Print
প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ

অ্যাকাউন্টিং এবং অডিটিং ডিসক্লোজারের গুণগত মান নিয়ে সংশয়!





বিশেষ প্রতিবেদক

তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। স্বচ্ছ প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সঠিক দিকনির্দেশনার দায়িত্ব ও পেশাগত হিসাববিদদের। ফলে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নিরীক্ষকদের আরো বেশি সক্রিয় হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। কারণ, বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে অস্বচ্ছতা দেখিয়ে প্রতিবছর কোম্পানিগুলোর পরিচালকরা বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে মুনাফা কম দেখিয়ে ডিভিডেন্ড না দিয়ে কিংবা অল্প পরিমাণ ডিভিডেন্ড দিয়ে বছরের পর বছর বিনিয়োগকারীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তাই এসব অনিয়ম বন্ধে কোম্পানিগুলোর অ্যাকাউন্টিং এবং অডিটিং ডিসক্লোজারের গুণগত মান উন্নত করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তারা।


তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অনিয়ম দিন দিন বেড়ে চলেছে। বিভিন্ন আইনি দুর্বলতার কারণে অনিয়ম করে পার পেয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিগুলোর অ্যাকাউন্টিং এবং অডিটিং ডিসক্লোজার গুণগতমানে উন্নত না করায় এসব অনিয়ম তৈরি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো ইচ্ছামতো বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে মুনাফা বাড়াচ্ছে। আবার মনগড়াভাবে মুনাফার হার কমাচ্ছে। কখনো কোনো কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে অস্বাভাবিকভাবে মুনাফার হার বাড়াতে দেখা গেছে।


এছাড়া কোনো কোনো কোম্পানির নির্ধারিত সময়ে কমিশনের কাছে তাদের রিপোর্ট জমা দিতে ব্যর্থ হতে দেখা গেছে। অনেক কোম্পানিকে সময়মতো বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) না করে ক্যাটাগরি পরিবর্তন করতেও দেখা গেছে। এসব অনিয়ম থেকে রেহাই পেতে প্রণোদনা প্যাকেজের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে অ্যাকাউন্টিং এবং অডিটিং ডিসক্লোজারের গুণগত মানোন্নয়নে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু তার বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। জানা গেছে, ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ধসের সময় সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নেয়। সব পদক্ষেপ ব্যর্থ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে বিএসইসি ২০১১ সালের ২৩ নভেম্বর তিন ধাপে বেশকিছু পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি বেশিরভাগ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করে। কিন্তু ৪ থেকে ৬ মাসে বাস্তবায়নযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের বেশকিছু ইস্যু এখনো আটকে আছে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে ছিল পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অ্যাকাউন্টিং এবং অডিটিং ডিসক্লোজারের গুণগত মান উন্নত করতে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ) প্রণয়ন করা। এটি প্রণয়ন করা হলেও এর পরিপালন না হওয়ায় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অনিয়ম বেড়েই চলছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাজারে। তবে এ ব্যাপারে বিএসইসির যুগপোযোগী সিদ্ধান্ত নিলেও এসব অনিয়ম অনেকটা কমে যাবে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।


তারা বলছেন, অ্যাকাউন্টিং এবং অডিটিং পেশার সঙ্গে অর্থনীতির ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুষ্ঠু আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে এ পেশাজীবীদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু অর্থের কাছে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা হারিয়ে যাচ্ছে।


তারা বলছেন, অ্যাকাউন্টিং এবং অডিটিং ডিসক্লোজারের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে একটি প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, দায় এবং সম্পদের খতিয়ান। কাজেই এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের যাতে আস্থার সংকট না হয় সেদিকে এ পেশার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের খেয়াল রাখা উচিত।


এদিকে বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে অস্বচ্ছতা দেখিয়ে ফায়দা লুটে নিচ্ছে কোম্পানির পরিচালকরা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতার কারণে কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, যেসব কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দিচ্ছে সেগুলো পুননিরীক্ষা (রি-অডিট) করা হচ্ছে না। এতে কোম্পানিগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করছে।


এ বিষয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, মুনাফা ও ঝুঁকির বিষয় বিবেচনা করে বিদেশীরা বিনিয়োগ করে থাকেন। এজন্য স্বচ্ছ আর্থিক প্রতিবেদনের গুরুত্ব অপরিসিম। ফলে আর্থিক প্রতিবেদনে বৈশ্বিক মান বজায় রাখার মাধ্যমে নিরীক্ষকরা বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারেন। এ বিষয়টি নজর দিয়ে তাদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে।


বিএসইসির কমিশনার ড. স্বপন কুমার বালা বলেন, আর্থিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে পেশাদার হিসাববিদরা পুঁজিবাজারে ভূমিকা রাখছেন। তাই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় তাদের অনেক বেশি ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিএসইসির উদ্যোগের সঙ্গে আইসিএবি যৌথভাবে কাজ করছে।


ডিএসই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএম মাজেদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হলেও পুঁজিবাজারের মূলধনের সঙ্গে জিডিপির অনুপাতে আমরা বেশ পিছিয়ে। জিডিপিতে পুঁজিবাজারের অবদান বাড়াতে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জ চেষ্টা করছে। বিভিন্ন নতুন পণ্য প্রচলন ও বিধিবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে নিরীক্ষকরাও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন।


বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদন বিএসইসিতে জমা দেয় সেগুলো রি-অডিট করা প্রয়োজন। এতে কোনো আর্থিক প্রতিবেদনে অস্বচ্ছতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নজর দেয়া জরুরি বলে মনে করেন তারা।


তাদের মতে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কারসাজির অন্যতম হাতিয়ার ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন। সাধারণত আর্থিক প্রতিবেদন দেখে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করে থাকেন। আর ওই প্রতিবেদনে কোন অসঙ্গতি থাকলে তা বিনিয়োগকারীদের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব নয়। তাই কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হিসাবরক্ষক ও অডিটরদের নৈতিকতায় উদ্বুদ্ধ করা দরকার। পাশাপাশি কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের অনিয়মরোধে কঠিন শাস্তির বিধান রাখাটাও জরুরি। আর তা নিশ্চিত করতে পারলেই কোম্পানিগুলো আর্থিক প্রতিবেদনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের ঠকানোর অপচেষ্টা রোধ করা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।





শেয়ারনিউজ/ঢাকা, ১০ অক্টোবর ২০১৭