×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৩৮২২ কোটির ইলেকট্রিক ট্রেন: বিদ্যুৎ আসবে কোথা থেকে?

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২২ ০৯:২৬:০৬
৩৮২২ কোটির ইলেকট্রিক ট্রেন: বিদ্যুৎ আসবে কোথা থেকে?

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রায় ৩ হাজার ৮২২ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের ব্যস্ততম রেলপথগুলোর একটি নতুন প্রযুক্তির বৈদ্যুতিক ট্রেনের আওতায় আসবে। তবে প্রকল্পটি ঘিরে যেমন আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি বিদ্যুৎ সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ, ঋণের বোঝা এবং ভূমি অধিগ্রহণসহ কয়েকটি বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সম্প্রতি একনেকের সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সাল থেকে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট বা EMU Train চালুর লক্ষ্য রয়েছে। প্রায় ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্রেন পরিচালনার জন্য ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে।

প্রকল্পের আওতায় ১৬ সেট বৈদ্যুতিক ট্রেন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ট্রেন সেটে থাকবে পাঁচটি করে বগি। এর মাধ্যমে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চল এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার যাত্রীদের জন্য দ্রুত ও তুলনামূলক আধুনিক রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো বিদ্যুৎ সরবরাহ। বৈদ্যুতিক ট্রেন পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। প্রকল্প নিয়ে আলোচনায় বলা হয়েছে, একটি EMU ট্রেন পূর্ণ সক্ষমতায় চলার সময় প্রায় ২ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে। ১৬টি ট্রেন সেট নিয়মিত চলাচল করলে জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা তৈরি হবে।

ভবিষ্যতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা এই অতিরিক্ত চাহিদা কতটা সামলাতে পারবে। বিশেষ করে ট্রেন চলাচলের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে পুরো রেলসেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বিদ্যুৎ অবকাঠামো কীভাবে প্রস্তুত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা কী থাকবে, সেটিই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক ট্রেন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ডিজেলচালিত ট্রেনের তুলনায় ভিন্ন ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন। বাংলাদেশ রেলের বিদ্যমান জনবলের একটি বড় অংশ ডিজেল ইঞ্জিন ও প্রচলিত রেলপ্রযুক্তিতে অভিজ্ঞ। ফলে নতুন প্রযুক্তি চালুর আগে প্রকৌশলী, চালক, কারিগরি কর্মী ও রক্ষণাবেক্ষণকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক সমস্যা দেখা দিলে ট্রেন মাঝপথে আটকে পড়ার ঝুঁকিও আলোচনায় এসেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাটারি ব্যাকআপ ব্যবস্থার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে এই ব্যাকআপ কতক্ষণ কার্যকর থাকবে, কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা কী হবে—এসব বিষয় প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের অর্থায়নে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এবং ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের মতো উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ফলে প্রকল্পের মোট পরিচালন ব্যয়, ঋণের কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ ভাড়া কাঠামো—সবকিছু মিলিয়ে যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হবে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়।

এদিকে রেলপথের পাশে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত ক্লিয়ারেন্স নিশ্চিত করতে ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও রয়েছে। ভিডিও বিশ্লেষণে রেললাইনের পাশে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার জন্য কিছু পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের উচ্ছেদ বা পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং সামাজিক প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।

পরিবেশগত দিক থেকে অবশ্য বৈদ্যুতিক ট্রেনের সম্ভাব্য সুবিধা রয়েছে। ডিজেলচালিত ট্রেনের পরিবর্তে বিদ্যুৎচালিত ট্রেন ব্যবহারের ফলে রেলপথের আশপাশে সরাসরি জ্বালানি পোড়ানোর কারণে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ কমতে পারে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ১২ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।

তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ যদি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্র থেকে আসে, তাহলে মোট পরিবেশগত সুফল কতটা হবে—এ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। অর্থাৎ রেলপথে ডিজেল পোড়ানোর পরিবর্তে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হলেও সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় পরিবেশে কী পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, সেটিও সামগ্রিক পরিবেশগত মূল্যায়নের অংশ হওয়া প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ বাংলাদেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। তবে প্রকল্পটির সাফল্য শুধু ট্রেন কেনা বা বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপনের ওপর নির্ভর করবে না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, দক্ষ জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ, ঋণ পরিশোধ, যাত্রীভাড়া, নিরাপত্তা, ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন এবং পরিবেশগত প্রভাব—সবগুলো বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

উন্নত প্রযুক্তির এই রেলসেবা বাস্তবে কতটা কার্যকর, সাশ্রয়ী ও টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরবর্তী পরিচালন ব্যবস্থাপনার ওপর।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে