Print
প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ

ব্যাংকিং খাতের গড় রিজার্ভ ৯৪৬ কোটি টাকা!




এইচ কে জনি:

পুঁজিবাজারে ভয়াবহ ধসের পূর্ববর্তী দেশের ব্যাংকিং ব্যাপক মুনাফায় থাকলেও বিগত সময়ের পুঁজিবাজার ধসে এ খাতের মুনাফা ক্রমশ কমেছে। বিনিয়োগকারীদের ভরসার অন্যতম খাত হিসাবে পরিচিত এ ব্যাংকিং নানা কারণে স্থবির হয়ে পড়েছিল। পরিণতিতে নির্ভরযোগ্য এ খাত থেকে আশানুরুপ মুনাফা পাচ্ছিলেন না বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া যারা পূর্বে এ খাতের শেয়ার অতিরিক্ত দরে কিনেছিলেন তারা বড় অংকের লোকসানে রয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে এ খাতটি। গত তিন বছরে এ খাতের মুনাফা ও রিজার্ভের পরিমাণ টানা বাড়ছে। সেই সঙ্গে লেনদেনেও বাড়ছে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ।


পুঁজিবাজারে মৌলভিত্তি খাত বলতেই ব্যাংকিং খাতকে বুঝানো হয়ে থাকে। এ খাতে বিনিয়োগ করলে একদিকে যেমন মুনাফার সম্ভাবনা থাকে, ঠিক তেমনই লোকসানেরও ভয় থাকে না। কিন্তু এ খাতের ব্যবস্থাপকদের দূরদর্শিতার অভাবে পুঁজিবাজার হারিয়েছে তার স্বাভাবিক গতি, আর সেই সঙ্গে ব্যাংকিং খাত হারিয়েছে তার আধিপত্য।


দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা ৩০টি। এছাড়া দেশীয় তফসিলি ব্যাংকগুলোর মধ্যে পুঁজিবাজারের বাইরে রয়েছে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, বাংলাদেশ উন্নয়ন ব্যাংক (বিডিবিএল), বেসিক ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, আনসার-ভিডিপি ব্যাংক। এর মধ্যে জনতা ব্যাংক লিমিটেড প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে শেয়ার ছেড়ে তালিকাভুক্ত হওয়ার আবেদন করেছে। বেসিক ব্যাংক আইপিও ইস্যুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েও পরে আর অগ্রসর হয়নি। গত ৩ দশকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ খাতের ৯টি ব্যাংক ৮০’র দশকে, ৩টি ব্যাংক ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে এবং ১৮টি ব্যাংক ২০০০ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে।


জানা গেছে, পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা রক্ষায় ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সময়ের বিবর্তনে দেশের পুঁজিবাজারে এ খাতের মূলধন ক্রমেই বেড়েছে। যদিও ২০১০ সালের ধস এবং ধস পরবর্তী ধারাবাহিক মন্দায় এ খাতের বাজার মূলধন অনেকটাই কমেছিল। তবুও তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর গড় রিজার্ভের পরিমাণ অনেকটাই বেড়েছে। যার পরিমাণ ৯৪৫ কোটি ৬২ লাখ ২ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর এ খাতের মোট রিজার্ভের পরিমাণ ২৮ হাজার ৩৬৮ কোটি ৬০ লাখ ৮০ হাজার টাকা।


এরমধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে। ব্যাংকটির রিজার্ভের পরিমাণ ৩ হাজার ২৭৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এছাড়া এবি ব্যাংকের ১ হাজার ৬৮৩ কোটি ৪৮ লাখ ২০ হাজার টাকা, সিটি ব্যাংকের ১ হাজার ৫০৮ কোটি ৫৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ৭৬০ কোটি ৭৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১ হাজার ৩৬৮ কোটি ৭৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা, পূবালী ব্যাংকের ১ হাজার ৫০০ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা, রুপালী ব্যাংকের ৫৯৯ কোটি ৬১ লাখ ১০ হাজার টাকা, ইউসিবিএলের ১ হাজার ৩৮৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা।


উত্তরা ব্যাংকের ৯৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, ইস্টার্ণ ব্যাংকের ১ হাজার ৩৪৫ কোটি ১৮ লাখ ১০ হাজার টাকা, আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংকের ৯৬৬ কোটি ৭৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা, প্রাইম ব্যাংকের ১ হাজার ২৭৫ কোটি ৮৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা, সাউথইস্ট ব্যাংকের ১ হাজার ৭৩৫ কোটি ৪০ লাখ ৬০ হাজার টাকা, ঢাকা ব্যাংকের ৭৬৯ কোটি ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা, এনসিসি ব্যাংকের ৬৮৫ কোটি ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা, এসআইবিএলের ৬৮১ কোটি ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ১ হাজার ৫০৪ কোটি ৯০ লাখ ৯০ হাজার টাকা, এমটিবিএলের ৪৪৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৪৬৫ কোটি ৪৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা, ওয়ান ব্যাংকের ৫২৭ কোটি ৮৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা, ব্যাংক এশিয়ার ৮৯৯ কোটি ৩৩ লাখ ২০ হাজার টাকা।


মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ৯০৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ১ হাজার ২৩৪ কোটি ৫১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, যমুনা ব্যাংকের ৯৫৮ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার টাকা, ব্র্যাক ব্যাংকের ৮৫৫ কোটি ২৬ লাখ ১০ হাজার টাকা, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ৫২৯ কোটি ১০ হাজার টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৩৪২ কোটি ৩৯ লাখ ২০ হাজার টাকা, ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫৯৪ কোটি ৬৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ২৯০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার রিজার্ভ রয়েছে।

আর আইসিবি ইসলামীক ব্যাংক ১ হাজার ৬৬৯ কোটি ২১ লাখ টাকার পূঞ্জীভূত লোকসান গুণছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারে অন্য কোম্পানিগুলোর চেয়ে ব্যাংকে বিনিয়োগ অনেকটা টেকসই। কারণ ব্যাংকগুলোর পোর্টফোলিও ম্যানেজার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোম্পানির ভালো মৌলভিত্তি দেখেই শেয়ারে বিনিয়োগ করেন। পুঁজিবাজারে নিয়মিত ব্যাংকের বিনিয়োগ থাকলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে অনেকটা আস্থা ফিরে পায়। আর ব্যাংকের বিনিয়োগ হ্রাস পেলে বাজারে কিছুটা হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে থাকে।


জানা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজারে অন্য খাতের কোম্পানির সংখ্যা অনেক বেড়েছে। গ্রামীণফোন, তিতাস গ্যাসের মতো বিশাল মূলধনের কোম্পানি বাজারে এসেছে। বাজারে ভালো মৌলভিত্তির শেয়ারের সংখ্যাও এখন অনেক। এছাড়া মূলধন ও শেয়ার সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগের মতো ঝোঁক নেই। এ কারণেই গত কয়েক বছরে বাজার মূলধন ও মোট লেনদেনে ব্যাংক খাতের অংশ কমেছে। বিশেষ করে ২০১১ সালে টানা মন্দায় ব্যাংকের তুলনায় ওইসব কোম্পানির বেশি দরপতন হওয়ায় বাজার মূলধন ও লেনদেনে ব্যাংকের অবস্থানের কিছুটা উন্নতি হয়েছে।


বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিংয়ের কারণে ব্যাংকিং খাতের কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম ও হিসাবের স্বচ্ছতা অন্য কোম্পানির তুলনায় কিছুটা ভালো। বেশিরভাগ ব্যাংক তালিকাভুক্তির পর থেকেই নিয়মিত ডিভিডেন্ড দিয়ে আসছে। অন্যদিকে কয়েক বছর আগেও বাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা কম ছিল। এ কারণে ব্যাংকের শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তুলনামূলক বেশি ছিল। ফলে বাজার মূলধনের অংশের দিক থেকে ব্যাংকিং খাত সবার শীর্ষে ছিল। ৫ বছর আগেও মোট বাজার মূলধনের অর্ধেক ব্যাংকিং খাতের দখলে ছিল।


তারা বলেন, ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে এ খাতের কোম্পানিগুলো বিনিয়োগে আসার কারণেই ২০০৭ সালের পর থেকেই পুঁজিবাজারে ব্যাংকিং খাতের মূলধনের পরিমাণ বাড়তে থাকে। কিন্তু বেশি মুনাফার আশায় বাজারে এ খাতের কোম্পানিগুলোর মাত্রাতিরিক্ত বিনিয়োগই তাদের সামনে কাল হয়ে দাঁড়ায়। ২০১০ সালের ধস ও ধস পরবর্তী ধারাবাহিক মন্দা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিনিয়োগের লাগাম টেনে ধরার কারণেই ধারাবাহিকভাবে বাজার মূলধনের পরিমাণ কমেছে। এছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিভিন্ন ব্যাংকিং অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি, মূলধন ঘাটতি ও এ খাতে চরম অব্যবস্থাপনাও এর অন্যতম কারণ।


তারা আরো বলেন, বর্তমান সময়ে বাজার স্থিতিশীলতার পথে হাঁটছে। আর বাজারে স্থায়ী স্থিতিশীলতা ফিরে আসলে এক সময়ে বাজার থেকে যেসব বিনিয়োগকারী মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, তারা আবারো বিনিয়োগে আসবেন। কাজেই এ সময়ে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসা যতটা জরুরি, ঠিক নিজেদের স্বার্থে এ খাতের কোম্পানিগুলোর পুনঃবিনিয়োগও জরুরি। আর এ দুটি বিষয়ের সমন্বয় হলেই ব্যাংকিং খাত তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে এবং বাজারে এ খাতের মূলধনের পরিমাণ ৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করেন তারা।




শেয়ারনিউজ/ঢাকা, ১৯ আগস্ট ২০১৭