ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
Sharenews24

নির্বাচনী হলফনামায় তথ্য গোপন, ৬ প্রার্থী চরম বিতর্কের মুখে

২০২৬ জানুয়ারি ২৩ ১০:৪৪:০২
নির্বাচনী হলফনামায় তথ্য গোপন, ৬ প্রার্থী চরম বিতর্কের মুখে

নিজস্ব প্রতিবেদক : ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্তত ছয়জন প্রার্থী বিদেশি নাগরিকত্ব ও বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এর মধ্যে দুইজন যুক্তরাজ্যের নাগরিক হয়েও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন এবং বাকি চারজন বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য হলফনামায় উল্লেখ না করেই প্রার্থী হয়েছেন। তবে টিআইবি এসব প্রার্থীর নাম প্রকাশ করেনি।

‘নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে টিআইবি। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংস্থাটির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। অন্তত তিন প্রার্থী বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন, যদিও তাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এক প্রার্থী হলফনামায় বিদেশে তিনটি ফ্ল্যাটের মালিকানা থাকার কথা উল্লেখ করলেও বাস্তবে তার মালিকানায় ফ্ল্যাটের সংখ্যা কমপক্ষে তিন গুণ বেশি। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিদেশে সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে।

টিআইবি নাম প্রকাশ না করলেও হলফনামা অনুযায়ী, আরব আমিরাতে তিনটি ফ্ল্যাট থাকার কথা জানিয়েছেন বিএনপিতে সম্প্রতি ফিরে আসা স্বতন্ত্র প্রার্থী এস কে এ একরামুজ্জামান। তিনি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং নির্বাচন করায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন। পরে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তাকে পুনরায় দলে নেওয়া হয়। যদিও তিনি পরে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।

টিআইবির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আরেক প্রার্থী বিদেশে নিজ মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য গোপন করেছেন। অনুসন্ধানে তার মালিকানায় ১১টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে আটটি সক্রিয় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত। এছাড়া দুইজন প্রার্থী নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী হলেও হলফনামায় তা উল্লেখ করেননি।

এক প্রার্থীর নির্ভরশীলের নামে ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যে প্রায় ১৪ লাখ পাউন্ড, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২১০ কোটি টাকায় বাড়ি কেনার তথ্য পাওয়া গেলেও সেটি হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। টিআইবির তথ্যানুযায়ী, ওই সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে শেল কোম্পানির মাধ্যমে লেনদেন করা হয় এবং কোম্পানির নিবন্ধন দেখানো হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। এছাড়া একজন প্রার্থীর নিজ নামে বিদেশি সম্পদের তথ্য না থাকলেও তার স্ত্রীর নামে দুবাইয়ে ফ্ল্যাট থাকার তথ্য পেয়েছে টিআইবি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, একজন প্রার্থীর করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত একটি দেশে কোম্পানি নিবন্ধনের তথ্য রয়েছে, যা আগেও প্রকাশিত হলেও হলফনামায় তা উল্লেখ করা হয়নি। এর আগে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় টিআইবি জানিয়েছিল, তৎকালীন এক মন্ত্রীর যুক্তরাজ্য ও আরব আমিরাতে বিপুল সম্পদ রয়েছে। পরবর্তী অনুসন্ধানে ওই মন্ত্রীর নাম সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ বলে জানা যায়, যিনি যুক্তরাজ্যে ২১১টি সম্পদের মালিক।

টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট এক হাজার ৮৮১ প্রার্থীর মধ্যে ৮৯১ জন কোটিপতি। এর মধ্যে ২৭ জন শতকোটিপতি। শতকোটিপতির তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী আমিনুল ইসলাম, যার সম্পদের পরিমাণ ৬২০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় স্থানে ফেনী-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী ৬০৭ কোটি টাকা এবং তৃতীয় স্থানে কুষ্টিয়া-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী জাকির হোসেন সরকার, যার সম্পদের পরিমাণ ৫৮১ কোটি টাকা।

প্রার্থীদের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ব্যাংক ঋণ ১৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। বিএনপির ৫৯ দশমিক ৪১ শতাংশ প্রার্থী ঋণগ্রস্ত, জামায়াতের ক্ষেত্রে এই হার ২২ শতাংশ। শীর্ষ ১০ ঋণগ্রস্ত প্রার্থীর মধ্যে আটজনই বিএনপির।

আইন অনুযায়ী একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা কৃষিজমির মালিক হতে পারলেও ১০ জন প্রার্থী এর চেয়ে অনেক বেশি জমির মালিক। এদের মধ্যে ছয়জন বিএনপির, দুইজন ইসলামী আন্দোলনের, একজন জামায়াতের এবং একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। চট্টগ্রাম-১৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. আলী আব্বাস প্রায় তিন হাজার ৮৭০ বিঘা কৃষি ও অকৃষি জমির মালিক। লক্ষ্মীপুর-২ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী হেলাল উদ্দিনের জমির পরিমাণ ৬৯০ বিঘা এবং সাতক্ষীরা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রউফের মালিকানায় রয়েছে প্রায় ৬৯৩ বিঘা জমি।

টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের গড় বয়স কমেছে। ২০০৮ সালে যেখানে প্রার্থীদের গড় বয়স ছিল ৭২ বছর, সেখানে এবার তা নেমে এসেছে ৫১ বছরে। ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী প্রার্থী রয়েছেন ২০৫ জন এবং ৩৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী ৪১৪ জন।

তবে নারী প্রার্থীর সংখ্যা এখনও কম। মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ দশমিক ০২ শতাংশ নারী, যদিও এটি আগের নির্বাচনের তুলনায় সামান্য বেশি। এবারের নির্বাচনে ৭৪ দশমিক ৪২ শতাংশ প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত এবং ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থী পেশায় ব্যবসায়ী।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

জাতীয় এর সর্বশেষ খবর

জাতীয় - এর সব খবর



রে