Print
প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ

বাজারের নিয়ন্ত্রন নিচ্ছে লোকসানি কোম্পানি!




এইচ কে জনি:

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সার্ভিল্যান্স বিভাগ পুঁজিবাজারের অনিয়মরোধে তেমন কোনো কাজেই আসছে না। দাতা সংস্থা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) আর্থিক সহায়তায় পূর্ণাঙ্গ ও অত্যাধুনিক সফটওয়্যার সংযোজনের পরও বাজার তদারকিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না বিএসইসির এ বিভাগ। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক স্বল্পমূলধনি ও লোকসানি শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বাড়লেও কারসাজিকারীদের চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বিএসইসি। এতে করে বাজারের অনিয়মরোধে বিএসইসির এ বিভাগের ভূমিকা প্রশ্ন তুলেছেন বিনিয়োগকারী ও বাজার সংশ্লিষ্টরা।


জানা গেছে, ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার স্থাপন করে বিএসইসি। পুঁজিবাজারে নজরদারি আরো জোরদার করতে দাতা সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহযোগিতায় এ সফটওয়্যার চালু করা হয়। ক্যাপিটাল মার্কেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম-১ এর আওতায় নতুন সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার স্থাপনের অর্থ খরচ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এর কোন অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একাধিকবার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময় বাড়ানো কিংবা নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।


‘অনিয়মরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না সার্ভিল্যান্স বিভাগ’


এদিকে মাসের পর মাস স্বল্পমূলধনী ও লোকসানি কোম্পানির শেয়ার দর অস্বাভাবিকহারে বাড়ার পরও কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান ছাড়া স্টক এক্সচেঞ্জ ও বিএসইসিকে তেমন কিছুই করতে দেখা যায় না। এ নিয়েও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষোভের কমতি নেই। এ সময় তারা প্রকৌশল খাতের লোকসানি কোম্পানির অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির পরও বিএসইসির নিশ্চুপ ভূমিকার সমালোচনা করেন।


তারা মনে করছেন, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিএসইসি অনিয়ম রোধের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তদন্তের নামে বিনিয়োগকারীদের আশার বাণী শোনাচ্ছে।


জানা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি কে অ্যান্ড কিউ মাত্র ৬০ কার্যদিবসের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। অর্থ্যাৎ গত ১৬ এপ্রিল কে অ্যান্ড কিউ’র শেয়ার দর ৩৮ টাকার ঘরে থাকলেও মাত্র ৬০ কার্যদিবসের ব্যবধানে গত বৃহস্পতিবার তা ৭৪.৫০ টাকায় শেষ লেনদেন হয়। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ৯৬ শতাংশেরও বেশি। অথচ এ সময়ে ডিএসই’র পক্ষ থেকে দুইবার অস্বাভাবিক শেয়ার দর বৃদ্ধির কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। জবাবে কোম্পানিটিও গতানুগতিক উত্তর দিয়েছে যে, কোন অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য তাদের কাছে নাই।


‘নোটিশ পাঠানোতে সীমাবদ্ধ ডিএসই ও সিএসই’র কার্যক্রম’


তথ্যানুযায়ী, লোকসানি এ কোম্পানিটি বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন করছে। টানা লোকসান আর নো ডিভিডেন্ডের কারণে এ কোম্পানিতে যেকোন বিনিয়োগকারীর আগ্রহ না থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ কোম্পানিটির ক্ষেত্রে তার উল্টো চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। পূঞ্জীভূত লোকসানের পাশাপাশি নো ডিভিডেন্ড ও স্টক এক্সচেঞ্জের সতর্ক বার্তা কিংবা শোকজ কোন কিছুই যেন কাজে আসছে না।


এখন প্রশ্ন হলো, যে কোম্পানিটি পূঞ্জীভূত লোকসানের ভারে ন্যূব্জ, বছরের পর বছর বিনিয়োগকারীদের নো ডিভিডেন্ড ঘোষণার মাধ্যমে হতাশ করছে- ঠিক কোন কারণে তার শেয়ার দর অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এমনকি এ কোম্পানিটির লেনদেন অথবা শেয়ার দর নিয়ে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) নোটিশ পাঠানোর মাধ্যমে বারবার প্রশ্ন তোলার পরও কোন কারণে এ শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা আরও বেশি জেকে বসছেন? তাহলে কি এটাই ধরে নিতে হবে যে, এ শেয়ারে এমন কোন মধু আছে যা বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে আরও বেশি ত্বরান্বিত করবে, নাকি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগকৃত পুঁজির ওপর কোন মায়া নেই- এমন প্রশ্নও তুলছেন বাজারের অধিকাংশ বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকরা।


‘১০ টাকার একটি লোকসানি কোম্পানির শেয়ার দরের এমন উলম্ফন মোটেও স্বাভাবিক হতে পারে না।’


