ঢাকা, সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬
Sharenews24

বিয়ের এক মাস আগে থেকেই কনেকে কাঁদতে হয় যেখানে

২০২৬ জানুয়ারি ১২ ১৫:১৯:২০
বিয়ের এক মাস আগে থেকেই কনেকে কাঁদতে হয় যেখানে

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিশ্বের অধিকাংশ সংস্কৃতিতে বিয়ে মানেই আনন্দ, গান, নাচ আর উৎসবের রঙিন আয়োজন। তবে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের টু‌জিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে এক ব্যতিক্রমধর্মী ও আবেগঘন রীতি—যেখানে বিয়ের ঠিক এক মাস আগে থেকেই কনেকে নিয়ম করে কাঁদতে হয়। প্রথম দর্শনে এটি দুঃখজনক মনে হলেও, এই কান্নার ভেতর লুকিয়ে আছে ঐতিহ্য, সামাজিক মূল্যবোধ এবং নারীর আবেগ প্রকাশের এক অনন্য মাধ্যম। এই রীতিকে বলা হয় ‘ক্রাইং ম্যারেজ’।

এই প্রথার ইতিহাস বেশ পুরোনো। কিং রাজবংশের শেষ যুগ (১৬৪৪–১৯১১) পর্যন্ত এটি ব্যাপকভাবে পালিত হতো। আধুনিক শহুরে জীবনে এর চর্চা কমে এলেও চীনের গ্রামীণ ও পাহাড়ি অঞ্চলে টু‌জিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটি এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে টিকে আছে।

এই কান্না কেবল চোখের জল নয়; বরং এটি সংগীতমাধ্যমে প্রকাশিত এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী গান, যাকে বলা হয় ‘ক্রাই সং’। কনে নিজেই এই গান শেখে বা রচনা করে গায়। এসব গানে উঠে আসে তার শৈশব, পরিবার, ভবিষ্যৎ জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ, কৃতজ্ঞতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ।

প্রথাটি পালন করার সময়কাল অঞ্চলভেদে ভিন্ন। সাধারণত বিয়ের এক মাস আগে কনে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একটি ঘরে বসে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে কান্না করে। দশ দিন পর তার মা এই কান্নায় অংশ নেন। আরও দশ দিন পর দাদি, নানি কিংবা পরিবারের বয়স্ক নারীরাও যুক্ত হন। কনের বোন, খালা কিংবা নিকট আত্মীয়রাও প্রয়োজনে এতে অংশগ্রহণ করেন। এই প্রক্রিয়াকে স্থানীয়ভাবে ‘জুও তাং’ নামে পরিচিত।

কিছু অঞ্চলে এই আয়োজন আরও বিস্তৃত রূপ নেয়, যাকে বলা হয় ‘টেন সিস্টার গ্যাদারিং’। এতে কনের বান্ধবী ও আত্মীয়রা একত্রিত হয়ে কান্না ও গান পরিবেশন করে। এটি কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক সংহতি এবং নতুন জীবনের প্রতি শুভকামনার প্রতীক।

এই রীতির মূল উদ্দেশ্য শুধুই দুঃখ প্রকাশ নয়। প্রাচীন সমাজে নারীদের বিয়ে প্রায়শই পরিবারের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হতো, যেখানে কনের নিজস্ব মতামত প্রকাশের সুযোগ সীমিত ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে এই কান্না হয়ে উঠেছিল কনের অনুভূতি, অসন্তোষ, সামাজিক প্রতিবাদ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের প্রত্যাশা প্রকাশের একমাত্র পথ।

তৎকালীন সমাজে কনে যদি যথেষ্ট কান্না না করত, তবে তাকে সামাজিকভাবে অবজ্ঞা করা হতো। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পরিবার থেকেও চাপ প্রয়োগ করা হতো। কান্নার গানের মধ্য দিয়ে কনে ঘটক বা সামাজিক প্রথার প্রতি নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করত, যা এক ধরনের নীরব বিদ্রোহ হিসেবেও বিবেচিত হতো।

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও এই প্রথার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কনের মানসিক প্রস্তুতি, আবেগের বহিঃপ্রকাশ এবং নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে। আধুনিক চীনে শহরাঞ্চলে এই রীতি অনেকটাই বিলুপ্ত হলেও টু‌জিয়া সম্প্রদায়ের গ্রামীণ ও পাহাড়ি এলাকায় এটি এখনো দৃঢ়ভাবে পালিত হয়।

সব মিলিয়ে, টু‌জিয়া সম্প্রদায়ের এই কান্নাভিত্তিক বিয়ের রীতি কেবল দুঃখের প্রতীক নয়; বরং এটি সামাজিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পারিবারিক সম্পর্ক এবং নতুন জীবনের সূচনার এক গভীর প্রতিফলন।

মুসআব/

শেয়ারনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে থাকতে SUBSCRIBE করুন

পাঠকের মতামত:

আন্তর্জাতিক এর সর্বশেষ খবর

আন্তর্জাতিক - এর সব খবর



রে