।

তিনি শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়াতে বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ এবং ভালো মানের কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন। তার মতে, অনেক ভালো কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও তারা বাজারে আসতে আগ্রহী নয়, কারণ তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো সঠিকভাবে কর ও ভ্যাট পরিশোধ করলেও অনেক অতালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান নানা উপায়ে তা এড়িয়ে যায়। এতে প্রতিযোগিতায় বৈষম্য তৈরি হয়।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ আর্থিক ব্যবস্থায় ব্যাংক সাধারণত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অর্থায়ন করে, আর দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বড় অংশ আসে শেয়ারবাজার থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোকে একই সঙ্গে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করতে হচ্ছে, যার ফলে সম্পদ ও দায়ের মেয়াদের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে এবং আর্থিক ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। শেয়ারবাজার শক্তিশালী হলে ব্যাংকের ওপর এই চাপ কমবে বলে তিনি মনে করেন।

ডিএসই চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, গত ১৫ বছরে সরকার শেয়ারবাজারকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি, যা বাজারের অন্যতম বড় সমস্যা। তবে বর্তমান সরকার এ খাতকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান একেএম হাবিবুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতির সঙ্গে শেয়ারবাজারের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। একটি শক্তিশালী শেয়ারবাজার গড়ে তুলতে স্থিতিশীলতা, সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং আইনের শাসন— এই তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, শেয়ারবাজারের সব পর্যায়ে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। এতে স্টেটমেন্ট ও বিভিন্ন ডকুমেন্ট ডিজিটালভাবে জমা দেওয়া সহজ হবে এবং বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে।

সালাউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে