ঢাকা, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

পিপলস লিজিংয়ের আর্থিক প্রতিবেদনে বড় ধরনের গরমিল

২০২৬ জুলাই ১৩ ১৬:১৭:৫৪
পিপলস লিজিংয়ের আর্থিক প্রতিবেদনে বড় ধরনের গরমিল

নিজস্ব প্রতিবেদক : পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী নিয়ে গুরুতর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন কোম্পানির নিরীক্ষক। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ‘Basis for Qualified Opinion’, ‘Material Uncertainty Related to Going Concern’, ‘Emphasis of Matter’ এবং ‘Other Matter’ শিরোনামে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ‘Basis for Qualified Opinion’ অংশেই ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, কোম্পানিটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান পিএলএফএস ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড থাকলেও প্রযোজ্য আর্থিক প্রতিবেদন কাঠামো অনুযায়ী সমন্বিত (Consolidated) আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা হয়নি। ফলে গ্রুপের প্রকৃত আর্থিক অবস্থান, পরিচালন ফলাফল ও নগদ প্রবাহ সমন্বিতভাবে উপস্থাপিত হয়নি এবং প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত অবস্থার উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকতে পারে। এছাড়া সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণীতেও নিরীক্ষক যোগ্যতাসাপেক্ষ মতামত দিয়েছেন। কিন্তু সমন্বিত হিসাব প্রস্তুত না হওয়ায় ওই মতামতের প্রভাবও মূল কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে প্রতিফলিত হয়নি। এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা আর্থিক বিবরণীর নোট-২.১০.২৯-এ ব্যাখ্যা দিয়েছে।

নিরীক্ষক আরও জানান, কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী সহযোগী প্রতিষ্ঠান পিএলএফএস ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের কাছে পাওনা ঋণের পরিমাণ ১৬৩ কোটি ২৭ লাখ ৯২ হাজার ৫৯৭ টাকা। তবে সরাসরি ব্যালেন্স নিশ্চিত করতে পাঠানো চিঠির জবাবে সহযোগী প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, মূল প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিংয়ের কাছ থেকে তাদের পাওনা ১৮০ কোটি ৭২ লাখ ৬১ হাজার ৭৫৯ টাকা। অর্থাৎ দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অমিল রয়েছে।

সহযোগী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। মূল কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে ২০ কোটি ৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ দেখানো হলেও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে দেখা যায়, পিপলস লিজিংয়ের মালিকানায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধিত মূলধনের ৮৩ শতাংশ, যার বিনিয়োগমূল্য ২২ কোটি ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৫০০ টাকা। ফলে দুই হিসাবের মধ্যে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৪৪ হাজার ৫০০ টাকার পার্থক্য পাওয়া গেছে।

আমানত ও ঋণের হিসাবেও বড় ধরনের গরমিলের তথ্য উঠে এসেছে। আর্থিক বিবরণীতে মেয়াদি আমানত (ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান) দেখানো হয়েছে ৩ হাজার ৫৬৬ কোটি ৭৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৬৪ টাকা। কিন্তু আমানতকারীদের তথ্যপত্র অনুযায়ী এ পরিমাণ ৩ হাজার ৫৪২ কোটি ৭৩ লাখ ৮ হাজার ১৪০ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ১৭ কোটি ৬৯ লাখ ৯৮ হাজার ৭০৩ টাকার পার্থক্য রয়েছে।

একইভাবে আর্থিক বিবরণীতে ঋণ ও অগ্রিম দেখানো হয়েছে ১ হাজার ৭৭ কোটি ৫২ লাখ ৭৭ হাজার ১৯৯ টাকা, কিন্তু স্টেটমেন্ট অব অ্যাফেয়ার্স অনুযায়ী এর পরিমাণ ১ হাজার ১৫৯ কোটি ৩৮ লাখ ৭৬ হাজার ১১৯ টাকা। ফলে এখানে ৮১ কোটি ৮৫ লাখ ৯৮ হাজার ৯২০ টাকার অমিল রয়েছে। নিরীক্ষকের মতে, হিসাবরক্ষণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জমা দেওয়া প্রতিবেদন, সহায়ক তথ্য এবং সফটওয়্যারের হিসাবগত ত্রুটির কারণে কোম্পানির আর্থিক তথ্যের পূর্ণতা, নির্ভুলতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। নমুনাভিত্তিক ব্যালেন্স নিশ্চিত করতে চিঠি পাঠানো হলেও সব প্রতিষ্ঠানের উত্তর পাওয়া যায়নি এবং যেসব উত্তর পাওয়া গেছে, সেগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে হিসাবের মিল পাওয়া যায়নি।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কোম্পানির মোট ঋণ ও লিজ স্থিতির ৯৮ দশমিক ০৯ শতাংশই শ্রেণিকৃত । ১ হাজার ৭৭ কোটি ৫২ লাখ ৭৭ হাজার ১৯৯ টাকা মোট ঋণের বিপরীতে শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫৬ কোটি ৯২ লাখ ৭১ হাজার ৭৩০ টাকা, যা ঋণ পোর্টফোলিওর অত্যন্ত দুর্বল অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।

জামানতবিহীন ঋণ বিতরণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোম্পানির মোট ৪২৬ জন ঋণগ্রহীতার মধ্যে ৩৩৫ জনকে কোনো ধরনের জামানত ছাড়াই ঋণ দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণ ও লিজের স্থিতি ছিল ১ হাজার ৭৭ কোটি ৫২ লাখ ৭৭ হাজার ১৯৯ টাকা, অথচ গ্রহণযোগ্য জামানতের মূল্য ছিল মাত্র ৫৮ কোটি ৯৭ লাখ ৪ হাজার ৩৯১ টাকা।

এছাড়া বন্ধক রাখা দুটি সম্পদ—আরএমএস ফুড প্রোডাক্টস অ্যান্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রি এবং ওফাজউদ্দিন স্পিনিং মিলস লিমিটেড—পরিদর্শনে গিয়ে নিরীক্ষক কোনো সাইনবোর্ড পাননি। অন্যদিকে ন্যাশনাল হ্যাচারি (প্রাইভেট) লিমিটেডের সম্পদ যাচাইয়ের চেষ্টা করা হলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয়নি।

নিরীক্ষক আরও জানিয়েছেন, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, ওভারড্রাফট এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ মিলিয়ে কোম্পানির দায়ের পরিমাণ ২৭৬ কোটি ৩৯ লাখ ৭৯ হাজার ১ টাকা। এর মধ্যে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ইউএই-বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি, জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের ঋণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

নিরীক্ষকের ভাষ্য, ২০১৯ সাল থেকে এসব ঋণের বিপরীতে কোনো সুদ হিসাবভুক্ত বা ব্যয় হিসেবে সংযোজন করা হয়নি। অথচ ঋণচুক্তি অনুযায়ী সুদ হিসাব করা হলে কোম্পানির দায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেত এবং একই সঙ্গে সঞ্চিত লোকসানের পরিমাণও অনেক বেড়ে যেত। সংশ্লিষ্ট ঋণের বিবরণী নিরীক্ষকদের কাছে উপস্থাপন করা হয়নি। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরাসরি ব্যালেন্স নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হলেও সব প্রতিষ্ঠানের উত্তর পাওয়া যায়নি এবং প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গেও কোম্পানির হিসাবের মিল পাওয়া যায়নি। ব্যবস্থাপনা এ বিষয়ে নোট-১১.১-এ ব্যাখ্যা দিয়েছে।

এদিকে, কোম্পানিটির ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনায় নিরীক্ষক আরও একাধিক গুরুতর অনিয়ম ও অসঙ্গতির তথ্য তুলে ধরেছেন। যোগ্যতাসাপেক্ষ মতামতের (Basis for Qualified Opinion) বাকি অংশে মার্জিন ঋণ, জামানতবিহীন ঋণ বিতরণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি লঙ্ঘন, কর-ভ্যাট বকেয়া, স্থায়ী সম্পদের তথ্যসংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পূর্ববর্তী বছরগুলোতে বিতরণ করা মার্জিন ঋণের স্থিতি ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩১৪ কোটি ২৮ লাখ ২৩ হাজার ৩৫ টাকা। তবে এ ধরনের ঋণ ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩-এর ২২ ধারা অনুসারে অনুমোদিত নয়। এছাড়া ঋণগ্রহীতাদের পোর্টফোলিও ও প্রয়োজনীয় সহায়ক নথি নিরীক্ষকদের সরবরাহ করা হয়নি। কিছু ঋণগ্রহীতাকে শ্রেণিকৃত না দেখানোর কারণও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অধিকাংশ ঋণ ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন অ্যাক্ট, ১৯৯৩-এর ১৪(১)(ছ) ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত পাঁচ লাখ টাকার সীমার অনেক বেশি হলেও যথাযথ জামানত ছাড়াই বিতরণ করা হয়েছিল।

নিরীক্ষক জানান, ২০১৫ সালে মিসেস লতিফা ইশতিয়াকের ঋণ নিষ্পত্তির অংশ হিসেবে কোম্পানি ঢাকার উত্তরার রবীন্দ্র সরণির সেক্টর-৩, রোড-১৫, প্লট-৩৯-এর মনিহার লিজেন্ড ভবনের দুটি ফ্ল্যাট অধিগ্রহণ করে। ফ্ল্যাট দুটির ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ৫ কোটি ৮৫ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৬ টাকা এবং ১০ শতাংশ হারে অবচয় বাদ দিয়ে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত লিখিত মূল্য ধরা হয়েছে ১ কোটি ৮৩ লাখ ৯৪ হাজার ১২৩ টাকা। তবে সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে নিরীক্ষক ভবনে প্রবেশ করতে পারেননি। ভবনের কেয়ারটেকার জানান, ফ্ল্যাট দুটি বর্তমানে অন্য ব্যক্তির দখলে রয়েছে।

অনির্ধারিত সিকিউরিটিজে কোম্পানির মোট বিনিয়োগ ২০ কোটি ৩৯ লাখ ৭৫ হাজার ৪১০ টাকা। এর মধ্যে ই-সিকিউরিটিজ, জিএমজি এয়ারলাইন্স, এনার্জি প্রাইমা, এমইবি পয়, স্কলাস্টিকা, পিপলস ইনভেস্টমেন্ট ও সিডিবিএলের শেয়ার রয়েছে। এসব বিনিয়োগ ক্রয়মূল্যে দেখানো হলেও বিপরীতে ১৯ কোটি ৮২ লাখ ৬৩ হাজার ৬০০ টাকা প্রভিশন রাখা হয়েছে। নিরীক্ষক জানিয়েছেন, জিএমজি এয়ারলাইন্স, এনার্জি প্রাইমা, এমইবি পয় ও স্কলাস্টিকার সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় নথি পাওয়া যায়নি। এছাড়া স্কলাস্টিকা, জিএমজি এয়ারলাইন্স ও এমইবি পয়ের কোনো বাস্তব অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কোম্পানি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্যাশ রিজার্ভ রিকয়ারমেন্ট (সিআরআর) এবং স্ট্যাটিউটরি লিকুইডিটি রেশিও (এসএলআর) সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। সিআরআরে ঘাটতি ছিল ৩৫ কোটি ৯০ লাখ ৩২ হাজার ৪১৬ টাকা এবং এসএলআরে ঘাটতি ছিল ৬৬ কোটি ৯৪ লাখ ৯১ হাজার ৬৬ টাকা। একই সঙ্গে কোম্পানি বেসেল ইমপ্লিমেন্টেশন ইউনিট গঠন করেনি এবং ন্যূনতম নিয়ন্ত্রক মূলধনের শর্তও পূরণ করতে পারেনি।

নিরীক্ষক আরও জানান, অবিতরিত ডিভিডেন্ডের ২ কোটি ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ৩০৩ টাকা ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডে স্থানান্তর করা হয়নি, যা বিএসইসির নির্দেশনার পরিপন্থী। এছাড়া এ অর্থ পৃথক ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষণ এবং বছরভিত্তিক হিসাব সংরক্ষণেরও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরীক্ষার সময় ২৪টি ব্যাংক হিসাবের স্টেটমেন্ট পাওয়া যায়নি, যার সঙ্গে ১৭ লাখ ৭ হাজার ২৮৭ টাকা সংশ্লিষ্ট। এছাড়া আরও চারটি ব্যাংক হিসাবের ব্যাংক পুনর্মিলনী উপস্থাপন করা হয়নি। ওই চার হিসাবে ব্যাংক স্টেটমেন্টে স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৫০৫ টাকা, কিন্তু আর্থিক বিবরণীতে দেখানো হয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯ টাকা।

কোম্পানির ইন্টারন্যাশনাল লিজিং-এ ৩৫ কোটি ৯৭ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ টাকা এবং প্রিমিয়ার লিজিং-এ ৪৬ কোটি ৯৭ লাখ ২০ হাজার ৫৬ টাকা এফডিআর বিনিয়োগ রয়েছে। বহু বছর ধরে একই অঙ্ক বহাল থাকলেও এসব বিনিয়োগ থেকে কোনো সুদ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দুর্বল আর্থিক অবস্থা ও অবসায়নের ঝুঁকির কারণে অর্থ পুনরুদ্ধার নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে এসব বিনিয়োগের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখা হয়েছে। ব্যালেন্স নিশ্চিতকরণে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের জবাবে ৩৫ কোটি ৬৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭৫০ টাকা এবং প্রিমিয়ার লিজিংয়ের জবাবে ৪৬ কোটি ৯৭ লাখ ২০ হাজার ৫৬ টাকা স্থিতি পাওয়া গেছে।

নিরীক্ষক আরও বলেন, কোম্পানির স্থায়ী সম্পদের নিবন্ধন সর্বশেষ ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী রয়েছে এবং ২০২৫ সাল পর্যন্ত তা যথাযথভাবে হালনাগাদ করা হয়নি। একই সঙ্গে আইএএস-৩৬ অনুযায়ী সম্পদের অবচয়জনিত মূল্যহ্রাস করা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিএফআইএম সার্কুলার নং-০৪ (২৬ জুলাই ২০২১) অনুযায়ী বন্ধকী স্থায়ী সম্পদের প্রতি তিন বছর এবং চলতি সম্পদের প্রতি বছর পুনর্মূল্যায়নের বিধান থাকলেও কোম্পানি তা অনুসরণ করেনি।

এছাড়া কর্তন ও আদায়কৃত ভ্যাট, কর এবং আবগারি শুল্ক বাবদ ২৩২ কোটি ২৫ লাখ ২৬ হাজার ৯৪২ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবশেষে নিরীক্ষক জানিয়েছেন, ২ কোটি ৫১ লাখ ২১ হাজার ৯০৭ টাকা ভূমি ক্রয়ের অগ্রিম অর্থের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাওয়া যায়নি। এ অর্থও দীর্ঘদিন ধরে অপরিবর্তিত অবস্থায় বহন করা হচ্ছে।

এভাবে নিরীক্ষকের 'Basis for Qualified Opinion' অংশে মোট ১৯টি গুরুতর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে, যা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সম্পদ-দায় সংক্রান্ত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

অপরদিকে, কোম্পানিটির ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনায় নিরীক্ষক কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার সক্ষমতা নিয়েও গুরুতর অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে আর্থিক বিবরণীতে বিশেষ গুরুত্বপ্রাপ্ত (Emphasis of Matter) একাধিক বিষয় এবং অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণ (Other Matter) তুলে ধরা হয়েছে।

নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধারাবাহিক লোকসান, নেতিবাচক ইক্যুইটি, নেতিবাচক মূলধন পর্যাপ্ততার হার, নেতিবাচক পরিচালন নগদ প্রবাহসহ একাধিক আর্থিক ও পরিচালনগত সূচক কোম্পানিটির Going Concern হিসেবে ভবিষ্যতে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে উল্লেখযোগ্য সন্দেহ সৃষ্টি করছে। এ বিষয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা আর্থিক বিবরণীর নোট-২.২-এ ব্যাখ্যা দিয়েছে।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আমানত ২০১৯ সালের ২১ জুলাইয়ের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হয়েছে। নিষ্পত্তির তারিখ পর্যন্ত মূলধন ও সঞ্চিত সুদের অবশিষ্ট অংশ সুদ ব্যয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাপ্ত করা হয়েছে। যদিও এ নিষ্পত্তির প্রমাণ হিসেবে আমানতকারীদের কাছ থেকে ঘোষণাপত্র নেওয়া হয়েছে, তবে কয়েকটি ঘোষণাপত্র যথাযথভাবে পূরণ করা হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঋণ ও লিজের শ্রেণিকরণ (CL) হিসাব এবং মূল লেজারের মধ্যে অমিল দূর করতে বিভিন্ন সমন্বয় করা হয়েছে। একইভাবে আমানতকারীদের হিসাবেও ভারসাম্যহীনতা সংশোধনের জন্য সমন্বয় করা হয়েছে, যার বিবরণ আর্থিক বিবরণীর নোট-৪৯.৫ ও ৪৯.৭-এ রয়েছে।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, ২১ লাখ ৮১ হাজার ১৮৫ টাকা লভ্যাংশ আয় এবং ৮১ লাখ ৬৪ হাজার ২৪৪ টাকা মূলধনী মুনাফার বিপরীতে লেজার ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট ছাড়া ট্রেড কনফার্মেশন, ডিপিএ-৬, পিএসআইসহ প্রয়োজনীয় উৎস নথি পাওয়া যায়নি।

এছাড়া আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতের সময় ভগ্নাংশ মেয়াদের সুদ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, যার বিষয়টি নোট-৪৯.৬-এ উল্লেখ রয়েছে।

আরও বলা হয়েছে, অগ্রিম আয়করকে আয়কর সংরক্ষণের সঙ্গে সমন্বয় না করে উভয় হিসাবই বছরের পর বছর বহন করা হয়েছে। ফলে কোম্পানির সম্পদ ও দায়—উভয়ই প্রকৃত অবস্থার তুলনায় বেশি দেখানো হয়েছে।

আইএফআরএস, বিশেষ নিরীক্ষা ও আইন লঙ্ঘনের বিষয়

নিরীক্ষক জানান, পরবর্তী সময়ের ব্যাংক স্টেটমেন্ট সরবরাহ না করায় ব্যাংক পুনর্মিলনী যথাযথভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এছাড়া বাংলাদেশে গৃহীত আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান ও আন্তর্জাতিক হিসাব মানের কিছু বিধান থেকে বিচ্যুতি ঘটিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়েছে বলে কোম্পানি নোট-২.১ ও ২.৮-এ উল্লেখ করেছে।

নিরীক্ষক আরও বলেছেন, MABS & J Partners পরিচালিত বিশেষ নিরীক্ষায় ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়ের যেসব গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান উঠে এসেছে এবং যা ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি চূড়ান্ত হয়েছে, সেগুলোকেও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ১১এ(ক) ধারা অনুযায়ী একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির নামের শেষে "PLC" যুক্ত থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কোম্পানিটি তা অনুসরণ করেনি।

নিরীক্ষক জানিয়েছেন, ৩৩ লাখ ৫০ হাজার ৮৪০ টাকা সরবরাহ বাবদ অগ্রিম অর্থের বিপরীতে পক্ষভিত্তিক কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। ফলে কার কাছে এ অর্থ দেওয়া হয়েছে এবং কতদিন ধরে তা বকেয়া রয়েছে, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

একইভাবে ভাড়া ও বিজ্ঞাপন বাবদ ১২ লাখ ২ হাজার ৫৮৪ টাকা অগ্রিম বছরের পর বছর সমন্বয় ছাড়াই বহন করা হয়েছে। এ অর্থেরও বিস্তারিত তথ্য নিরীক্ষকদের দেওয়া হয়নি।

আইনি ব্যয় হিসেবে ১৫ লাখ টাকা আর্থিক বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও প্রয়োজনীয় সহায়ক নথি পাওয়া যায়নি। নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এর মধ্যে ১০ লাখ টাকার একটি চেক মো. আবদুল্লাহ আল মাহফুজের নামে ইস্যু করা হয়েছে এবং ৫ লাখ টাকার একটি নগদ চেকও ইস্যু করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন, ২০২৩-এর ২৬ ধারা অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠানের মূলধন বাজারে বিনিয়োগ পরিশোধিত মূলধন ও রিজার্ভের মোট পরিমাণের ২৫ শতাংশের বেশি হতে পারে না। একই আইনের ২৮ ধারা অনুযায়ী স্থায়ী সম্পদের পরিমাণও ওই সীমার মধ্যে থাকতে হবে। কিন্তু কোম্পানি এ দুটি শর্তই লঙ্ঘন করেছে। তবে এসব বিষয়ে নিরীক্ষকের মূল মতামত পরিবর্তিত হয়নি।

নিরীক্ষক আরও জানিয়েছেন, কোম্পানির মোট ৩৪৫টি ব্ল্যাক লিস্টেড ঋণ ও লিজ হিসাবের মধ্যে ৯৬টির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী অন্য একজন নিরীক্ষক দ্বারা নিরীক্ষিত হয়েছিল এবং সেখানেও সংশোধিত মতামত প্রদান করা হয়েছিল।

এসএ খান/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

শেয়ারবাজার এর সর্বশেষ খবর

শেয়ারবাজার - এর সব খবর



রে