ঢাকা, সোমবার, ৫ জানুয়ারি ২০২৬
Sharenews24

চুক্তি ও ঋণের জালে বন্দি বিদ্যুৎ খাত: বিনিয়োগকারীদের বাড়ছে উদ্বেগ

২০২৬ জানুয়ারি ০৫ ১৭:৫৬:১৩
চুক্তি ও ঋণের জালে বন্দি বিদ্যুৎ খাত: বিনিয়োগকারীদের বাড়ছে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলো এখন শুধু আর্থিক দুর্বলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এদের ভবিষ্যৎ টিকে থাকা ও ব্যবসার ধারাবাহিকতাকে কেন্দ্র করে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরকারি ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) মেয়াদ শেষ হওয়া, নতুন চুক্তির অনিশ্চয়তা, উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ থাকা, আদায় অযোগ্য পাওনা এবং সম্পদের অতিমূল্যায়ন—সব মিলিয়ে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ও পরিচালনাগত পরিস্থিতি সংকটজনক হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক আর্থিক নিরীক্ষা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ১১টি কোম্পানির অন্তত পাঁচটির ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকি স্পষ্ট।

শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি জানিয়েছে, চুক্তি ও আর্থিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ণ করছে। তাই কোম্পানিগুলোকে সঠিক তথ্য প্রকাশ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ক্রয় চুক্তি ছাড়া বিনিয়োগ টেকসই নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক প্ল্যান্টের উৎপাদন ব্যয় বেশি, আর গ্যাস সংকট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। পিপিএ শেষ হওয়া প্ল্যান্ট চালু রাখা কঠিন। অডিট রিপোর্টে ‘গোয়িং কনসার্ন’ ঝুঁকি থাকলে তা বিনিয়োগকারীদের জানানো আবশ্যক।

এদিকে নিরীক্ষায় পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির আর্থিক অনিয়ম সবচেয়ে প্রকট। বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে ৪,৭১৫ কোটি টাকার ফরেন এক্সচেঞ্জ ক্ষতি মূলধনে যুক্ত করা হয়েছে, ২৭ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকার সম্পদ পরীক্ষা ছাড়া দেখানো হয়েছে এবং বিতর্কিত পাওনায় প্রভিশন রাখা হয়নি। সুদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনাতেও দুর্বলতা রয়েছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি ৮ ও ৫ টাকার বেশি লোকসান দেখা গেছে, ফলে কোম্পানিটি জেড ক্যাটাগরিতে নেমেছে।

পাওয়ার গ্রিডের নির্বাহী পরিচালক মো. মুনিরুজ্জামান জানান, ভেন্ডর চুক্তি সমস্যার সমাধান চলছে এবং প্রয়োজন হলে সুদ ব্যয়ের সমন্বয় করা হবে।

ডেসকোও বড় লোকসানের মুখোমুখি। ৫৬০ কোটি টাকার পাওনার মধ্যে ৩১১ কোটি প্রায় আদায় অযোগ্য। প্রভিশন রাখা হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। বাতিল গুলশান সাবস্টেশন প্রকল্প এখনো সিডব্লিউআইপিতে দেখানো হচ্ছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি। কোম্পানি সচিব মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান জানান, বিহারি ক্যাম্পে বিদ্যুৎ সরবরাহের বকেয়া ২৬৩ কোটি টাকা নিয়ে মামলা চলমান থাকায় প্রভিশনে নেওয়া হয়নি।

বারাকা পাওয়ার ১৫৫ কোটি টাকার বেশি জামানতহীন ঋণ দিয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জের ৫১ মেগাওয়াট রেন্টাল কেন্দ্রটি চুক্তি শেষ হওয়ায় ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে বন্ধ, কিন্তু সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ হয়নি। কোম্পানির এমডি ফাহিম আহমেদ চৌধুরী বলেন, সরকার হঠাৎ চুক্তি স্থগিত করায় প্ল্যান্ট বন্ধ রয়েছে।

খুলনা পাওয়ারের ইউনিট-২ ও ইউনিট-৩-এর পিপিএ ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। আগস্ট থেকে প্ল্যান্ট বন্ধ থাকায় সম্পদের মূল্যহ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। টানা পাঁচ বছরের লোকসানের কারণে কোম্পানিটি জেড ক্যাটাগরিতে রয়েছে।

ডরিন পাওয়ারের তিনটি গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের পিপিএ শেষ হয়ে ভবিষ্যৎ আয় অনিশ্চিত। গ্র্যাচুইটি ও দেনা-পাওনার হিসাব নিয়েও অডিটে প্রশ্ন উঠেছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, সরকারি ক্রয় চুক্তির অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অভাব বিদ্যুৎ খাতকে সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চুক্তি পুনর্নবায়ন ও বাজারমুখী উদ্যোগ ছাড়া উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষা সম্ভব নয়। এটি করলে কোম্পানিগুলো টেকসই হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে।

জুয়েল/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বিশেষ সংবাদ এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ সংবাদ - এর সব খবর



রে