Print
প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ

রাষ্ট্রীয় জীবন বীমার তুলনায় বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি ১২০০ শতাংশেরও বেশি




এইচ কে জনি:

১৪ বছরের ব্যবধানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জীবন বীমা করপোরেশনের তুলনায় বেসরকারি জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রিমিয়াম আয় ১ হাজার ২০০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অর্থ্যাৎ ২০০২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এ ১৪ বছরে যেখানে রাষ্ট্রীয় জীবন বীমার প্রিমিয়াম আয় ৪ হাজার কোটি ৩ লাখ টাকা; সেখানে বেসরকারী খাতের প্রিমিয়াম আয় ৫৬ হাজার ৭৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। মুলত আইনী দুর্বলতা, সরকারের নজরদারি, আইনের সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় রাষ্ট্রীয় জীবন বীমা করপোরেশনের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে না বলে মনে করছেন বীমা খাত সংশ্লিষ্টরা।


তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বীমা করপোরেশনগুলো রাষ্ট্রের উন্নয়নে তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বিশেষ কোন প্রনোদনা না থাকায় গ্রাহক স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটে।


তারা আরও বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এসব সমস্যার কারণেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব প্রতিষ্ঠান লোকসানের মধ্যে থাকে। যার ফলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়। আর তখনই একটি দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় না।


উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, অচল ঘোড়া বা হাতি ঘরে রাখতে হয় না। তাদেরকে মেরে ফেলতে হয়। কারন, তখন এগুলো মনিবের কোন কাজেই আসে না, উল্টো বোঝা হয়ে যায়। তদ্রুপ রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান যখন রাষ্ট্রের উপকারে না এসে উল্টো রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে যায় তখন সেগুলোকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রাখার প্রয়োজন নেই বলে তারা মনে করেন।


তারা বলেন, রাষ্ট্রীয় এ বীমা করপোরেশনগুলোতে গ্রাহক দাবি পরিশোধে দীর্ঘসূত্রীতার কারণে গ্রাহকেরা সরকারি এ প্রতিষ্ঠান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আর এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদবী থেকে ব্যবস্থাপক পর্যন্ত কাজের কোন বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ ব্যবসায় হোক আর না হোক চাকুরী যাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। অথচ বেসকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে টপ টু বটম পর্যন্ত জবাবদিহিতার আওতায় থাকে। ব্যবসায়ে ভালো সাফল্য আনতে পারলে সবার জন্যই থাকে বিশেষ প্রনোদনা। এছাড়া ব্যবসায়ীক সাফল্যের জন্য দ্রুততম সময়ে গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষনসহ দাবি পরিশোধে তারা বদ্ধপরিকর। এছাড়া বেসরকারি খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। এতে প্রতিষ্ঠানে সাধারণ জনগনের সম্পৃক্ততা থাকায় প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা বেড়েছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অর্থের যোগানও বেড়েছে।


সর্বশেষ প্রকাশিত বাংলাদেশ অর্থনেতিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে বেসরকারি খাতের ৪৫টি সাধারণ বীমা ও ৩১টি জীবন বীমা কোম্পানি বীমা ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছে। এছাড়া সরকারি খাতের জীবন বীমা করপোরেশন ও সাধারণ বীমা করপোরেশন বীমা ব্যবসা করছে। ২০০২ সালে বেসরকারি জীবন বীমা কোম্পানির মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ৮২৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। যা ২০১৫ সালে বেড়ে ৬ হাজার ৯২৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এরমধ্যে ২০০৩ সালে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা, ২০০৪ সালে ১ হাজার ৩৩৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ২০০৫ সালে ১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা, ২০০৬ সালে ২ হাজার ৪৫৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ২০০৭ সালে ২ হাজার ৯১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ২০০৮ সালে ৩ হাজার ৫৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ২০০৯ সালে ৪ হাজার ৫৯৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ২০১০ সালে ৫ হাজার ৫০৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ২০১১ সালে ৫ হাজার ৯৭৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ২০১২ সালে ৬ হাজার ২৪৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ২০১৩ সালে ৬ হাজার ১০২ কোটি টাকা এবং ২০১৪ সালে ৬ হাজার ৬৮৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা আয় করেছে।


এদিকে, ২০০২ সালে সরকারি জীবন বীমা কোম্পানির মোট প্রিমিয়াম আয় ছিল ১৭৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। যা ২০১৫ সালে বেড়ে ৪০১ কোটি ৫০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ২০০২ সালে ১৭৯ কোটি ২০ লাখ টাকা, ২০০৩ সালে ১৯৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ২০০৪ সালে ১৭৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ২০০৫ সালে ২০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা, ২০০৬ সালে ২২৩ কোটি ৪ লাখ টাকা, ২০০৭ সালে ২৬৫ কোটি টাকা, ২০০৮ সালে ৩০৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ২০০৯ সালে ৩৩৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা, ২০১০ সালে ৩৪৬ কোটি টাকা, ২০১১ সালে ৩০৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা, ২০১২ সালে ৩৪৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, ২০১৩ সালে ৩২৬ কোটি টাকা এবং ২০১৪ সালে ৩৮৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা আয় করেছে।


এদিকে আলোচ্য সময়ের মধ্যে সরকারি খাত তথা জীবন বীমা করপোরেশনের প্রবৃদ্ধির হার ২০০২ সালে ঋণাত্মক ৮.৮০ শতাংশ, ২০০৩ সালে ৮.২০ শতাংশ, ২০০৪ সালে ঋণাত্মক ৮.৩০ শতাংশ, ২০০৫ সালে ১৪.৬০ শতাংশ, ২০০৬ সালে ৯.৭০ শতাংশ, ২০০৭ সালে ১৮.৬০ শতাংশ, ২০০৮ সালে ১৬.২০ শতাংশ, ২০০৯ সালে ৮.৭০ শতাংশ, ২০১০ সালে ৩.৪০ শতাংশ, ২০১১ সালে ঋণাত্মক ১১ শতাংশ, ২০১২ সালে ১১.৫০ শতাংশ, ২০১৩ সালে ঋণাত্মক ৫ শতাংশ, ২০১৪ সালে ১৯.৬১ শতাংশ, এবং ২০১৫ সালে ২.৯৭ শতাংশ ছিল।


অন্যদিকে বেসরকারি জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবৃদ্ধির হার ২০০২ সালে ২৮.৬০ শতাংশ, ২০০৩ সালে ২৮ শতাংশ, ২০০৪ সালে ২৬.১০ শতাংশ, ২০০৫ সালে ৩৭.৮০ শতাংশ, ২০০৬ সালে ৩৩.৬০ শতাংশ, ২০০৭ সালে ১৮.৬০ শতাংশ, ২০০৮ সালে ২৩.৩০ শতাংশ, ২০০৯ সালে ২৭.৭০ শতাংশ, ২০১০ সালে ১৯.৯০ শতাংশ, ২০১১ সালে ৮.৪০ শতাংশ, ২০১২ সালে ৪.৫০ শতাংশ, ২০১৩ সালে ঋণাত্মক ২.৩০ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৯.৬০ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে ৩.৬০ শতাংশ ছিল।


অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যে কোনো সংস্থা সরকারি মালিকানায় থাকলে তাতে দুর্নীতি হবে -এটাই স্বাভাবিক, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক দেশে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যবস্থাপনা পরিষদের পরিবর্তন হবার কারণে ওই সংস্থাগুলোর কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে না। শুরু হয় দুর্নীতি আর লুটপাট। এতে করে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারায়, পাশাপাশি সেই সংস্থার মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান লোকসানে থাকে। আর সেই লোকসানের বোঝা সরকারকেই বহন করতে হয়। পরিণতিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা খাতে এবং দেশের কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় না।




শেয়ারনিউজ/ঢাকা, ১৭ জুন ২০১৭