Print
প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ

এক যুগে মূলধন সংগ্রহ করেছে ১৭৬ কোম্পানি





বিশেষ প্রতিবেদক:

দেশের পুঁজিবাজারে বিগত এক যুগ বা ১২ বছরে (২০০৫ সাল থেকে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৭ কোটি ৮২ লাখ টাকার মূলধন বেড়েছে। শতাংশ হিসেবে যা ১ হাজার ১০০ শতাংশেরও বেশি। আলোচ্য সময়ে বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে ১৭৬টি। বাজারে নতুন নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে মূলধন বাড়লেও কমেনি বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পরিমাণ। বরং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, আইনী জটিলতা ও নীতি-নির্ধারনী মহলের উদাসীনতায় দুর্বল কোম্পানিকে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এতে ওইসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। তবে বাজারে নতুন নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে মূলধন বাড়ার বিষয়টিকে স্বাধুবাদ জানালেও তালিকাভুক্ত কিছু কিছু কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।


তাদের মতে, একটি দেশের অর্থনৈতিক বিকাশে বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্তির মাধ্যমে জনগনের সম্পৃক্ততা আনা জরুরি। তবে যেকোনো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয়ার আগে কোম্পানির প্রকৃত অবস্থার যাচাইÑবাছাই করা উচিত। কারণ একটি কোম্পানিতে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর ভাগ্যের বিষয়টি জড়িত। তারা বলেন, একটি কোম্পানির তালিকাভুক্তির পেছনে ইস্যু ম্যানেজারের বড় ভূমিকা থাকে। আর ইস্যু ম্যানেজার যখনি কোম্পানির সার্বিক অবস্থার পর্যবেক্ষন করে ওই কোম্পানি সম্পর্কে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে প্রসপেক্টাস বিএসইসিতে জমা দেয়, এরপরই বিএসইসি কোম্পানির সার্বিক অবস্থা যাচাই-বাছাই করে আইপিওতে অনুমোদন দিয়ে থাকে। এখন কথা হচ্ছে- এতোবার যাচাই-বাছাইয়ের পরও কিভাবে দুর্বল ও বিতর্কিত কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্তির অনুমোদন পায়।


এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তিবর্গের হস্তক্ষেপে শুধুমাত্র কাগজে কলমে তৈরী করা প্রতিবেদনের মাধ্যমেই এসব দুর্বল কোম্পানি তালিকাভুক্তির অনুমোদন নিয়ে থাকে। তারা জানান, বাজারের স্বার্থে নতুন নতুন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসা জরুরী। তবে সেটা যেন বাজারের জন্য বোঝা না হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। আর এজন্য যেকোন কোম্পানিকে তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয়ার আগে কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, উৎপাদন সক্ষমতা, দায় ও স্থায়ী ও অস্থায়ী সম্পত্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরী। এক্ষেত্রে সবার আগে ইস্যু ম্যানেজারদেরকেই গুরু দায়িত্ব পালন করতে হবে। বাজারের স্থায়ী স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের বিষয়টি মাথায় রেখে যদি বাজারের নীতি-নির্ধারণী মহল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রেখে একযুগে কাজ করে, তাহলেই একটি স্থিতিশীল বাজার গঠন করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন।


অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে ১৭৬টি। সেই সঙ্গে বাজারে নতুন মূলধন বেড়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা। শতাংশ হিসেবে যা ১১৪০ শতাংশ। এরমধ্যে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ৩০৩টি। এর মধ্যে আইপিও অনুমোদন পেয়েছে ১৮ কোম্পানি। এ সময়ে বাজারে কোম্পানিগুলোর মূলধনের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৫৭২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। পরবর্তীতে তা ক্রমেই বেড়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা ও মূলধন যথাক্রমে ৫৬২টি ও ১ লাখ ১৪ হাজার ৯১০ কোটি ৮ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। আলোচ্য সময়ে মোট ১৭৬টি কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করেছে। যদিও আলোচ্য সময়ে কিছু কিছু কোম্পানিকে মূলমার্কেট থেকে ওটিসিতে পাঠানোর কারণে মূলমার্কেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা কমেছিল।


বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুঁজিবাজারে যতো বেশি কোম্পানি আসবে বাজারের পরিধির ততই বিস্তৃতি ঘটবে। কিন্তু কোম্পানিগুলো যখন আইপিও’র মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়- তখন নানা বিতর্কের জন্ম দেয়। এ নেপথ্যে যুক্তিসঙ্গত কারণও থাকে। কখনও আইনি ফাঁক-ফোকর দিয়ে আর কখনও বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখ এড়িয়ে অনেক দুর্বল কোম্পানি প্রিমিয়াম নিয়ে বাজারে ঢুকে পড়ছে, পরবর্তীতে যেগুলো বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। প্রিমিয়ার নেয়া এসব কোম্পানিকে দেখে অন্য দুর্বল কোম্পানিও বাজারে আসার ব্যাপারে উৎসাহিত হন।


এতে বাজারে কোম্পানির সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু গুণগত কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। বরং এ ধরনের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লোকসান আরো বেড়ে যাচ্ছে। এতে পুঁজিবাজারের অস্বচ্ছতা ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করায় অনেক ভালো ও মৌলভিত্তির কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হচ্ছে না। তবে পুঁজিবাজারকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে উন্নীত করা গেলে অবশ্যই ভালো কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হবে। ফলশ্রুতিতে বাজারে স্থায়ী স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ নিরাপদ হবে বলে তারা মনে করেন।



শেয়ারনিউজ২৪/ঢাকা ১৭ জুলাই ২০১৭