ঢাকা, রবিবার, ৪ জানুয়ারি ২০২৬
Sharenews24

কাগজেই সীমাবদ্ধ অডিট রিপোর্ট: জালিয়াতি করেও ঋণ পাচ্ছে কোম্পানি

২০২৬ জানুয়ারি ০৪ ১৩:১৩:৫৮
কাগজেই সীমাবদ্ধ অডিট রিপোর্ট: জালিয়াতি করেও ঋণ পাচ্ছে কোম্পানি

নিজস্ব প্রতিবেদন: ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে অডিটর বা নিরীক্ষকরা গুরুতর অনিয়ম বা তথ্যের গরমিল খুঁজে পেলেও তার ভিত্তিতে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। অডিটরদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর এই চরম ব্যর্থতাই দেশে বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ জমার অন্যতম প্রধান কারণ। এই সুযোগে তালিকাভুক্ত এবং অতালিকাভুক্ত—উভয় ধরনের কোম্পানিগুলোই ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির দুঃসাহস দেখাচ্ছে।

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অডিট প্রতিষ্ঠান 'ডেলয়েট' এর স্থানীয় পার্টনার এস কে আশিক ইকবাল বলেন, কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা—কেউই অডিটরদের মতামতকে গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছে না। তিনি জানান, আর্থিক প্রতিবেদনে অসংখ্য অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও কোম্পানিগুলো ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে কোনো বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না। এমনকি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো বার্ষিক সাধারণ সভায় কোনো ঝামেলা ছাড়াই শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে অডিট রিপোর্টের অনুমোদন পেয়ে যাচ্ছে।

নিরীক্ষকরা বলছেন, তাদের কাজ হলো কোম্পানির ব্যবস্থাপনার তৈরি করা হিসাব যাচাই করা এবং সেখানে কোনো গোপন দায়, বাড়িয়ে দেখানো সম্পদ বা লেনদেনের প্রমাণের অভাব আছে কি না তা খুঁজে বের করা। কিন্তু বর্তমানে অডিট রিপোর্ট তৈরি করা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। আশিক ইকবাল আক্ষেপ করে বলেন, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং বোর্ডের অসহযোগিতার কারণে আমাদের কাজ এখন কেবল 'টিক চিহ্ন' বা 'ক্রস চিহ্ন' দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

এমএবিএস অ্যান্ড জে পার্টনার্সের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট সুলতান মাহমুদ জানান, কোম্পানিগুলো অনেক সময় জমির মালিকানার সঠিক নথিপত্র বা নামজারি দেখাতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে অডিটররা প্রতিবেদনে 'কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন' দেন। নিয়ম অনুযায়ী, কোম্পানির অডিট কমিটির দায়িত্ব হলো বোর্ডের কাছে ব্যবস্থাপনার এই গাফিলতি তুলে ধরা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অডিট কমিটিগুলো এই বিষয়ে নিশ্চুপ থাকে, এমনকি অনেক কোম্পানিতে অডিট কমিটিই নেই।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী মনে করেন, অডিটরদের আপত্তির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিএসইসি) বড় ভূমিকা থাকা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, কোনো কোম্পানি যদি মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন সাজায়, তবে বিএসইসি তাদের ডিভিডেন্ড প্রদানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। একইভাবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও ডিভিডেন্ড বিদেশে পাঠানোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা যেতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব ক্রেডিট পলিসি অনুযায়ী ঋণ দেয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত কোনো ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করে না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকগুলো যদি অডিট রিপোর্ট গুরুত্ব দিত, তবে 'কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন' থাকা কোম্পানিগুলো এত সহজে বিপুল অংকের ঋণ পেয়ে খেলাপি হতে পারত না।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকারি কোম্পানিগুলোও আর্থিক প্রতিবেদনে কারসাজি করার ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। উদাহরণ হিসেবে 'পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ'-এর ২০২৫ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টে দেখা যায়, ডিপিডিসি থেকে নেওয়া ৩.৫৯ বিলিয়ন টাকার ঋণের কোনো সঠিক নথি অডিটররা খুঁজে পাননি। মজার ব্যাপার হলো, ডিপিডিসি-র অডিট রিপোর্টে আবার এই টাকার কোনো উল্লেখই নেই। একজন অডিটর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের চাকরি হারানোর ভয় নেই বলে তারা অডিটরের আপত্তিকে পাত্তাই দেন না।

জুয়েল/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে