Print
প্রচ্ছদ » সাক্ষাৎকার

শেয়ারে বিনিয়োগের সাধারণ ভুল

ঢাকা, ১২ নভেম্বর ২০১৭:

শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব দেশের বিনিয়োগকারীরাই ভুল করে, তবে আমাদের বাজারে ভুলটা বেশিই করে। অন্য পরিস্থাপক বাজারগুলোতে একটা যৌক্তিক স্পেকুলেশন হয়। কিন্তু আমাদের বাজারটাতে স্পেকুলেশনের স্থলে স্রেফ জুয়া খেলা হয়। সত্য হলো, আমাদের বাজারে হঠাৎ করে কোনো শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকলে এ কারণে নয় যে, ঐ শেয়ারের পেছনে হঠাৎ করে কোনো স্বর্ণখনি আবিষ্কৃত হয়েছে।

.

বরং এ কারণেই বেড়ে চলেছে যে এক ধরনের জুয়ার, সিন্ডিকেট চাহিদা সৃষ্টির পেছনে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় সারা বছরই দেখা যায় এবং আমার এও ধারণা, এক ধরনের জুয়া খেলা সারা বছর অনুষ্ঠিত হয় বলে বাজার বাড়তি কিছু বিনিয়োগকারীকে ধরে রাখতে পেরেছে।

জুয়ার উপাদান কী? জুয়ার প্রধান উপাদান হলো গ্রিড বা লোভ। অতি অল্প সময়ে বেশি ধনী হওয়ার আশায় বারবার শেয়ারবাজারে ট্রেডার্স হিসাবে আছে এমন লোকরা জুয়ার কোর্টে অংশ নেয়। শেষপর্যন্ত আসল জুয়াড়িরা জিতে এবং সাধারণ জুয়াড়ীরা শেষপর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা হেরে যায়। জুয়াড়িদের আসল উদ্দেশ্য হলো, লোভকে উসকে দেওয়া এবং এটা করতে গিয়ে যত বেশি সংখ্যার কথিত শেয়ার বিনিয়োগকারীর নামে আসলে শেয়ার ট্রেডার্সকে এ জুয়ার কোর্টে টেনে নিতে পারে ততটাই জুয়াড়িরা তাদের খেলাতে সফল হয়।

বাজারে যখন প্রকৃত বিনিয়োগকারীর তুলনায় শেয়ার ট্রেডার্সদের সংখ্যা বেশি হয় তখন জুয়া খেলাটা ভালো করে জমে। শেয়ার ট্রেডার্স হলো ওরা যারা চারদিন, ছয় দিন, দশদিনের দিন কেনা শেয়ারের লাভ লোকসান থেকে আবার বেচে দেয়। এরা কয়েক বছর তো দূরে থাক, কয়েক মাসের জন্যও শেয়ার ধারণ করতে চায় না।

আমাদের বাজারে যে কয়েকজন কথিত বিনিয়োগকারী অ্যাকটিভ বা তৎপর আছে তার ৮০%ই হলো ট্রেডার্স। ফল হচ্ছে, সিন্ডিকেট সদস্যরা এক একবার এক এক শেয়ারকে কৃত্রিম চাহিদা বৃদ্ধি করে, চূড়ান্ত মূল্যে নিয়ে যায়। চূড়ান্তে নেওয়ার সময়কাল তিন থেকে সাতদিন লাগে, বা একটু বেশি সময়ও লাগতে পারে। গুজব ছড়িয়ে দিতে এরা বিভিন্ন মাধ্যমকে ব্যবহার করে। এবং যখনই অতি ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর মুখে শোনা যায় অমুক শেয়ারের মুল্য বাড়বে তখন বুঝতে হবে জুয়াড়িরা তাদের খেলায় সফল হচ্ছে।

অন্য ব্যপারটি হলো, অধিকাংশ স্বল্প মেয়াদের জন্য বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির পেছনের আয় ব্যয়ের ব্যাপারটি বেমালুম ভুলে যায়। ফলে তারা সদ্য কথিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়। তথ্য পাওয়ার অনেক বৈধ পথ আছে বটে। তবে ৮০-৯০% ক্ষুদে এমনকি কখনো শত কোটি টাকার ফান্ড ম্যানেজাররা ঐ সব তথ্য ঘেটে দেখে না, ঐগুলো নিয়ে মিনি রিসার্চ করা তো দূরে থাক।

মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ম্যানেজারের যদি পাওয়ার অর্থে বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ হতো তাহলে মাত্র একবছরের মধ্যে তারা তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থের ৪০/৫০% হারিয়ে বসতো না। আমার কাছে মনে হয়ে অধিকাংশ ফান্ড ম্যানেজারই অজ্ঞ। তারাও জুয়াড়িদের খপ্পরে পড়ে ধনবানের অর্থকে লোপাট হতে দিচ্ছে।

বর্তমানে শেয়ারবাজারে সবচেড়ে বড় দুর্দিন তো হলো মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ক্ষেত্রে। অবস্থা এমনই যে নতুন করে কেউ আর মিউচুয়াল ফান্ড স্পন্সর করতে সাহস করবে না। কারণ হলো, মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য এখন প্রাইমারি বা আইপিও বাজারের অভাব। কেউ এ সব ফান্ড কিনতে আর আগ্রহী নয়।

শেয়ারবাজার বিনিয়োগে সাফল্যের জন্য তিনটি উপাদান অত্যাবশ্যক, যেগুলো আমি ট্রেনিং সেশনগুলোর লেকচারেও বলে থাকি। এ তিনটি উপাদান হলো, অর্থ, দক্ষতা এবং ধৈর্য। আমাদের বাজারে কতজন বিনিয়োগকারী এ তিনটি উপাদান এবং তা সে ধারণ করে? ওয়ারেন বাফেট বলেছিলেন, আপনি ঐ সব শেয়ারই কিনবেন যেসব শেয়ার কেনার পর বাজার বন্ধ হলেও ক্ষতি নেই, আপনি বছর শেষে ভালো মুনাফা পেতে থাকবেন। বাফেটের এ কথা মানে এমন বিনিয়োগকারী আমাদের বাজারে আছে কি?

আমি একটা কথা সব সময়ই বলি, তা হলো সফল বিনিয়োগকারী হওয়ার জন্য একজন সফল গবেষক হতে হবে। গবেষক হতে হবে কোনো একাডেমিক পেপার স্টাডি করার জন্য নয়, গবেষক হতে হবে নিজের বিনিয়োগ থেকে বেশি উপকার তুলে নেওয়ার জন্য। গবেষণার বিষয়বস্তুগুলো কী? বিষয়বস্তু হলো কোনো শেয়ারের ইনটেনসিভ ভ্যালু বা অর্থনৈতিক উপাদানগুলো দ্বারা নির্মিত অন্তর্নিহিত মূল্য কী। এটা বের করা এ জন্যই প্রয়োজন যাতে করে এ মূল্যের পেছনে আশ্রয় নেওয়া যায়।

যারা অভিজ্ঞ তারা আগে থেকেই তাদের পছন্দের শেয়ারগুলোর অন্তর্হিত মূল্যের ব্যাপারে সম্যক ধারণা রাখার কথা। একজন বিনিয়োগকারীর জন্য সব শেয়ারে অর্থ খাটানোর বিষয়টি কখনো বিবেচিত হতে পারে না। সে শুধু কয়েকটি শেয়ারেই তার পছন্দ সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। অন্য বিষয়টি হলো, মার্কেট ট্রেন্ড। মার্কেট ট্রেন্ড অন্তর্নিহিত মূল্যকে বদলে দিতে পারে।

তবে এ ক্ষেত্রে আন্তর্নিহিত মূল্য ততটা বদল হবে না। যেটা বদল হবে সেটা হলো বিনিয়োগকারীর অবস্থান। অর্থাৎ কোন মূল্যে কিনবে, কোন মূল্যে বেচবে। আপ-ট্রেন্ড মার্কেটে বিনিয়োগকারী অন্তর্নিহিত মূল্যের উপর শেয়ার কিনতে পারে। কারণ আপ-ট্রেন্ড যদি ভোলোটাইল অবস্থার দিকে গড়ায় তাহলে শেয়ার মূল্য অন্তর্নিহিত মূল্যের অনেক উপরে প্রবাহিত হতে পারে।

তবে দীর্ঘ মেয়াদে বাজার অর্থনৈতিক ফান্ডাম্যান্টালস দ্বারাই নির্ধারিত হবে। আর বিনিয়োগকারীদের অন্য ভুল হলো, তার লাভকে যত মূল্য দেয়, লোকসানকে সেইভাবে মূল্যায়িত করে না। লোকসানে বেচাও যে ক্ষতি সেটা অধিকাংশ বিনিয়োগকারী বুঝতে চায় না।

অন্য ভুল হলো, তারা ভোলোটাইল মার্কেটকে নর্মাল মার্কেটের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। ভোলোটাইল মার্কেটে স্পেকুলেটিভ শেয়ার বাই- সেল করে লাভ বেশি পাওয়া যায়। ডাউন ট্রেন্ড মার্কেটে বা বটমের কাছাকাছি মার্কেটে ডিফেন্সিভ বা রক্ষণাত্মক শেয়ারের পেছনে আশ্রয় নেওয়া উচিত। তবে সত্য হলো, অধিকাংশ বিনিয়োগকারী স্পেকুলেটিভ এবং ডিফেন্সিভ শেয়ারের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। ডাউন-ট্রেন্ড মার্কেটে স্পেকুলেটিভ শেয়ার তাড়াতাড়ি মূল্য হারায়।

শেয়ার মূল্য কোন কোন উপাদান দ্বারা নির্মিত হয়। উত্তর হলো, অনেক উপাদান দ্বারা। উল্লেখযোগ্য উপাদনগুলো হলো শেয়ার প্রতি আয় বা ইপিএস, শেয়ার প্রতি সম্পদ মূল্য বা এনএভি, শেয়ার প্রতি নগদ প্রবাহ বা ক্যাশ ফ্লো পার্চেস। শেয়ারের ধারণ কাঠামো, ম্যানেজমেন্টের গুণাগুণ ইত্যাদি।

তবে এর বাইরেও কিছু উপাদান আছে যেগুলো শেয়ারমূল্যকে প্রভাবিত করে। যেমন অর্থনীতিতে সুদের হার, মূল্যস্ফীতি এবং জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি। আস্থার ব্যাপারটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বাজারের উপর আস্থা বৃদ্ধি পেলে অন্য অর্থনৈতিক কারণগুলো যে দিকেই যাক না কেন সাময়িকভাবে হলেও শেয়ার মূল্য বেড়ে যাবে।

মনোস্তাত্ত্বিক উপাদান শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে, এবং ব্যক্তি নিজেও এই উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়। অধিকাংশ লোক যদি মনে করে, সামনের দিনগুলোতে বিশেষ বিশেষ কারণে শেয়ারের মূল্য বেড়ে যাবে তাহলে অবশ্যই শেয়ারের মূল্য বেড়ে যাবে।

আমরা যে গবেষণার কথা বলেছি, ওই গবেষণা করতে তথ্য-উপাত্ত কোথায় পাওয়া যাবে? যে সব সূত্র থেকে ওই সব পাওয়া যায় ওই সব সূত্র যে সব তথ্য উপাত্তকে সঠিকভাবে পরিবেশন করছে তার নিশ্চয়তা কি? সেই জন্যই গবেষককে সাবধান হতে হবে।

আবু আহমেদ: অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র-পরিবর্তন ডটকম