Print
প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ

৫ কারণে পুঁজিবাজারে দর পতন

ঢাকা, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭:

পুঁজিবাজারের গত কয়েক কার্যদিবসের টালমাতাল পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা কিছুটা দু:চিন্তায় পড়েছেন। তারা বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ থেকে বিরত রয়েছেন। আবার কেউ কেউ বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করেছেন। একটানা গত এক মাস ধরে ব্যাংক খাতের শেয়ারের টানা দরবৃদ্ধিতে অস্থিরতায় পড়ে যায় বিনিয়োগকারীরা। কারন বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক ক্রয় থেকে বিরত ছিলেন।

এদিকে সপ্তাহের শেষের দুই কার্যদিবস দেশের উভয় পুঁজিবাজারে দরপতন হয়। দরপতনের কারণে উভয় বাজারে লেনদেন কমার পাশাপাশি কমেছে বাজার মূলধনও। পুঁজিবাজারে দরপতনের পেছনে পাঁচটি ইস্যু কাজ করছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

ইস্যু পাঁচটি হলো, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদে ডে ট্রেডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর উপর চাপ প্রয়োগ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রপিট টেকিং, একটানা বাড়ার কারণে বাজার সংশো্ধনের প্রয়োজনীয়তা, বিনিয়োগকারীদের বাজারের প্রতি আস্থাহীনতা।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত একমাসে পুঁজিবাজারে ৪১৭ পয়েন্টের বেশি বেড়েছে। গত ২০ আগস্ট দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ছিল ৫৮১৯ পয়েন্ট। গতকাল মঙ্গলবার ডিএসইর প্রধান সূচক বেড়ে দাঁড়ায় ৬২৩৬ পয়েন্টে। এতে দেখা যায়, ডিএসই’র প্রধান সুচক বেড়েছে ৪১৭ পয়েন্ট। তবে বৃহস্পতিবার কারেকশনের পর এসে দাঁড়ায় ৬১৭০ পয়েন্ট।

বৃহস্পতিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) গত কার্যদিবসের চেয়ে সূচক ও লেনদেন শেষ হয়েছে এদিনের লেনদেন কার্যক্রম। এদিন ডিএসইর প্রধান সূচক ২ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট কমেছে এবং সিএসইর প্রধান সূচক ১ দশমিক ৫০ পয়েন্ট কমেছে।

এদিন উভয় পুঁজিবাজারে মোট লেনদেন হয়েছে ৮২৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকার শেয়ার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ড। গত বুধবার লেনদেন হয়েছিল এক হাজার ১৩৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ডিএসই ও সিএসইর ওয়েবসাইট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এদিন ডিএসইতে টাকার অঙ্কে মোট লেনদেন হয়েছে ৭৮০ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। গত বুধবার লেনদেন হয়েছিল এক হাজার ৮২ কোটি টাকা। সুতরাং এক কার্যদিবসের ব্যবধানে ডিএসইতে লেনদেন কমেছে ৩০১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।

এদিন ডিএসইতে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১৭০ পয়েন্টে, ডিএসইএস বা শরীয়াহ সূচক ৪ দশমিক ১৩ পয়েন্ট কমে এক হাজার ৩৬১ পয়েন্টে এবং ১ দশমিক ০৭ পয়েন্ট কমে ডিএসই-৩০ সূচক দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ১৯৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। এদিন ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩২৮টি কোম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ৮৯টির, কমেছে ২০৬টির এবং কোনও পরিবর্তন হয়নি ৩৩টি কোম্পানির শেয়ার দর।

এছাড়া টাকার অঙ্কে এদিন ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানি হলো- ন্যাশনাল ব্যাংক, শাহজালাল ইসলাম ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, সামিট পাওয়ার, ফার্স্ট সিকিউরটি ইসলামী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইফাদ অটোমোবাইল এবং লংকা-বাংলা ফাইন্যান্স।

অন্যদিকে এদিন সিএসইতে মোট শেয়ার লেনদেনের পরিমান ৪৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা। গত বুধবার লেনদেন হয়েছিল ৫১ কোটি ১৭ লাখ টাকার শেয়ার। সুতরাং এক কার্যদিবসের ব্যবধানে সিএসইতে লেনদেন কমেছে ২ কোটি ৩ লাখ টাকা।

এদিন সিএসইর প্রধান সূচক সিএসসিএক্স ১ দশমিক ৫০ পয়েন্ট কমে ১১ হাজার ৫৭৮ পয়েন্টে, সিএএসপিআই সূচক ০ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট কমে ১৯ হাজার ১৫৩ পয়েন্টে, সিএসই-৫০ সূচক ৪ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৪৩৭ পয়েন্টে এবং সিএসই-৩০ সূচক ৪৩ দশমিক ৬১ পয়েন্ট বেড়ে ১৬ হাজার ৪৯৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

এদিন সিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৫০টি কোম্পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ৬৬টির, কমেছে ১৫৮টির এবং কোনও পরিবর্তন হয়নি ২৬টি কোম্পানির শেয়ার দর। টাকার অঙ্কে এদিন সিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানি হলো: শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, জেনারেশন নেক্সট, এক্সিম ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরটি ইসলামী ব্যাংক, লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট এবং ডেল্টা স্পিনিং।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার শুধু বাড়বে, তাতো নয়। বাজার সংশোধনেও থাকতে হবে। তাঁদের মতে, গত দুই সপ্তাহে ব্যাংক খাতের শেয়ার দর অনেক বেড়েছে। এথাতে সংশোধন হওয়া স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু যেভাবে সংশোধন হয়েছে, এভাবে সংশোধন প্রত্যাশিত নয়।

দ্বিতীয়ত: পুঁজিবাজার চাঙ্গা হওয়ার প্রেক্ষিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বেশ সক্রিয় হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও ডে ট্রেডারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তারাও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মতো দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করতে যেন আগ্রহী নয়। কিছুটা লাভ হলেই প্রপিট টেকিংয়ের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ডে ট্রেডারদের ন্যায় আচরণ করার কারণে আজ পুঁজিবাজারে এভাবে পতন নেমে এসেছে।

তৃতীয়ত: কেন্দ্রীয় ব্যাংক মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকগুলোর শেয়ার দর অনেকদিন থেকে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এতে ব্যাংকগুলো শেয়ার দর অনেকাংশেই বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের মতে, হঠাৎ করে ব্যাংকের শেয়ার দর এভাবে ঊধ্বমূখী হওয়ার মতো কোন যুক্তিসংগত কারণ ছিল না। সুতরাং সময় থাকতে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। কারণ বেশিরভাগ মার্চেন্ট ব্যাংক এমনিতেই লোকসানে রয়েছে।

চতুর্থত: গত কয়েকদিন যাবত যারা ব্যাংকের শেয়ার কিনেছেন, তারা সবাই লাভে ছিলেন। গত সপ্তাহের তুলনায় গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত তলিকাভুক্ত ব্যাংকের শেয়ার দরের প্রার্থক্য প্রায় ১২ শতাংশ থেকে ২৬ শতাংশ পর্যন্ত। ব্যাংকের শেয়ার দর বাড়ার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আজ প্রপিট টেকিংয়ে ছিলেন।

ব্যাংকের শেয়ারে আজ ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতার চাপ ছিল অনেক বেশি। কিন্তু বাজারে যখন পতন প্রবণতা দেখা দেয়, ব্যাংকের সাথে অন্যান্য খাতের শেয়ার দরও পতনে নেমে আসে, যদিও অন্যান্য খাতের বেশিরভাগ শেয়ার গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে তেমন বাড়েনি।

পঞ্চমত, গত কয়েক কার্যদিবস ধরে বাজারের প্রতি কিছুটা হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে। এরমধ্যে প্রধানত কারন অধিকাংশ বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক বিমুখ থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্রয়ের চাপে ব্যাংক বাঁড়ছে।

শেয়ারনিউজ/