×
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১৩ বছরের অপ্রতিমের সঙ্গে ১৯ বছরের তুহিনের বন্ধুত্ব যেভাবে

২০২৬ সেপ্টেম্বর ২২ ০৮:২৪:০৩
১৩ বছরের অপ্রতিমের সঙ্গে ১৯ বছরের তুহিনের বন্ধুত্ব যেভাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক: কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একের পর এক তথ্য সামনে আসছে। শুরুতে অপ্রতিমের কাছে থাকা দামি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হলেও তদন্তে আরও কিছু বিষয় সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ, বয়সে বড় তরুণদের সঙ্গে অপ্রতিমের ঘনিষ্ঠতা এবং টিকটক ভিডিও তৈরির কথা বলে তাকে ডেকে নেওয়ার তথ্য।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনার দিন ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিন মোবাইল ফোনে অপ্রতিমকে একাধিকবার বার্তা পাঠান। তাকে বাসা থেকে বের হওয়ার জন্য বলা হয়। অপ্রতিমের আইফোন দিয়ে ছবি ও টিকটক ভিডিও তৈরির কথা বলেও তাকে বাইরে যেতে রাজি করানো হয় বলে তদন্তকারীদের ভাষ্য।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটার দিকে মায়ের আইফোন ১৭ প্রো-ম্যাক্স নিয়ে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। পরিবারের সদস্যদের সে জানিয়েছিল, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে যাচ্ছে। পরে বিকেল ৩টা থেকে ৩টা ১০ মিনিটের মধ্যে তুহিনের সঙ্গে তার দেখা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর বিভিন্ন এলাকার অন্তত চারটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দুজনের চলাচলের চিত্র পাওয়া যায়। ফুটেজে তাদের পাশাপাশি হাঁটতে ও কথা বলতে দেখা গেছে। পরে আরও কয়েকজন তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, অপ্রতিম ও তুহিন পরে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন স্থানে যায়। সেখানে মূল সড়ক থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে যেতে হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই এলাকায় আরও দুই কিশোর তাদের সঙ্গে যোগ দেয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় বিরোধের একপর্যায়ে তার ওপর হামলা চালানো হয়। পরে অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তার ফোন নিয়ে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

ঘটনার পর অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আলামত যাচাই করা হচ্ছে।তদন্তে অপ্রতিমের আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধের তথ্যও পেয়েছে পুলিশ।

অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল যন্ত্রাংশের প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে কাজ করত গ্রেপ্তার হওয়া এক কিশোর। তদন্ত সূত্রের দাবি, ওই কিশোরকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল অপ্রতিম। সম্প্রতি সে টাকা ফেরত চাওয়ায় তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয় বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশের ধারণা, টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি এড়ানোর চিন্তাও ওই কিশোরের মধ্যে থাকতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডে তার নির্দিষ্ট ভূমিকা ও উদ্দেশ্য নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।

তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আসে তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়। শনিবার সকালে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়। ওই সময় অপ্রতিমের মৃত্যুর বিষয়টি তদন্তকারীদের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না। পরে মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদ জোরদার করা হয়।

পুলিশের দাবি, শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করলেও পরে জিজ্ঞাসাবাদে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে। এরপর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ ও আটক করা হয়।

তদন্তকারীরা জানান, তুহিনের মোবাইল ফোনে আসা কয়েকটি কলও তাদের নজরে আসে। কলদাতাদের মধ্যে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক কিশোরও ছিল। পরে তাকেও হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য, ওই ১৫ বছর বয়সী কিশোর প্রযুক্তি ও মোবাইল ফোন ব্যবহারে দক্ষ। ঘটনার দিন সে নিজের ফোনের পরিবর্তে পরিবারের অন্য একজনের ফোন নিয়ে বের হয়েছিল। ঘটনার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারীরা।অপ্রতিম ছিল বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সে শান্ত, মিশুক ও পড়াশোনায় ভালো ছিল।

অপ্রতিমের মামা কাজী মাহবুবুর রহমান জানান, আগে তারা গন্ধমতি এলাকায় থাকতেন। সেখানে অপ্রতিমের ১৫-১৬ বছর বয়সী রাফিন নামে এক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় ছিল। রাফিনের বন্ধু ছিলেন তুহিন। সেই সূত্রেই অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনের পরিচয় হয়।

তুহিনের মোটরসাইকেল থাকায় অপ্রতিম মাঝে মাঝে তার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় যেত বলে জানিয়েছেন মামা। এভাবেই তাদের পরিচয় ও যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

অপ্রতিমের গৃহশিক্ষক মো. আল আমিনও জানান, অপ্রতিম বয়সে বড়দের সঙ্গে সহজেই মিশত। তুহিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক কত দিনের, তা তিনি জানেন না। তবে তুহিন মোটরসাইকেলে করে অপ্রতিমকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেত বলে তিনি জানতে পেরেছেন।

তদন্তকারীদের কাছে অপ্রতিমের সঙ্গে বয়সে বড় কয়েকজনের একসঙ্গে চলাফেরা, ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির তথ্যও রয়েছে। এসব যোগাযোগ কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সেগুলোর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জেলা পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আগে কোনো পুলিশ রেকর্ড পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

এ ঘটনায় সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ। তাদের মধ্যে তুহিন ছাড়া অন্য দুজন কিশোর। আরও একজন তরুণের সম্পৃক্ততা যাচাই করা হচ্ছে।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে আইফোন, পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ, তুহিনের সঙ্গে তার পরিচয় এবং ঘটনার সময় আরও কয়েকজনের উপস্থিতি—সবকিছুই এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য ফরেনসিক আলামত বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং প্রত্যেকের ভূমিকা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে পুলিশ।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে