Print
প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ





বিশেষ প্রতিবেদক:

ব্যাংকিং খাতে পরিচালকদের লুটপাট থামছে না। প্রায় প্রতিটি ব্যাংকেই পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনিয়মের পাহাড় জমেছে। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি একটু কড়া হওয়ায় এখন এক ব্যাংকের পরিচালক অপর ব্যাংক থেকে ভিন্ন কৌশলে ঋণ নিচ্ছেন। এ যেন অনেকটা মিলেমিশে লুটপাট। বিশেষ করে পরিচালকরা ভাগাভাগি করে যে ঋণ নিচ্ছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা আর ফেরত আসছে না। এগুলো খেলাপি ঋণ হয়ে যাচ্ছে। আবার মালিক পক্ষের চাপে অসহায় হয়ে অনৈতিক ঋণ দিতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা (এমডি)। অন্যদিকে আছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে অরাজকতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।


বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) গবেষণা তথ্যে দেখা গেছে দেশের ব্যাংকিং খাতে সংঘটিত ৯০ শতাংশ অপরাধে জড়িত ব্যাংকের নিজস্ব লোকজন। বিশেষ করে পরিচালকদের হাত রয়েছে সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে ব্যাংকের পরিচালকরা একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করেও ঋণ নিচ্ছেন বলে দাবি করা হয়েছে ওই গবেষণায়।


এ ব্যাপারে সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এস এ চৌধুরী বলেন, পরিচালকরা বর্তমানে ভাগাভাগি করে ঋণ নিয়ে যাচ্ছেন। তারা একে অন্যকে বলেন, তুমি আমার ব্যাংক থেকে নাও, আমি তোমার ব্যাংক থেকে নেব। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিনের খেলাপি হওয়া অর্থ ফেরত পেতে মামলা করে। কোর্ট থেকে সে মামলার স্থগিতাদেশ নিয়ে আবার ঋণ নিচ্ছে খেলাপিরা। এ ধরনের ঋণ নেয়া বাংলাদেশ ব্যাংককে সার্কুলার করে বন্ধ করতে হবে। আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট কোনও ব্যাংকে নেই। এটা গঠন করতে হবে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। এটা ব্যাংকিং খাতের জন্য ভালো দিক নয়।


সূত্র বলছে, ঋণের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঋণদাতা ও গ্রহীতা একই চক্র। ভুয়া প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে কৌশলে দু’পক্ষ মিলে ঋণের টকা আত্মসাৎ করে। এমনও অভিযোগ আছে, পরিচালনা পর্ষদের প্রভাবশালী ব্যক্তি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে নিজেই ঋণের পুরো টাকা তুলে নিয়ে কিছুদিন পর তা খেলাপি দেখায়। এরপর যথানিয়মে তা অবলোপন করা হয়। আর অবলোপনের সময় নিরাপত্তা সঞ্চিতির নামে যে অর্থ ব্যাংকে রাখা হয় তার মধ্যেও শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। মোদ্দাকথা, খেলাপি ঋণের জন্য ব্যাংক মালিক, পরিচালনা পর্ষদ কিংবা দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কারও কিছুই হয় না। মাঝখানে সরকারি ব্যাংক হলে রাষ্ট্রের তহবিল থেকে জনগণের ট্যাক্সের অর্থ ভর্তুকি দিয়ে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি মেটানো হয়। আর ব্যক্তি খাতের ব্যাংক হলে নানা কৌশলে অবলোপনকৃত অর্থের বোঝা চাপানো হয় ভালো ঋণগ্রহীতাদের ওপর। ব্যাংকের পরিচালনা ব্যয় বেশি দেখিয়ে চড়া সুদ আরোপ করে এসব ঘাটতি সেখান থেকে মেটানো হয়। এর ফলে বাড়তি সুদের চাপে শিল্পপ্রতিষ্ঠান এগোতে পারে না।


এদিকে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর পরিচালকদের বেআইনি ও অনৈতিক চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ব্যাংকিং খাতের সার্বিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা। পরিচালকদের বেপরোয়া চাপে ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি, অনিয়মের পরিমাণ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি এ কথা স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, দেশে এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি। এজন্য অনেকটা বেপরোয়াভাবেই বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক সুবিধা নেয়ার হিড়িক পড়েছে।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, নতুন-পুরনো মিলিয়ে দেশের সরকারি-বেসরকারি ৫৭টি ব্যাংক। এসব ব্যাংক পরিচালকদের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়েছে। ১৯টি ব্যাংকের পরিচালক নিজের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন প্রায় ৪শ’ কোটি টাকার বেশি। একইভাবে ৯টি ব্যাংকের পরিচালক গ্যারান্টার বা জিম্মাদার হয়ে ঋণ দিয়েছেন আরও ২৩১ কোটি টাকা।


সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ব্যাংকগুলোর খেলাপিদের ঋণের একটি বড় অংশই বর্তমান ও সাবেক ব্যাংক পরিচালক, তাদের স্ত্রী-পুত্র-সন্তান বা তাদের নিকটাত্মীয়দের কাছে আটকা পড়ে আছে। এসব ঋণ প্রস্তাব, অনুমোদন ও বিতরণের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকগুলোর পরিচালকের সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি হলেও এ ধরনের সমঝোতাভিত্তিক বড় অংকের ঋণ বিনিময় করেন শতাধিক পরিচালক। যাদের কয়েকজন বেশি বিতর্কিত। মূলত এদের কাছেই পুরো ব্যাংকিং সেক্টর জিম্মি।


বিষয়টি স্বীকার করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, আগে নিজ ব্যাংক থেকেই পরিচালকরা বেশি ঋণ নিতেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী পরিচালকরা নিজ ব্যাংক থেকে তাদের মোট শেয়ারের ৫০ শতাংশের বেশি ঋণ নিতে পারছেন না। তবে তাদের অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে কোনো বাধা নেই। ফলে পরিচালকরা এখন পরস্পরের যোগসাজশে একে অন্যের ব্যাংক থেকে যেমন ঋণ নিচ্ছেন, তেমনি প্রভাব খাটিয়ে নানা সুবিধাও নিচ্ছেন।


বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর (২০১৭) ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ যোগ হয়েছে ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ১১ হাজার ২৩৭ কোটি, দ্বিতীয় প্রান্তিকে (মার্চ-জুন) ৭৩৯ কোটি ও তৃতীয় প্রান্তিকে (জুন-সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা এবং অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে যোগ হয়েছে আরও প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। বছর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ঋণ অবলোপন করা ৪৫ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।


বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে অারও দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বর শেষে সরকারি ৬ ব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ খেলাপি ঋণ ৩১ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। সরকারি বিশেষায়িত ২ ব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের ৩৯টি ব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ খেলাপি ঋণ ২৭ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিদেশি ৯ ব্যাংকের ঝুঁকিপূর্ণ খেলাপি ঋণ ২ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খেলাপি ঋণের পরিমান ৬৫ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। যার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই ব্যাংকের পরিচালকদের।


গত কয়েক বছরে ব্যাংকগুলোতে পরিচালকদের হস্তক্ষেপে বেশ কিছু আলোচিত জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কতিপয় পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্টতায় সোনালী ব্যাংকে ঘটেছে হলমার্ক কেলেংকারি। বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর সরাসরি যোগসাজশে হয়েছে নজিরবিহীন লুটপাট। কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালকদের সংশ্লিষ্টতায় ঘটেছে বিসমিল্লাহ গ্রুপের জালিয়াতি। পরিচালকদের হস্তক্ষেপে গত বছর অগ্রণী ব্যাংকের সিএসআরের টাকা নিয়ে নয়ছয় হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকগুলোতে পরিচালকদের বিপুল অংকের বেনামি ঋণের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন ব্যাংকে পরিচালকরা প্রভাব খাটিয়ে জামানতের সম্পদ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে কয়েকগুণ বেশি দেখিয়ে শত শত কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন বলে জানা গেছে।


হলমার্ক কেলেঙ্কারী: হলমার্ক দুর্নীতি ছিল ব্যাংকিং জগতের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। এ ঘটনা অর্থনীতিবিদদের মতো গোটা দেশের মানুষকে বিস্ময়ে হতবাক করে দিয়েছিল। সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে ২০১০-১২ সময়ের মধ্যে জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয় তিন হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে হলমার্ক গ্রুপই হাতিয়ে নেয় আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি। এত বড় অর্থ কেলেঙ্কারীর জন্য সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা অফিস মূল অভিযুক্ত হলেও ব্যাংকটির পরিচালনা কর্তৃপক্ষও এর দায় এড়াতে পারে না। এই বিবেচনা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের সুপারিশ করে। ২০১২ সালে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল তখনকার সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ।


বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারী: হলমার্কের রেশ কাটতে না কাটতেই ব্যাংকিং খাতে আরেকটি আঘাত এসে ধাক্কা দেয়। তৈরি হয় গভীর ক্ষত। সেই ক্ষতের নাম বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারী। টেরি টাওয়েলস রপ্তানির ভুয়া তথ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ১২শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন বিসমিল্লাহ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী। ব্যাংকের পরিচালক ও কর্মকর্তাদের সহায়তায় জনতা, প্রাইম, প্রিমিয়ার, শাহজালাল, সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেন তিনি। বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উদ্ঘাটিত হওয়ার পর থেকে খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী, তার স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান নওরীন হাসিবসহ অন্য পরিচালকরা ২০১৩ সালে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।


জানা যায়, বিসমিল্লাহ গ্রুপ জনতা ব্যাংক ভবন কর্পোরেট শাখা থেকে ফান্ডেড ৩০৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ও নন ফান্ডেড ২৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, মগবাজার শাখা থেকে ১৭৭ কোটি ১০ লাখ ফান্ডেড ও নন ফান্ডেড এক কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং এলিফ্যান্ট রোড শাখা থেকে ফান্ডেড ১৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। এ ছাড়া প্রাইম ব্যাংক মতিঝিল শাখা থেকে ফান্ডেড ২৬৫ কোটি ৪০ লাখ ও নন ফান্ডেড টাকা ৬১ কোটি ৮ লাখ, প্রিমিয়ার ব্যাংক মতিঝিল শাখা থেকে ফান্ডেড ২৩ কোটি ২২ লাখ ও নন ফান্ডেড ৩৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যমুনা ব্যাংক লিমিটেডের দিলকুশা শাখা থেকে ফান্ডেড ১০৮ কোটি ৪৪ লাখ ও নন ফান্ডেড ৪৬ কোটি দুই লাখ টাকা এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের ইস্কাটন শাখা থেকে ৯৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা ফান্ডেড ও ১০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা নন ফান্ডেড হিসেবে অর্থ আত্মসাৎ করে।


বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারী: ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি যেন পিছু ছাড়ছে না। একটি আঘাত কাটিয়ে না উঠতেই আরেকটি এসে হাজির। এটা ছিল অনেকটা সুনামির মতো যেন সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতি অর্থনীতিবিদদের চোখ কপালে উঠার উপক্রম। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। সিএজির প্রতিবেদনে ঋণ বিতরণে অনিয়মের জন্য তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ পর্ষদকে দায়ী করা হয়েছে। বেসিক ব্যাংকের ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল বা সিএজি কার্যালয়। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক এ সংস্থাটি বলেছে, ব্যাংকটি যে প্রক্রিয়ায় ঋণ অনুমোদন দিয়েছে তা বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে নজিরবিহীন। কোনো রকম বাছ-বিচার ছাড়াই স্বেচ্ছাচারীভাবে যাকে খুশি তাকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। যে কারণে এক সময়ের সবচেয়ে লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটি লোকসানে পড়েছে। যার বিরূপ প্রভাবে বেসিক ব্যাংক বর্তমানে গভীর সংকটে। সিএজির এই প্রতিবেদনে মোট ৫ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকার গুরুতর অনিয়ম উঠে এসেছে। এতে অবৈধ ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। এদিকে ক্রাউন প্রোপার্টিজ নামে এক কোম্পানির স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের হিসাবে ৮ কোটি টাকা জমা হয় ডেল্টা সিস্টেমসের হিসাব থেকে। এই ক্রাউন প্রোপার্টিজের মালিক আবদুল হাই বাচ্চুর আপন ছোট ভাই শেখ শাহরিয়ার পান্না।


পাঁচ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকার ঋণ বিতরণে ১১১টি গুরুতর অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে সিএজির নিরীক্ষা দল। অবৈধ প্রক্রিয়ায় গুলশান শাখার গ্রাহক না হওয়া সত্ত্বেও এএফজি শিপিং লাইন, মেসার্স শিফান শিপিং লাইন, মেসার্স আমির শিপিং লাইন, এশিয়ান শিপিং লাইনকে জাহাজ কেনার জন্য মোট ২১২ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ঋণের বিপরীতে কোনো জামানত রাখা হয়নি। গুলশান শাখা থেকে ঋণ না দেওয়ার সুপারিশ করা হলেও তৎকালীন পর্ষদ তা অনুমোদন করেছে। এ ক্ষেত্রে কোনো রকম যাচাই-বাছাই করা হয়নি। শাখা কর্তৃপক্ষের মতামত উপেক্ষা করে তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ঋণ অনুমোদন করেছে। একই শাখায় সুহী শিপিং লাইন নামে এক প্রতিষ্ঠানকে জামানত ছাড়া ১৪৭ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে অডিট দল।


অগ্রণী ব্যাংকের দূর্নীতি: দুর্নীতির আরেকটি খড়গ নামে অগ্রণী ব্যাংকে। অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের ম্যানেজ করে ব্যাংক কর্মকর্তা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের যোগসাজশে সারাদেশের ১৯টি শাখা থেকে ২৬টি প্রতষ্ঠান ঋণের নামে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার অনিয়ম করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। অগ্রণী ব্যাংকের সিলেট বোয়ালজুর বাজার শাখায় প্রায় ৪৬ লাখ টাকা চুরির ঘটনায় বাবুল রঞ্জন পুরাকায়স্থকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। আর বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ শাখার প্রায় ৩৭ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মিসেস সাফিয়া বেগম এবং ঋণ বিতরণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (লোন অফিসার) সৈয়দ শিওন সাইফকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এভাবে শত শত কোটি টাকার ঋণ অনিয়মে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত বহু অপরাধী সহজে পার পেয়ে যাচ্ছেন।


প্রতিবেদনে দেখা যায়, অগ্রণী ব্যাংকের রমনা কর্পোরেট শাখার ৩ গ্রাহক প্রতিষ্ঠান ঋণের নামে নিয়ে গেছে প্রায় ৫২ কোটি টাকা। এগুলো হল- আহমেদ স্পিনিং মিলসের অনুকূলে ৩০ কোটি টাকা, রবি ফ্যাশনের অনুকূলে প্রায় ৬ কোটি এবং মেসার্স হেলেনা এন্টারপ্রাইজের অনুকূলে ১৬ কোটি টাকা। একইভাবে আমিন কোর্ট কর্পোরেট শাখার ৪ গ্রাহক প্রতিষ্ঠান ঋণের নামে নিয়েছে প্রায় সাড়ে ৫৪ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানগুলো হল- মেসার্স প্যান্ডোরা ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের অনুকূলে ৬ কোটি টাকা, মেসার্স বেস্ট ট্রেড লিংকের অনুকূলে সাড়ে ২৪ কোটি, মেসার্স রেদোয়ান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের অনুকূলে ১৪ কোটি, ইউনি এ্যালায়েন্স জুট ইন্ডাস্ট্রিজের অনুকূলে ১০ কোটি টাকা। এসব ঋণের পুরোটাই এখন আদায় অনিশ্চিত হয়ে মন্দ খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।


এছাড়া ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেডিট ডিভিশন-১ এর গ্রাহক প্রতিষ্ঠান মেসার্স লীনা পেপার মিলসের অনুকূলে প্রায় সাড়ে ৪৪ কোটি টাকা, ঢাকার চক বাজার শাখার গ্রাহক প্রতিষ্ঠান মেসার্স শহীদ স্টোরের অনুকূলে ১ কোটি টাকা, গ্রিনরোড কর্পোরেট শাখার গ্রাহক প্রতিষ্ঠান মৌরিশাস ইন্টারকন্টিনেন্টালের অনুকূলে ৩৪ কোটি টাকা, কক্সবাজার শাখার গ্রাহক প্রতিষ্ঠান মেসার্স কর্ণফুলী সি ফুডসে অনুকূলে সাড়ে ৪ কোটি, পুরানা পল্টন কর্পোরেট শাখার গ্রাহক প্রতিষ্ঠান মেসার্স গ্লোবাল জুট ইন্ডাস্ট্রিজের অনুকূলে প্রায় ১২ কোটি, শান্তিনগর শাখার গ্রাহক মোসাম্মৎ তাহমিনা ইসলামের অনুকূলে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি, সদরঘাট কর্পোরেট শাখার গ্রাহক প্রতিষ্ঠান মেসার্স জুয়েল ক্লথ স্টোরের অনুকূলে দেড় কোটি, বরগুনা শাখার গ্রাহক প্রতিষ্ঠান এমআর ট্রেডিং কোংয়ের অনুকূলে প্রায় ৬৫ কোটি, ঢাকার ওয়াসা কর্পোরেট শাখার গ্রাহক প্রতিষ্ঠান এ্যাপোলো ফার্মাসিউটিক্যালস ল্যাব. লিমিটেডের অনুকূলে প্রায় ৩ কোটি, ঢাকার শ্যামলী শাখার গ্রাহক প্রতিষ্ঠান মেসার্স ডিজিটাল ব্রিকস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের অনুকূলে প্রায় ৬ কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম করা হয়েছে।


এনআরবি ব্যাংকে অনিয়ম: দুর্নীতির ধারাবাহিকতা চলমান রয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক সম্পর্কে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনআরবিসির বোর্ড সভায় অনুপস্থিত পরিচালকদের স্বাক্ষর জাল করে উপস্থিতি দেখিয়ে পর্ষদ সভার কার্যবিররণী করা হয়েছে। নিয়ম ভেঙে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের চেয়ারম্যানের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে। ব্যাংকটি গঠনের সময় মূলধন আনায় অনিয়ম, অনিবাসীদের পরিবর্তে বেনামে বাংলাদেশে বসবাসকারী ব্যক্তি কর্তৃক ব্যাংকের শেয়ার কেনা, বিধিবহির্ভূতভাবে ঋণ প্রদান এবং ব্যাংক হতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টির সাথে পর্ষদ সদস্য ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সম্পৃক্ততার কথা আসে প্রতিবেদনে।


ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ অনিয়ম: দুর্নীতির ঝড়ের গতি যেন তীব্র থেকে আরও তীব্রতর হচ্ছে। এলোমেলো করে দিতে চাইছে গোটা আর্থিক খাত। সাবেক মন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মালিকানাধীন ফারমার্স ব্যাংককে আর্থিক খাতের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। যাত্রা শুরুর তিন বছর না যেতেই শত শত কোটি টাকা ঋণ বিতরণে অনিয়ম ধরা পড়ে বেসরকারি এই ব্যাংকটিতে। অনিয়মগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- ঋণ নিয়মাচার লঙ্ঘন করে ব্যাংকের পরিচালকসহ অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দেয়া। এ ছাড়া ব্যাংকে ব্যাপক ঋণ অনিয়ম হয়েছে। নামে-বেনামে ঋণ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা না মেনে ফারমার্স ব্যাংকের নতুন ঋণ দেওয়ার কথাও এসেছে প্রতিবেদনে। এসব অনিয়মের কথা ফারমার্স ব্যাংক স্বীকারও করেছে বলে জানায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০১৩ সালে জুন মাসে ফারমার্স ব্যাংক আরও আটটি ব্যাংকের সঙ্গে লাইসেন্স পেয়েছিল, যা রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে চরম অর্থ সংকটে ভোগা এ ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের রাখা আমানতের টাকাও দেয়া হচ্ছে না।


এ ব্যাপারে সংসদীয় কমিটির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক পরে সাংবাদিকদের বলেন, ব্যাংকগুলো যেসব অনিয়ম করেছে, পড়লেই গা শিউরে ওঠে। এসব অনিয়মের দায় বোর্ডকে নিতে হবে।


বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে একবার কেউ ব্যাংকের লাইসেন্স পেলে তা বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু ফারমার্স ব্যাংকে যা হয়েছে, তাতে এই ব্যাংকের অবশ্যই মরে যাওয়া উচিত। তিনি বলেন, নানা অনিয়মে জর্জরিত বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়া উচিত। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অনিয়ম কমিয়ে আনতে একটি ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়া হলে তা একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকের মালিকপক্ষ তথা কিছু পরিচালক ব্যাংককে সেবামূলক বা লাভজনক প্রতিষ্ঠান না ধরে এটাকে টাকা হাতিয়ে নেয়ার মেশিন বানিয়ে রেখেছে। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার প্রশ্নে ব্যাংকে তার আমানত রাখবে, আর সে টাকা নিজেরা ভাগাভাগি করে নেবেন। আবার নিজেরা ঋণখেলাপি হয়ে তা এক পর্যায়ে অবলোপনও করবেন। এজন্য পরিচালক হয়েও যারা ঋণ নিচ্ছেন তাদের কোনো চিন্তা নেই। পরিস্থিতি খারাপ দেখলে সপরিবারে বিদেশে সটকে পড়বেন। ভবিষ্যতে এমন আশংকার কথা মাথায় রেখে তাদের প্রত্যেকে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে নিয়ে গেছেন। সেখানে তারা জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাট কেনা থেকে শুরু করে নানা ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করছেন। এজন্য দেশ থেকে পাচার হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা।


বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বেসরকারি খাতের প্রায় সব ক’টি ব্যাংকের পরিচালকরা একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ঋণ দেয়া-নেয়া করেন। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক ৫ হাজার ৩৯ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংক ৪ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়া ৩ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা, ঢাকা ব্যাংক ৩ হাজার ৭২২ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক ৩ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা, যমুনা ৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংক ২ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক ২ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক ২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা, ট্রাস্ট ব্যাংক ২ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা, এনসিসি ব্যাংক ২ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা, সাউথইস্ট ব্যাংক ১ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা, ওয়ান ব্যাংক ১ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক ১ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ১ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া নতুন কার্যক্রমে আসা এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালককে ঋণ দিয়েছে ৫১৪ কোটি টাকা, মধুমতি ব্যাংক ৩৫২ কোটি টাকা, মিডল্যান্ড ব্যাংক ৩৪৯ কোটি টাকা, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক ৩২৫ কোটি টাকা, মেঘনা ব্যাংক ৩০১ কোটি টাকা ও ফারমার্স ব্যাংক ১৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনিয়ম করে ঋণ দেয়ার দায়ে ৫ জন পরিচালককে পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।


এদিকে সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। এসব ব্যাংকের পরিচালকরা সরাসরি ব্যাংকের মালিক না হলেও পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে যথারীতি ব্যাংকের মালিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তারা সরাসরি ঋণ না নিলেও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বড় অংকের ঋণ পাইয়ে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ ঋণের গ্যারান্টার হয়েও ঋণ দিয়েছেন। সূত্র বলছে, এসব ঋণের অনুমোদন থেকে বিতরণ পর্যন্ত রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্য জড়িত।


সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সরকারি খাতের সোনালী ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালককে ঋণ দিয়েছে ১ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংক ১ হাজার ৯১২ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংক ৫৭১ কোটি টাকা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ৫৪৪ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংক দিয়েছে ৫১৭ কোটি টাকা ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) দিয়েছে ৪৬ কোটি টাকা। একইভাবে বিদেশী ব্যাংকগুলোর পরিচালকরাও ঋণ দেয়া-নেয়া করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ দিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। গেল বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দিয়েছে ১ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংক আল-ফালাহ ২২৬ কোটি ও সিটি ব্যাংক এনএ ১৯৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালকদের।


ব্যাংকের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির ব্যাপারে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতার সংকট চলছে। সংকটের পুরোটাই খেলাপি ঋণকে ঘিরে। অধিকাংশ ঋণগ্রহীতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণের অর্থ পরিশোধ না করার কৌশল জেনে গেছেন। ফলে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এটি আর্থিক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ জন্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় রাজনীতিকরণ ও নিয়ন্ত্রকের ব্যর্থতাই দায়ী।


এ ব্যাপারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিচালকদের অবশ্যই নীতি অনুস্মরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো রকম অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। তেমনি নিজেরাও ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে কোনো রকম অনিয়মে জড়ানো যাবে না। বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং খাতে যে অরাজকতা তৈরী হয়েছে তাতে ব্যাংকের পরিচালকরা দায় এড়াতে পারেন না। হয়তোবা তারা জেনে করেছেন নতুবা না জেনে করেছেন এ দুই অবস্থার জন্যে তারাই দায়ী। তিনি বলেন, ব্যাংক পরিচালকদের যোগসাজশের মাধ্যমে ঋণ নেয়া অনৈতিক। এখানে অশুভ ইঙ্গিত রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করে এ ধরনের ‘কানেক্টিং লেনদেন’ বন্ধ করা উচিত। তা না হলে খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে, যা ব্যাংকিং খাতে মানুষের আস্থা হারাবে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘ব্যাংকের এমডিরা আগে স্বাধীন ছিলেন। বর্তমানে তা দেখা যাচ্ছে না। ব্যাংকের এমডিরা পরিচালকদের লেজুড়ভিত্তি করা নতুন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের কয়েকটি বড় ব্যাংকও এ ধরনের কর্মকান্ডে জড়িয়ে শেষ পর্যন্ত দেউলিয়া হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। উদ্যোক্তাদের আজীবন ব্যাংকের পরিচালক পদে থাকার বিরোধীতা করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন এক পদে থাকলে সেখানে অপরাধের প্রবণতা বাড়ে। ব্যাংক খাতের অপরাধ ঠেকাতে একটি শক্তিশালী গোপন গোয়েন্দা বাহিনী গঠন করতে হবে। যারা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে পূর্বাভাস দেবে।


বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত বলেন, অর্থনীতির নৈতিকতা নিয়ে কথা বলা চ্যালেঞ্জিং কাজ। দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক ব্যাংকের আর্থিক হিসাবে সমস্যা রয়েছে। ঠিকমতো হিসাবপত্র করলে দেশের অর্ধেক ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাবে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইয়াসিন আলী বলেন, ব্যাংকে কিছু ব্যক্তি সব সময় অনিয়ম-দুর্নীতি করে। এতে সে নিজে ও অন্যকে বিপদে ফেলে। উর্ধ্বতন কর্মকর্তা সৎ না হলে অপরাধ দমন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ব্যাংকের ৯০ শতাংশ অপরাধে নিজেদের লোক জড়িত। ব্যাংক খাতে সৎ লোক দরকার।


ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যাংকিং খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব ও যোগসাজসের মাধ্যমে লাগামহীন জালিয়াতি, দুর্নীতি ও ঋণ খেলাপীর দৌরাত্ম চলছে। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অসহায়ত্বের ফলে এ খাতে অরাজকতা ও ঝুঁকি বিরাজ করছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পাশাপাশি বহুল-বিতর্কিত ফারমার্স ব্যাংক ও এনআরবিসি ব্যাংকের মত ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকে সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংককে অনিয়মের কারণ উদঘাটন করে দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।





শেয়ারনিউজ/ঢাকা, ০৭ জানুয়ারি ২০১৮