Print
প্রচ্ছদ » সাক্ষাৎকার

''ব্যবসা সম্প্রসারনে আইপিওতে আসছে ওইমেক্স ইলেকট্রোড''




ঢাকা, ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ :

এম এ মালেক। সম্প্রতি প্রাথমিক গণ প্রস্তাবের মাধ্যমে (আইপিও) অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন পাওয়া প্রকৌশল খাতের কোম্পানি ওইমেক্স ইলেকট্রোড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ৯০ এর দশকে। এরপর দুই বছর সরকারি চাকরিতে সম্পৃক্ত থাকলেও পরর্বতী দুই দশকে হয়ে উঠেছেন সফল উদ্যোক্তা। শূন্য থেকে শুরু করে আজ তিনি বিজনেস সেক্টরে আইকনে রূপান্তরিত হয়েছেন- সম্প্রতি শেয়ারনিউজ ডটকমের সাথে কথা বলেছেন এ উদ্যোক্তা। আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তার ব্যবসায়ের সফলতা, প্রতিবন্ধকতা, আইপিওতে আসাসহ বিভিন্ন ইস্যু। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহিদুর আলম।


শেয়ারনিউজ২৪.কম : সরকারি চাকুরি ছেড়ে ব্যবসায়ে এসেছেন কেন?

এম এ মালেক: বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালিখা কালীন সময় থেকে আমার জন্মস্থান কুষ্টিয়ার মানুষের জন্য কিছু কারার চিন্তা মাথায় ছিল। পড়ালিখা শেষে হঠাৎ সরকারি চাকুরিতে প্রবেশ করি, তার পরেও মাটি ও মানুষের টান। তাই মানষিক তাড়না থেকে চাকুরিতে যুক্ত হওয়ার দুই বছরে ব্যবধানে তা ত্যাগ করি। তার পর কুষ্টিয়ার পিপুলবাড়িয়ায় নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করি। আজ আমার প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫০০০ পরিবার যুক্ত। যা আমার স্বপ্ন ছিল।


শেয়ারনিউজ : আপনার ব্যবসা সম্পর্কে কিছু বলেন?

এম এ মালেক: আমার ব্যবসা সফল প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ওইমেক্স ইলেকট্রোড লিমিটেড। এটি একটি ইলেকট্রোড, নেইলস্ ও গ্যালভানাইজড ওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি। যা ইতোমধ্যে পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক গণ প্রস্তাবের মাধ্যমে (আইপিও) অর্থ উত্তোলনের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আনুমোদন পেয়েছে।


শেয়ারনিউজ : ওইমেক্স ইলেকট্রোড সম্পর্কে কিছু বলেন?

এম এ মালেক : ওইমেক্স ইলেকট্রোড ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইন মেনে ২০০৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু করে। তবে ওইমেক্স ইলেকট্রোড লিমিটেডের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১০ সালে। ২০১৪ সালের ২৫ আগস্ট এটি প্রাইভেট কোম্পানি থেকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। কোম্পানিটি ওয়েল্ডিং ইলেকট্রোড, জিআই তার ও তারকাঁটা প্রস্তুতকারক । পণ্যের গুণগত মানের কারণে বর্তমানে আমরা দেশের নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম।


শেয়ারনিউজ : ওইমেক্স ইলেকট্রোড আইপিও’র মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে কী পরিমাণ শেয়ার ছেড়ে কত টাকা উত্তোলন করবে?

এম এ মালেক: ১০ টাকা ইস্যু মূল্যে ওইমেক্স ইলেকট্রোড দেড় কোটি শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ১৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। এরই মধ্যে আমরা পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছ থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অনুমতি পেয়েছি। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর থেকে আইপিও আবেদন গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদনপত্র জমা নেওয়া হবে।


শেয়ারনিউজ : আইপিও’র মাধ্যমে উত্তোলিত অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হবে? এম এ মালেক: আইপিও'র মাধ্যমে ১৫ কোটি টাকা উত্তোলন করবে ওইমেক্স ইলেকট্রোড। উত্তোলিত অর্থের ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা দিয়ে মেশিনারিজ-ইকুইপমেন্ট ক্রয় করবে কোম্পানিটি। বাদবাকি অর্থের ৫ কোটি টাকায় ইসলামী ব্যাংকের ঋন পরিশোধ করবে কোম্পানিটি। আর ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা আইপিও সংক্রান্ত কাজে ব্যয় করা হবে।

আমরা মূলত ব্যবসা সম্প্রসারনের চিন্তা করছি। ওইমেক্স ইলেকট্রোডের উৎপাদিত প্রত্যেকটি পন্যই ব্যাপক জনপ্রিয়, তাই চাহিদা বেশি। তাই পুঁজিবাজার থেকে অর্থ উত্তোলনের প্রধান উদ্দ্যেশ্য কোম্পনির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এতে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ ও বিনিয়োগকারী উভয়পক্ষই উপকৃত হবে।


শেয়ারনিউজ : ব্যাংকের হাতে প্রচুর তারল্য-কম সুদে মিলছে ঋণ তবুও পুঁজিবাজার থেকে টাকা তুলছেন?

এম এ মালেক: পুঁজিবাজারে যাওয়ার কারণ হচ্ছে কোম্পানির জন্য শক্ত একটি ভিত গড়ে দেওয়া। প্রতিষ্ঠানকে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ পুঁজিবাজার থেকে অর্থ নেওয়া হলে কোম্পানিটি লম্বা সময় কাক্ষিত লক্ষ্যে চলতে পারবে। প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে চলার নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে। এতে কোম্পানিকে প্রতিষ্ঠিত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সঙ্গে থাকলে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে গতি আসবে। এখানে জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি হবে। এতে পারফরম্যান্স আরও ভালো হবে। কোম্পানিকে সব সময়ে এগিয়ে রাখার তাগিদ কাজ করবে। কারণ কোম্পানি খারাপ করলে বিনিয়োগকারীদের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে। পুঁজিবাজারের আকার দিন দিন বাড়ছে। তাই ব্যাংকের ঋণের চেয়ে পুঁজিবাজার থেকে আইপিও’র মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করাই উত্তম বলে মনে করছি। কারণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে সুদসহ পরিশোধ করতে হয়। এক্ষেত্রে যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।


শেয়ারনিউজ : আইপিও পরবর্তী সময়ে আপনাদের শেয়ারধারন সম্পর্কে বলুন?

এম এ মালেক: আমরা বাজারে মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখ শেয়ার ছাড়ছি। আইপিও পরবর্তী সময়ে আমাদের সর্বমোট শেয়ার হবে ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৯২ হাজারটি। আইপিও পরবর্তী সময়ে আমাদের উদ্যেক্তা পরিচালকদের নিকট থাকবে ৪১.৭১শতাংশ বা ১ কোটি ৯১ লাখ ৪২টি শেয়ার, প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিকট থাকবে ১ কোটি ২৮ লাখ ৪ হাজার শেয়ার বা ২৭.৯০ শতাংশ। এছাড়া মিউচ্যুয়াল ফান্ড হোল্ডারদের নিকট ১৫ লাখ, অনিবাসী বাংলাদেশীদের(এনআরবি) নিকট ১৫ লাখ ও সাধারন বিনিয়োগকারীদের নিকট ১ কোটি ৯ লাখ ৪৬ হাজার শেয়ার থাকবে। এর মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে থাকা শেয়ার তিন বছর লক-ইন থাকবে। আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা শেয়ার এক বছর লক-ইন থাকবে।


শেয়ারনিউজ : প্রসপেক্টাসের তথ্য সূত্র বলছে আইপিও পরবর্তী সময়ে আপনাদের ফাইন্যালশিয়াল এক্সপেন্স (আর্থিক ব্যয়) থাকবে না, এর কারন কি?

এম এ মালেক: বিগত বছরগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন লক্ষ্য করলে দেখবেন ব্যবসা পরিচালনায় আমরা নাম মাত্র ব্যাংক লোন নিয়েছি। আইপিও পরবর্তী সময়ে আমরা ব্যাংক লোন পরশোধ করবো। তাই ব্যাংক ঋন সংক্রান্ত ব্যয় আমাদের কমবে। ব্যবসা প্রতিষ্ছানের ব্যয় সংকোচনে এটা ভাল দিক। যে কোনো কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও পণ্যের উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা কষ্টসাধ্য একটি বিষয়। ক্ষেত্রবিশেষে উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্যও পাওয়া যায় না। এজন্য আমরা ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। বেশকিছু কৌশল অবলম্বন করে আমরা ব্যয় কমিয়েও পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি করছি।


শেয়ারনিউজ : কেন বিনিয়োগকারীরা আপনার কোম্পানিতে বিনিয়োগ করবে?

এম এ মালেক : যেকোনো কোম্পানিতে বিনিয়োগের পূর্বে কোম্পানির স্ট্রেংথ, উইকনেস, অপরচ্যুনিটি ও থ্রেট (strengths, weakness, opportunity & threats) সম্পর্কে জানা উচিত, যা SWOT অ্যানালাইসিস নামে পরিচিত। আমাদের কোম্পানির স্ট্রেংথগুলো বিনিয়োগকারীদের জানা জরুরি। আমরা উৎপাদনে সর্বাধুনিক মেশিনারিজ ব্যবহার করছি, স্বল্প খরচে কাঁচামাল আমদানি করি, নিজস্ব জেনারেটর আছে, দক্ষ শ্রমিক ও সকলের জন্যে আয় সংক্রান্ত মুনাফার ব্যবস্থা রয়েছে, শ্রম ব্যয় কম হচ্ছে। এছাড়া করপোরেট গর্ভনেন্স আমরা শতভাগ পরিপালন করছি। উচ্চ সুদের হার ব্যবসার ক্ষতির কারণ হয়।


শেয়ারনিউজ : ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোডের মুনাফাকে কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

এম এ মালেক : আমাদের কোম্পনির উৎপাদিত পন্যের ব্যাপক চাহিদা থাকায় ব্যবসা শুরুর পর থেকে আমরা ইতিবাচক মুনাফা করছি। ২০১২ সালে আমাদের কর পরবর্তী মুনাফা হয়েছে ২৪ লাখ ৪১ হাজার ৯২৫ টাকা। প্রতি বছর আমাদের ব্যবসায়ের পরিধি বেড়েছে, নতুন কাস্টমার বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ জুন ২০১৬ সালে আমাদের রেভিনিউ হয়েছে ৪১ কোটি ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫১২ টাকা। এসময় ব্যবসায়ের সমস্ত ব্যয় ও ট্যাক্স বাদ দিয়ে আমাদের ৬ কোটি ৪২ লাখ ৬ হাজার ৭৬৮ টাকা মুনাফা হয়েছে।

পন্যের গুনগত মান ঠিক রাখায় প্রত্যেক বছর আমাদের ক্রেতা বাড়ছে। যার কারনে বাড়ছে মুনাফা। ২০১৪ সালে আমরা আমাদের। প্রডাকশন ক্যাপাসিটির মাত্র ৩৬ শতাংশ ব্যবহার করেছিলাম। কিন্তু ২০১৬ সমাপ্ত হিসাব বছরে আমরা ক্যাপাসিটির ৮৯.৮৯ শতাংশ ব্যবহার করেছি। উৎপাদন ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার আমাদের ব্যবসা সম্প্রসারনের ইঙ্গিত দিয়েছে।


শেয়ারনিউজ : আপনার কারখানায় কতজন শ্রমিক কাজ করছে, তাদের সম্পর্কে বলেন?

এম এ মালেক : আমাদরে ফ্যাক্টরি ও মূল্য অফিসে প্রায় ২৬০ জন কর্মকর্তা কর্মচারী কাজ করে। যাদের প্রত্যেকের বেতন ৫ হাজার ৯৯২ টাকার বেশি।

আমরা সরকারের শ্রম আইন আইন ২০০৬ -এর ভিত্তি করে ওর্য়াকার প্রফিট প্রাটিসিপেশন ফান্ডের (ডাব্লিউপিপিএফ) অর্থ প্রদান করছি। যা কোম্পনির প্রতি শ্রমিকদের অাস্থা আরো বাড়িয়েছে। এতে এ কোম্পানির সাথে সম্পৃক্ত প্রত্যেকে কোম্পানির উন্নয়নের জন্য নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করছে।


শেয়ারনিউজ : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের কোম্পানির সম্ভাবনা কতটুকু?

এম এ মালেক: বাংলাদেশে এ ধরনের কোম্পানির সম্ভাবনা অনেক ভালো। কারণ বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এখানে প্রতিদিনই নতুনত্ব আসছে, যার জন্য আমাদের উৎপাদিত পন্যের ব্যবহারও বাড়ছে। কিন্তু সেই হিসাবে খাত সেভাবে বিস্তৃত হয়নি। তাই বাজারে আমাদের চাহিদাও বাড়ছে। পণ্যের চাহিদার কারণে এ ব্যবসার প্রতি মানুষের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। অদূর ভবিষ্যতে এ ব্যবসার ক্ষেত্র আরও বাড়বে। এখানে উল্লেখ করার মতো আরেকটি বিষয় হচ্ছে, প্রযুক্তি খাতের পণ্য প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। নতুন নতুন আপডেট আসে। কিন্তু এ খাতের বিষয়টি ভিন্ন।


শেয়ারনিউজ :আমাদের আপনারমূল্যবানসময়দেওয়ারজন্যধন্যবাদ।

এম এ মালেক: আপনাদের ওধন্যবাদ।



শেয়ারনিউজ //