তাদের মতে, ১০ টাকার একটি লোকসানি কোম্পানির শেয়ার দরের এমন উলম্ফন মোটেও স্বাভাবিক হতে পারে না। স্বল্প মূলধনী ‘জেড’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানিটির শেয়ার সংখ্যা কম হওয়ায় মুষ্ঠিমেয় কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যাক্তি অধিকাংশ শেয়ার নিজেদের দখলে রেখে দর নিয়ন্ত্রন করছে। তা না হয়, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এতোটাই উন্মাদ হয়ে যায়নি যে, যেখানে বিনিয়োগে খালি হাতে ফিরতে হবে, সেখানে শেষ সম্বলটুকু উৎসর্গ করে দেবে। আর এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে শুধমাত্র কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদানের নাটকীয়তায় সীমাবদ্ধ না থেকে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে স্বল সময়ের মধ্যে কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য তারা বাজারের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টি আকর্ষন করেন। এ সময় তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার ও সার্ভিল্যান্স বিভাগের কার্যক্রমের সমালোচনা করেন।


তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ‘জেড’ ক্যাটাগরির এ কোম্পানিটি ১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ১০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের এ কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। কোম্পানিটির পূঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ১০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।


কে অ্যান্ড কিউ সর্বশেষ ২০১০ সালে সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডারদের ৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিলেও এরপর থেকে আজ অবধি তাদের ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। ২০১১ থেকে ২০১৬ এ সময়ের মধ্যে শুধুমাত্র ২০১৫ সালে নামমাত্র মুনাফা (০.০১ টাকা) করলেও বাকি সময়টুকু শুধুমাত্র লোকসানই গুণেছে।


শুধু তাই নয়, কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকেরা সিকিউরিটিজ আইনের কোন পরোয়াই করেন নাই। সিকিউরিটিজ আইন অনুসারে কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তারা তা পরিপালন করেননি। উপরন্তু তাদের হাতে থাকা শেয়ারও বিনিয়োগকারীদের হাতে গুজে দিয়েছেন। অর্থ্যাৎ ৩০ জুন ২০১৬ শেষে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ২৫.৪১ শতাংশ শেয়ার থাকলেও ৩০ জুন ২০১৭ শেষে ২৪.০৬ শতাংশে নেমে এসেছে। যা যোগ হয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোঠায়। তবে আলোচ্য সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা শেয়ার সংখ্যায় কোন পরিবর্তন আসেনি।


প্রসঙ্গত, ৩০ জুন ২০১৭ শেষে কোম্পানিটির মোট ৪৯ লাখ ২ হাজার ৫৩০টি শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা/পরিচালকদের হাতে ২৪.০৬ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩.৮৪ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৭২.১০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।


বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অত্যাধুনিক সার্ভিল্যান্স সফটওয়্যার থাকার পরও তদারকি ও নজরদারিতে দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে কারসাজি রোধ করতে পারছে না বিএসইসি। এছাড়া গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময়ে নতুন নতুন আইন তৈরি ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতির মাধ্যমে কমিশন বিনিয়োগকারীর আস্থা অর্জনের চেষ্টা চালালেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দুর্বল তদারকি ব্যবস্থার কারণে প্রতিবারই ব্যর্থ হচ্ছে কমিশন। এমতাবস্থায় বাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাজার সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই বলে মনে করেন তারা।


তাদের মতে, পুঁজিবাজারের চলমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে। বাজার গতি বিধির বিষয়টিও বিনিয়োগকারীদের জানার মধ্যে থাকতে হবে। আর এই বিষয়গুলো সাধারণ বিনিয়োগকারিদের নখদর্পনে রাখতে তাদের বাজার সম্পর্কে পরিপূর্ন ধারনা প্রদান করতে হবে। আর এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ ও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিভিন্ন খাতের কোম্পানি, যারা সিএসআরে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে; তাদের এগিয়ে আসতে হবে।


জানতে চাইলে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফখর উদ্দীন আলী আহমেদ জানান, বিনিয়োগকারীরা বাজার সম্পর্কে সচেতন না হলে শুধুমাত্র সার্ভিল্যান্স বিভাগের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রন সম্ভব নয়। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বর্তমান বাজারে কতিপয় স্বল্পমূলধনী কোম্পানির শেয়ার দর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। এখন বিনিয়োগকারীদের এটা বুঝতে হবে যে, যেখানে মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ার দর কমছে; সেখানে কিভাবে স্বল্পমূলধনী একটি কোম্পানির শেয়ার দর বাড়ছে? আর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সেটা না বুঝে যদি গুজবে কান দিয়ে ওই শেয়ারে হুমড়ি খেয়ে বিনিয়োগ করে তাহলে বাজারে ম্যানুপুলেটিং বাড়বে। এতে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে না। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রকসংস্থা বিএসইসিসহ স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে আমরা প্রায়ই বলে থাকতাম যে, ফান্ডামেন্টাল কোম্পানিতে বিনিয়োগ করুন অথবা কোম্পানির ইপিএস, এনএভি ও পিই রেশিও দেখে বিনিয়োগ করুন। এখন এগুলো বলে আর কোন লাভ নেই। কারণ বাজার তার উল্টো দিকে হাটছে। বাজারের এই পরিস্থিতিতে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ন সেটি হচ্ছে বাজার সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা আরো বাড়াতে হবে।




শেয়ারনিউজ/ঢাকা, ১৫ জুলাই ২০১৭