Print
প্রচ্ছদ » অনুসন্ধানী

মনগড়া তথ্যে পুঁজিবাজারে আসছে বিবিএস ক্যাবলস

বিশেষ প্রতিবেদক:

প্রসপেক্টাসে পাতায় পাতায় অসঙ্গিত থাকলেও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জের নাকের ডগার উপর দিয়ে পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু করতে যাচ্ছে প্রকৌশল খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি বিবিএস ক্যাবলস লিমিটেড। ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরুর পর থেকে কোম্পানিটির মুনাফার উল্লম্ফন, আইপিওতে আসার বছরে বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমসের ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ, কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের নিকট বিবিএস ক্যাবলসের বড় অংকের পাওনা, লেনদেনের ২৫ শতাংশই নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পন্ন হওয়ায় কোম্পানিটির আইপিওতে আসার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এছাড়াও আইপিও’র মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ ব্যবহারের খাতেও রয়েছে অসঙ্গতি। অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানিটি ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকার মাধ্যমে নতুন মেশিনারিজ ক্রয়ের কথা বললেও কোম্পানি এখনও তাদের উৎপদান ক্ষমতার ৩৩.৬১ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে পুঁজিবাজারে এসেছে কোম্পানিটি।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০৯ সালে প্রাইভেট হিসাবে গঠিত বিবিএস ক্যাবলস ২০১১ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। এরপরে ২০১৫ সালে প্রাইভেট কোম্পানি থেকে পাবলিক কোম্পানিতে রূপান্তর হয়। কোম্পানিটি পুঁজিবাজার থেকে ২০ টাকা সংগ্রহ করে প্লান্ট ও মেশিনারিজ ক্রয়, ভবন নির্মাণ, ঋণ পরিশোধ ও আইপিও খাতে ব্যবহার করবে।


বিবিএস ক্যাবলসের মিথ্যা তথ্য :

প্রসপেক্টাসে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, (Disclosure as per requirement of Schedule XI, Part II, Para 8-page-197) ৩০ জুন ২০১৬ সালে উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত কাঁচামালের ৯০.৭৬ শতাংশ বা ১৫০ কোটি ২৫ লাখ ৪ হাজার ১২৩ টাকা আমদানি করেছে বিবিএস ক্যাবল। বাদবাকি ৯.২৩ শতাংশ তাদের নিজ বা ১৫ কোটি ২৯ লাখ ৬৫ হাজার ৩৮২ টাকার কাঁচামাল স্থানীয় পর্যায়ে সংস্থান করা হয়। যার মধ্যে ৩০ জুন ২০১৬ সালে কোম্পানিটি ১৫৫ কোটি ১৭ লাখ ০৯ হাজার ৭০৮ টাকার পন্য ব্যবহার করেছে। যা কোম্পানিটির সংগ্রহীত কাঁচামালের ৯৩.৭৩ শতাংশ।

প্রসপ্রেক্টারে এক জায়গায় বলা হয়েছে, (The related business transactions within the group and their significance on the financial performance of the issuer;-page74) ৩০ জুন ২০১৬ সমাপ্ত হিসাব বছরে বিবিএস ক্যাবল পন্য ক্রয় বাবদ বিবিএস মেটালজিকাল ইন্ডাস্ট্রিজকে ৫৩ কোটি ৬০ লাখ ১০ হাজার ১৪৬ টাকা প্রদান করে। প্রদান করা এ অর্থের মধ্যে ১৮ কোটি ৫৬ লাখ ১২ হাজার ৩২২ টাকা ৩০ জুন ২০১৫ সালের বকেয়া ছিল। বাকি ৩৮ কোটি ৫২ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৪ টাকা প্রদান করা হয় ৩০ জুন ২০১৬ সালের লেনদেন বাবদ।

প্রসপেক্টাসের তথ্যানুযায়ী বিবিএস ক্যাবল ৩০ জুন ২০১৬ সমাপ্ত অর্থবছরে মাত্র ১৫ কোটি ২৯ লাখ ৬৫ হাজার ৩৮২ টাকার কাঁচামাল স্থানীয় পর্যায়ে সংগ্রহ করে। কিন্তু তারা আলোচ্য সময়ে বিবিএস গ্রুপের উদ্যোক্তা পরিচালকদের দ্বারা পরিচালিত বিবিএস ম্যাটালজিকাল ইন্ডাস্ট্রিজকে কাঁচমাল ক্রয় বাবদ প্রায ৫৩ কোটি ৬০ লাখ ১০ হাজার ১৪৬ টাকা পরিশোধ করে। তারমানে প্রসপেক্টাসে উল্লেখকরা কাঁচামাল সাপ্লাইকারী স্থানীয় প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদেরই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অডিটর বলেন, কোম্পানি ব্যবসায়িক মুনাফাকে প্রভাবিত করতে ইন্টারব্যাংকিং পলিসি ব্যবহার করে থাকতে পারে। এজন্যই হয়তো এই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে কোম্পানিটি।

পরিবর্তন ডটকমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৫ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনধারী বিবিএস ম্যাটালজিকাল ২০১৩-১৪ হিসাব বছরে ১৩৪ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ৫০৮ টাকার পন্য বিক্রি করে। যার শতভাগই বিক্রি করে বিবিএস ক্যাবলসের কাছে। ২০১৪-১৫ সালে কোম্পানিটি ১৬২ কোটি ৫৭ লাখ ৯২ হাজার ৪৭৭ টাকার পণ্য বিক্রি করে। যার মধ্যে বিবিএস ক্যাবলসের নিকট ওই বছর ১৬২ কোটি ৫১ লাখ ৯২ হাজার ৪৭৭ টাকার পন্য বিক্রি করে। অর্থাৎ মাত্র ৬ লাখ টাকার পন্য অন্য প্রতিষ্ঠানের নিকট বিক্রি করেছে কোম্পানিটি।

বিসিএস ক্যাবলস ও বিবিএস ম্যাটালজিকালের পণ্য ক্রয় বিক্রয়ের চিত্র ১ বছর পরেই পাল্টে যায় পরের বছরই। ২০১৫-১৬ অর্থাৎ ৩০ জুন ২০১৬ সালে বিবিএস ম্যাটালজিকাল ইন্ডাস্ট্রিজ ১৭৯ কোটি ৫২ লাখ ৫৪ হাজার ২৫০ টাকার পন্য বিক্রি করে। এবছর বিবিএস ক্যাবলসের কাছে মাত্র ৩৮ কোটি ৫২ লাখ ৩৬ হাজার ৬৪৪ টাকার পন্য বিক্রি করে বিবিএস ম্যাটালজিকাল। মূলত তালিকাভুক্তির আগের দুই বছর যে ক্রয় হিসাব দেখিয়েছে বিবিএস তার পূরোটাই ভুয়া।

পুজিবাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ বলেন, শুধু বিবিএস ম্যাটালজিকাল ইন্ডাস্ট্রিজের আর্থিক প্রতিবেদন নয়, বরং বিবিএস ক্যাবলসের আর্থিক প্রতিবেদনকে অতিরঞ্জিত করতে কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের পরিচালিত অন্য কোম্পানির সাথে ব্যবসা করে মুনাফার উল্লম্ফন দেখানো হয়েছে।

বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ২৪২.৭৪ শতাংশ :

প্রসপেক্টাসে ২০১১ সালের ২ এপ্রিল বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা বিবিএস ক্যাবলস এর পরের বছর অর্থাৎ ৩০ জুন ২০১২ সালে ১০১ কোটি ৪৬ লাখ ৬৫ হাজার ৫২৬ টাকা টার্নওভার দেখায়। এর মধ্যে কোম্পানিটির মুনাফা দেখায় ৭ কোটি ১৭ লাখ ৯৯ হাজার ৯০৬ টাকা। অর্থাৎ ৩০ জুন ২০১২ সালে কোম্পানিটির টার্নওভার ও মুনাফার অনুপাত ছিল ৭.০৭ । অথচ এ কোম্পানিটির ক্যাবল ব্যবসায় পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।

এছাড়া ৩০ জুন ২০১৬ শেষে কোম্পানিটির টার্নওভার দেখায় ২৫৮ কোটি ৬৯ লাখ ২৮ হাজার ৬৮০ টাকা ও কর পরবর্তী মুনাফা দেখায় ২৪ কোটি ৬০ লাখ ৮৪ হাজার ৬৫৩ টাকা। অর্থাৎ ৪ বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির টার্নওভার ৩৯.২২ শতাংশ বেশি দেখিয়েছে। কিন্তু একই সময়ের ব্যবধানে কর পরবর্তী মুনাফা ২৪২.৭৪ শতাংশ বেশি দেখায় বিবিএস ক্যাবলস। কোম্পানির টার্ণওভার ৩৯.২২ শতাশ বাড়লে মুনাফা কিভাবে ২৪২.৭৪ শতাংশ বাড়ে?

এ সব বিষয় নিয়ে কোম্পানি সচিব নাজমুল হাসানের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত বলবেন বলে সময় দেন। পরে উনার দেওয়া সময়মত যোগাযোগ করলে উনি কথা বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।

একই বিষয় নিয়ে কোম্পানিটির ইস্যু ম্যানেজার প্রতিষ্ঠান বেনকো ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হামদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে তিনি দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান। ফোনেও কথা বলে অপারগতা প্রকাশ করেন।

শেয়ারনিউজ/৩০ জুলাই ২০১৭/