Print
প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ

আমলাতন্ত্রের মারপ্যাচে কাজে আসছে না বীমা খাতের বিনিয়োগযোগ্য তহবিল



বিশেষ প্রতিবেদক:

পুঁজিবাজারে তারল্য প্রবাহ বাড়াতে নতুন বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। সেই সঙ্গে বীমার বিনিয়োগযোগ্য অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের পরামর্শও দিচ্ছেন তারা। এ নিয়ে বহু আলোচনা-সমালোচনার পর বিষয়টি নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন পর্যন্ত গড়িয়েছে। কিন্তু নীতি নির্ধারকদের উদাসীনতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ফাইলবন্দি হয়ে আছে বীমার বিনিয়োগ নীতিমালা। তাই সুযোগ থাকলেও নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়ার কারণেই বীমা শিল্পের বিনিয়োগযোগ্য অর্থ পুঁজিবাজারের উন্নয়নে কোনো কাজে আসছে না। অন্যদিকে, হিমঘরে থাকা বিনিয়োগ নীতিমালা আদৌ আলোর মুখ দেখবে কিনা সেই প্রশ্নও উঠছে।


প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিদ্যমান বীমা কোম্পানিগুলোর লাইফ ফান্ডসহ বিনিয়োগযোগ্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। কিন্তু গ্রাহকের অর্থ ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ নিয়ে আইনি জটিলতার কারণে কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের আমানত লাইফ ফান্ডের অর্থ ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করতে চায় না। অন্যদিকে, বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের নীতিমালা নেই বলে কোম্পানিগুলো সঠিকভাবে সেই অর্থ ব্যবহার করতে পারছে না।


পুঁজিবাজারে তারল্য সংকটের কারণে এই অর্র্থের বিনিয়োগের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে ২০১১ সালে। বিভিন্ন মহলে সমালোচনার পর অবশেষে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পুঁজির নিরাপত্তার ন্যূনতম গ্যারান্টি চায় বীমা কোম্পানির মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)। কিন্তু ‘পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ’ উল্লেখ করে অর্থের নিরাপত্তা দিতে নারাজ বিএসইসি। তাই পুঁজিবাজারে বীমা কোম্পানির বিনিয়োগ বাড়ানোসহ অলস অর্থ কাজে লাগাতে ২০১৩ সালের মার্চে সময়োপযোগী নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছিল বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। বীমা খাতের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে বীমা কোম্পানির বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রবিধানের খসড়াও প্রণয়ন করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ওই প্রবিধানের খসড়ায় জীবন বীমা কোম্পানির লাইফ ফান্ডের বিনিয়োগযোগ্য অর্থের ৫৫ শতাংশ এবং সাধারণ বীমা কোম্পানির ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।


সূত্রগুলো বলছে, বিনিয়োগ নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত হলে বিনিয়োগযোগ্য অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজসহ ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ইস্যু করা বন্ড, ঋণপত্র অথবা অন্য সিকিউরিটিজে, অগ্রাধিকার অথবা সাধারণ শেয়ারে, মিউচ্যুয়াল ও ইউনিট ফান্ড, স্থাবর সম্পত্তিতে, সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে, তফসিলি ব্যাংকে আমানত হিসাবে, নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) আমানত হিসাবে বিনিয়োগ করতে পারবে সাধারণ ও জীবন বীমা কোম্পানিগুলো। কিন্তু প্রায় দেড় বছর পরও ওই প্রবিধানের খসড়া অনুমোদন হয়নি। যে কারণে বিনিয়োগ প্রশ্নে এখনো দিকনির্দেশনাহীন বীমা শিল্প, অন্যদিকে বারবার স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিলেও তারল্য সংকটে পুঁজিবাজার।


খসড়া প্রবিধানে বাংলাদেশে ব্যবসারত সব জীবন ও সাধারণ বীমা কোম্পানিকেই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগযোগ্য অর্থ বাংলাদেশেই বিনিয়োগ করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। খসড়া প্রবিধান অনুযায়ী, বিনিয়োগযোগ্য অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজসহ ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ইস্যু করা বন্ড, ঋণপত্র অথবা অন্য সিকিউরিটিজে, অগ্রাধিকারভিত্তিক অথবা সাধারণ শেয়ারে, মিউচ্যুয়াল ও ইউনিট ফান্ড, স্থাবর সম্পত্তিতে, সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে, তফসিলি ব্যাংকে আমানত হিসাবে, নন ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) আমানত হিসাবে এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত অন্য সম্পদে বিনিয়োগ করতে হবে। উভয় শ্রেণীর বীমা কোম্পানি বিনিয়োগযোগ্য অর্থ সিকিউরিটিজ, মিউচ্যুয়াল ফান্ড এবং ঋণপত্র অথবা অন্য সিকিউরিটিজ- এ ৩ শ্রেণীতে পৃথক পৃথকভাবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে। উভয় শ্রেণীর বীমা কোম্পানি বিনিয়োগযোগ্য অর্থের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ শেয়ারে, ২০ শতাংশ মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে পারবে। একইভাবে ঋণপত্র কিংবা অন্য সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে জীবন বীমা কোম্পানি ১০ শতাংশ এবং সাধারণ বীমা কোম্পানি ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারবে। শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে কোনো বীমা কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানির অগ্রাধিকার শেয়ার অথবা সাধারণ শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে একটি কোম্পানি বিনিয়োগযোগ্য অর্থের ৫ শতাংশ এবং ওই কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে না। বিনিয়োগযোগ্য অর্থের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ারে পুঞ্জীভূত বিনিয়োগ করতে পারে।


নীতির খসড়া প্রণয়ন ঘিরে বহু আশার কথা বলা হলেও উদ্যোগের দুই বছরেও প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শিকার হয়ে বহুল প্রত্যাশিত নীতিমালা ঝুলে থাকার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগযোগ্য অর্থ অলস পড়ে আছে। নতুন নীতিমালা না থাকার কারণে পুরনো নীতিমালা মেনে স্বল্প পরিসরে বিনিয়োগ করছে কোম্পানিগুলো।


এ বিষয়ে বীমা বিশ্লেষকরা বলছেন, বীমা খাতের বিনিয়োগযোগ্য অর্থ স্বল্প সময়ের মধ্যে পুঁজিবাজারে আনা নিশ্চিত করার জন্য প্রস্তাবিত বিনিয়োগ নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন ঝুলে আছে। নীতিমালা অনুমোদন হলে আরো আগে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানো যেত, কিন্তু জটিলতার কারণে বিষয়টি সুরাহা হচেছ না। পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার স্বার্থে দ্রুত নীতিমালা চূড়ান্ত করা উচিত বলেও মনে করছেন তারা।





শেয়ারনিউজ/এইচকে/ঢাকা, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