Print
প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ

রাষ্ট্রীয় ১৯ প্রতিষ্ঠানে আটকে আছে ২৮ হাজার কোটি টাকা



এইচ কে জনি:

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীণ সংস্থাগুলো রাষ্ট্রের উপকারে আসার বদলে উল্টো রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাংকিং খাতের হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে আছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার ১৯ প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাওনার পরিমাণ প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার মোট শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের পরিমাণ ২১২ কোটি ৭২ লাখ টাকা। অর্থমন্ত্রনালয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।


সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। এ কারণে প্রতিবছর উৎপাদনের তুলনায় অপচয় হচ্ছে বেশি। রাষ্ট্রায়ত্ত এসব প্রতিষ্ঠানে অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করা গেলে সংস্থাগুলোকে লাভজনক করা সম্ভব। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, রাষ্ট্রায়ত্ব এ সংস্থাগুলো চরম অব্যবস্থাপনা, নজরদারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতির রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতির কারণে লোকসানের বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসতে পারছে না। বছরের পর বছর ধরে লোকসানের থাকার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর রাষ্ট্রীয় মালিকানা ছেড়ে দেয়ার দাবি উঠছে। বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হলে সরকারকে আর লোকসানের বোঝা বইতে হবে না।


বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৭ প্রতিবেদনে জানা গেছে, সরকারী ১৯ প্রতিষ্ঠানের কাছে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাওনার পরিমাণ ২৭ হাজার ৯২৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিপিডিবি) ১১ হাজার ৪৮৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা, বাংলাদেশ সুগার এ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিএসএফআইসি) ৪ হাজার ৪১৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনে (বিপিসি) ৪ হাজার ১০৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ২ হাজার ৬০৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা, বাংলাদেশ এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (বিএডিসি) ১ হাজার ৮০৮ কোটি ৩ লাখ টাকা, বাংলাদেশ অয়েল গ্যাস এ্যান্ড মিনারেল করপোরেশন (বিওজিএমসি) ৫৭৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা, বাংলাদেশ ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (বিডব্লিউডিবি) ৬২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) ৮০০ কোটি ১ লাখ টাকা, বাংলাদেশ স্টীল ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (বিএসইসি) ২১১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটি (সিপিএ) ৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমসি) ২৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এছাড়া শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ রয়েছে বিসিআইসি ১২৭ কোটি ১২ লাখ টাকা, বিটিএমসি ২৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, বিএডিসি ২১ কোটি ২৭ লাখ টাকা, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড (বিটিবি) ১০ কোটি ৫২ লাখ টাকা, বিএসএফআইসি ৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানাভাবে লাভজনক করার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেশি দায়ী। তিনি বলেন, অতীতের তুলনায় ঋণ ও ভর্তুকি কিছুটা কমেছে। তবে এটা আরো কমা উচিত।


এ প্রসঙ্গে বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের দক্ষতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করতে না পারলে অপচয় হ্রাস পাবে না। তিনি বলেন, পাশাপাশি সরকার এসব প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দিচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছেও প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় দিন দিন বেড়েই চলছে। আর এসব সংস্থার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার দুর্নামের ভাগি হচ্ছে। অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করা গেলে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের এ সংস্থাগুলোকে লাভজনক করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।


সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো সেক্টর সরকারি মালিকানায় থাকলে তাতে দুর্নীতি হবে- এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো গনতান্ত্রিক দেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যবস্থাপনা পরিষদের পরিবর্তন হয়ে থাকে। এতে করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে না। শুরু হয় দূর্নীতি আর লুটপাট। এতে করে সরকার বড় অংকের রাজস্ব হাঁরায় তো বটেই। পাশাপাশি সে প্রতিষ্ঠানের লোকসানের বোঝা সরকারকেই বহন করতে হয়। যার পরিণতিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা খাতে এবং দেশের কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় না।


তারা বলেন, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার কথা, সেখানে উল্টো এদের ঘাটতি পূরনে বাজেটে বিশাল অংকের বরাদ্দ রাখতে হয়। এছাড়া তাদের কাছে এ বিশাল পরিমাণ অর্থ আটকে থাকায় ব্যাংকগুলোতেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। পরিণতিতে দেশের অতীব গুরুত্বপূর্ন খাতের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যহত হয়। কাজেই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নসহ সকল দিক বিবেচনা করে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেয়ার পক্ষে মত দেন তারা।



শেয়ারনিউজ/ঢাকা, ১৯ জুন ২০১৭