ঢাকা, শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬

কোম্পানির ক্রয়, মজুত ও মুনাফায় গরমিল, তদন্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থা

২০২৬ আগস্ট ২১ ১৯:১৬:৩৯
কোম্পানির ক্রয়, মজুত ও মুনাফায় গরমিল, তদন্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থা

নিজস্ব প্রতিবেদক: আর্থিক বিবরণীতে একের পর এক অসঙ্গতি, হিসাব সংরক্ষণে ঘাটতি এবং সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের সম্ভাব্য অভিযোগে ন্যাশনাল ফিড মিলস লিমিটেডের বিষয়ে নড়েচড়ে বসেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কোম্পানিটির আর্থিক অনিয়ম ও সম্ভাব্য আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কাছে পর্যবেক্ষণ চেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

২০২৪ ও ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে নিরীক্ষকের দেওয়া ‘কোয়ালিফায়েড ওপিনিয়ন’ এবং ‘এমফাসিস অব ম্যাটার’ নিয়ে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ডিএসইকে চিঠি দেয় বিএসইসি। চিঠিতে সম্ভাব্য সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের বিষয়েও মতামত দিতে বলা হয়েছে।

বিএসইসি জানিয়েছে, ২০২৫ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনায় নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী কোম্পানিটি আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় হিসাববই যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেনি। পাশাপাশি নিরীক্ষকের দেওয়া আপত্তির বিষয়ে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের প্রতিবেদনে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি, যা কোম্পানি আইন অনুযায়ী দেওয়ার কথা।

এ কারণে সম্ভাব্য আইন লঙ্ঘন, এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয়সহ বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনে পাঠাতে ডিএসইকে নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি।

কমেছে বিক্রি, কমেছে মুনাফাও

২০১৫ সালে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ১৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ন্যাশনাল ফিড মিলস। আইপিওর অর্থের বড় অংশ ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহারের কথা ছিল।

কোম্পানিটি মূলত মুরগি, মাছ ও হাঁসের খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও রূপান্তরের ব্যবসা করে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ডিম ও গবাদিপশু উৎপাদন এবং মুরগি, হাঁস, গরু, ছাগল ও ভেড়া ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গেও যুক্ত প্রতিষ্ঠানটি।

তবে গত পাঁচ বছরের আর্থিক হিসাব বলছে, ২০২১ অর্থবছরের পর থেকে কোম্পানিটির বিক্রি ও মুনাফা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২১ অর্থবছরে যেখানে কোম্পানিটির আয় ছিল ১২১ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, সেখানে ২০২৫ অর্থবছরে আয় নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৪ কোটি ১৪ লাখ টাকায়। ওই বছর নিট মুনাফা হয়েছে ২৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।

এর আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে কোম্পানিটি ৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা লোকসান করেছিল এবং কোনো ডিভিডেন্ড দেয়নি। ২০২৫ অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের মাত্র ০.১০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়।

পণ্য কেনায় ২ কোটি টাকার বেশি গরমিল

নিরীক্ষকের আপত্তির বড় একটি অংশ কোম্পানির পণ্য ক্রয় ও হিসাব সংরক্ষণকে ঘিরে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্রিত পণ্যের ব্যয়ের মধ্যে কোম্পানি ৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার পণ্য ক্রয়ের তথ্য দেখিয়েছে। অথচ ভ্যাট রিটার্নে এ ক্রয়ের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১০ কোটি ১০ লাখ টাকা।

অর্থাৎ দুই হিসাবের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ টাকার পার্থক্য রয়েছে। নিরীক্ষকের মতে, এর ফলে পণ্য ক্রয় কম দেখানো এবং নিট মুনাফা ও শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বেশি দেখানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া ওই পণ্য ক্রয়ের হিসাব যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় লেজার, ভাউচার ও অন্যান্য সহায়ক নথিও নিরীক্ষক খুঁজে পাননি।

৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকার পাওনা নিয়েও প্রশ্ন

২০২৫ সালের ৩০ জুন কোম্পানিটির হিসাব অনুযায়ী পাওনা ছিল ৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। তবে এসব পাওনার একটি অংশ আদায়যোগ্য না হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা বাদ দেওয়া হয়নি কিংবা সংশ্লিষ্ট হিসাবমান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্থান রাখা হয়নি বলে নিরীক্ষক উল্লেখ করেছেন।

পাওনাগুলোর পরবর্তী অবস্থা যাচাই করার মতো পর্যাপ্ত নথিও পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে পাঠানো ব্যালান্স নিশ্চিতকরণ চিঠিরও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

একইভাবে ৮৪ লাখ ২১ হাজার টাকার প্রদেয় হিসাবও যাচাই করতে পারেননি নিরীক্ষক। সংশ্লিষ্ট লেজার, সহায়ক কাগজপত্র এবং নিশ্চিতকরণ চিঠির জবাব না পাওয়ায় এই হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সুদ ব্যয়েও প্রায় ২ কোটি টাকার অসঙ্গতি

দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সুদ ব্যয়ের হিসাবেও বড় ধরনের গরমিল পেয়েছেন নিরীক্ষক। কোম্পানি ৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা সুদ ও অন্যান্য চার্জ দেখালেও আর্থিক ব্যয়ের হিসাবে মেয়াদি ঋণের সুদ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

এর ফলে প্রায় ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা আর্থিক ব্যয় কম দেখানো এবং একই পরিমাণ মুনাফা বেশি দেখানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে কোম্পানির ইপিএসেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে বলে নিরীক্ষক জানিয়েছেন।

এ ছাড়া ২৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকার ব্যাংক এশিয়া মেয়াদি ঋণের সুদ ব্যয়ের লেজার, ব্যাংক ঋণের বিবরণী এবং বছরে ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা পরিশোধ বা সমন্বয়ের সহায়ক নথিও পাওয়া যায়নি।

৫৫ কোটি টাকার মজুতও রইল যাচাইয়ের বাইরে

কোম্পানিটির মজুত পণ্য বা ইনভেন্টরি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষক। ২০২৫ সালের ৩০ জুন কোম্পানির হিসাবে ইনভেন্টরির পরিমাণ ছিল ৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

কিন্তু ধীরগতির পণ্যের তালিকা, নষ্ট পণ্যের তালিকা, নিট আদায়যোগ্য মূল্য যাচাই, ইনভেন্টরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং গণনার শিটসহ প্রয়োজনীয় সহায়ক নথি পাওয়া যায়নি।

এমনকি ব্যবস্থাপনা এ ধরনের যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবগত না থাকায় ইনভেন্টরির কোনো সরেজমিন যাচাইও করা হয়নি। ফলে বিপুল অঙ্কের ওই মজুতের হিসাব নিরীক্ষকের কাছে যাচাইহীন থেকে গেছে।

সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অর্থ দেওয়ার অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট পক্ষকে দেওয়া অগ্রিম অর্থের হিসাবেও অসঙ্গতি পেয়েছেন নিরীক্ষক। অগ্রিম, আমানত ও প্রিপেমেন্ট হিসেবে দেখানো ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার মধ্যে কর্ণফুলী অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা এবং ন্যাশনাল হ্যাচারি লিমিটেডকে ১১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

নিরীক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অর্থ দেওয়ার পেছনে যথাযথ ব্যবসায়িক কারণ পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া পণ্য কেনার বিপরীতে ৫১ লাখ ৯১ হাজার টাকা এবং অন্যান্য সরবরাহকারীর কাছে ১২ লাখ ৫১ হাজার টাকা অগ্রিম দেওয়া হলেও এসব লেনদেনের পক্ষে পর্যাপ্ত সহায়ক নথি পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে ন্যাশনাল ফিড মিলসের আর্থিক হিসাব, পণ্য ক্রয়, পাওনা-দেনা, ঋণের সুদ, ইনভেন্টরি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে দেওয়া অর্থ নিয়ে নিরীক্ষকের একাধিক পর্যবেক্ষণের পর এবার বিষয়টি বিএসইসির নজরে এসেছে। ডিএসইর পর্যবেক্ষণ পাওয়ার পর সম্ভাব্য সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

এসউদ্দিন/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে