Print
প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ

শক্তিশালী অবস্থানে বস্ত্র খাত: নতুন আশা জাগাচ্ছে বিদেশী বিনিয়োগ

বিশেষ প্রতিবেদন:

শিল্পখাতে তৈরি পোশাক শিল্প একটি ইতিহাস।বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের অধিক আসে শুধু তৈরি পোশাক শিল্প খাত থেকে।যার অংশীধার হিসাবে কাজ করছে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ৪৮টি কোম্পানি। সম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগীদেশ চীনে শ্রম মূল্য বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের বড় বড় ক্রেতাদের পাশাপাশি উদ্যোক্তারাও বাংলাদেশের বাজারে নতুন করে আসছে।

তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, বিশ্ব বাজারের পোশাক খাতের মূল্য তেমন না বাড়লেও চীনে শ্রম মূল্য বেড়েছে কয়েক গুন। যার ফলশ্রুতিতে ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে উদ্যোক্তাদের নতুন ক্ষেত্র খুজে বের করতে হবে।যার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।

সম্প্রতি পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত সায়হাম গ্রুপের সায়হাম টেক্সটাইল ও সায়হাম কটনের ৩০ শতাংশ শেয়ার ক্রয়ে আগ্রহী দেখিয়েছে একটি চীনা প্রতিষ্ঠান। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর চীনা কোম্পানিটির প্রতিনিধিদের সাথে সায়হাম গ্রুপের কর্তাব্যক্তিদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

জানা যায়, জামার্নি মালিকানাধীন চীনা প্রতিষ্ঠানটির উদ্যেক্তার অতিরিক্ত মজুরীর কারণে ব্যবসায়িক মুনাফা কমায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ স্থানান্তরের মানষিকতা থেকেই সায়হাম টেক্সটাইল ও সায়হাম কটনের স্ট্রেটেজিক বিসনেজ পার্টনা হতে আগ্রহী প্রকাশ করেছে। এমন আগ্রহ থেকে সম্প্রতি সাভারে আরো একটি কারখানা পরির্দশণ করেছে চীনা একটি কোম্পানি।

দেশীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সুবিধার কারণ হলো তরুণ শ্রমশক্তি ও স্বল্প মজুরি। আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলতে যদিও উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়ে গেছে। তার পরেও বাংলাদেশর স্বল্প মজুরি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। যার কারনে বাংলাদেশ ব্যবসায়ের আগ্রহ দেখাচ্ছে চীনাসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের উদ্যেক্তারা।

তারা বলেন, চীনে শ্রম ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পর বিশ্ব বাজারে তাদের ক্রেতাও কমেছে। কিন্তু পক্ষান্তরে বাংলাদেশের নতুন বাজার সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে বস্ত্র খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ফরচুন গ্রুপের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার এম আবু তাহের বলেন, ‘কম খরচে পণ্য তৈরিতে চীন অবস্থান হারানোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা দুয়ার খুলে যাচ্ছে। বিশ্ববাজার দখলের জন্য বাংলাদেশের সামনে এখন অপার সুযোগ। এজন্য দক্ষ শ্রমশক্তি প্রয়োজন। চীনে শ্রমমূল্য বেড়ে যাচ্ছে। তাই বিশ্ববাজারে পণ্য সরবরাহকারীদের কাছে আমরা এখন বিভিন্ন পণ্য তুলে দিতে পারি।’

আবু তাহের আরও বলেন, ‘চীনের তুলনায় বাংলাদেশে সস্তায় শ্রমিক পাওয়া যায় কিন্তু শ্রমিকদের উৎপাদন ক্ষমতাও তেমনই। বিশ্ববাজারে চীনের জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করার আগে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নজর দিতে হবে আমাদের।’

শুধু যে চীনেই মজুরি বাড়ছে তা নয়, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামেও সমানতালে মজুরি বাড়ছে। বাংলাদেশ এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যাপক পরিসরে লাভবান হতে পারে। কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ২০১৮ সাল থেকে বাস্তবায়ন হবে। কম্বোডিয়া সরকার পোশাক শ্রমিকদের মাসিক বেতন ১৪০ ডলার থেকে ১৫৩ ডলারে উন্নীত করেছে। এখন ভিয়েতনামের শ্রমিকদের মাসিক বেতন ১৭৫ ডলার। তা ছয় দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ভিয়েতনামের জাতীয় মজুরি কমিশন।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৬৬২ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৫৮২ কোটি ২৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। গত দুই মাসে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬১৪ কোটি ডলার। এ সময়ে রপ্তানি আয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এদিকে অর্থ বছরের দুই মাসে পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

ইপিবির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলার। এর মধ্যে অর্থ বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে ৫৫২ কোটি ৪২ লাখ মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। তার আগের অর্থ বছরের একই সময়ে ৪৮৪ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। গত বছরের তুলনায় পোশাক রপ্তানিতে ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।

বিশ্ব বাণিজ্য পরিসংখ্যান পর্যালোচনা ২০১৭ অনুসারে, বিশ্বের তৈরি পোশাকশিল্পের বাজারে বাংলাদেশের অংশ বাড়ছে। ২০১৫ সালের পাঁচ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন তা ছয় দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে, চীনের শেয়ার পড়তির দিকে। ২০১৫ সালে যা ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল, তা কমে এখন ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে।

‘স্টিচেস টু রিচেস: দক্ষিণ এশিয়ায় পোশাক খাতে কর্মসংস্থান, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ শিরোনামে বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় দেখা যায়, চীনে পোশাক খাতের পেছনে এক শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি এ পণ্য রফতানির সুযোগ বাড়বে এক দশমিক ৩৬ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। এদিকে, পোশাক খাতের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি উঠেছে বাংলাদেশেও। সে অনুযায়ী এক শতাংশ মজুরি বাড়ানো হলে শ্রমখাতে নারীদের প্রবেশের সম্ভাবনা বেড়ে ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছাবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চীনে শতকরা ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য নতুন করে আরও চার দশমিক ২২ শতাংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বাংলাদেশে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিশ্ববাজারে শ্রমিকদের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা বেড়ে গেছে। তৈরি পোশাক খাতের ছোট পর্যায়ের কাজের অর্ডার বাড়ার সম্ভাবনা আছে বাংলাদেশের। এ সুযোগ সমানভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, ভারত ও পাকিস্তানের সামনেও। ’

শেয়ারনিউজ/ঢাকা, ২৯ নভেম্বর ২০১৭/