Print
প্রচ্ছদ » অর্থনীতি

আগামী বাজেট হতে পারে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ২০৬ কোটির

ঢাকা, ০৭ নভেম্বর ২০১৭:

জনগণের উপর করের বোঝা না চাপিয়ে আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য বিশাল বাজেট তৈরির প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। বাজেটের সম্ভাব্য আকার নির্ধারণ করা হতে পারে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে এটি হবে এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় বাজেট। ভোট আকর্ষণে এবার কর ও ভ্যাটে বড় ধরনের ছাড় দেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। তবে রাজস্ব আদায়ে করের আওতা বাড়ানো হবে। এ লক্ষ্যে বেশি সংখ্যক মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে কর এবং ভ্যাটের আওতায় এনে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিতে ভ্যাটের হার অপরিবর্তিত থাকছে। দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আগামী বাজেটে বিশেষ পদক্ষেপ থাকবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

জানা গেছে, জনকল্যাণমুখী বাজেট প্রণয়নে আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও বরাবরের মতো ছয় খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে- স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ সার্বিক মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিদ্যুত, জ্বালানি, সড়ক, রেলপথ ও বন্দরসহ ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন ও কর্মসৃজন প্রকল্প, সরকারী সেবা প্রদানে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন, জলবায়ু মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জন এবং বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক সুযোগ অধিকতর ব্যবহার ও প্রবাস আয় বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন রফতানি বাজার অনুসন্ধান।

এই ছয় খাতের ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হলে রূপকল্প-২১ এবং ভিশন-২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন পূরণ সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া আগামী বাজেটে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে তা হচ্ছে- চল্লিশটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জেন্ডার বাজেট রিপোর্ট প্রণয়ন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ও এ সংক্রান্ত নতুন ধারণাপত্র প্রণয়ন এবং শিশু বাজেট ও ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অগ্রযাত্রা হালনাগাদ করা।

পাশাপাশি পদ্মা সেতুসহ ১০ মেগা প্রকল্পের জন্য আগামী বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনে চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে ১০ মেগা প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমডিজি অর্জনের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে দিচ্ছে সরকার। এ কারণে বাজেটে যেসব কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এক অনুষ্ঠানে আগামী বাজেট নিয়ে তার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। ওই সময় তিনি বলেন, আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটের আকার সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা করা হতে পারে। করদাতার সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে সরকার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ীই বাজেটের আকার বাড়িয়ে যেতে পারবে। তিনি বলেন, ৪০ বছর বয়সী করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া দেশের জন্য ভাল লক্ষণ। এছাড়া তরুণরা কর দিতে উৎসাহিত হচ্ছে। কর আদায়কারীরা আরও বেশি করবান্ধব হলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় হবে।

ভ্যাট আইন সংশোধনের বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দেয়া হবে

ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে বহুল আলোচিত ভ্যাট আইন-২০১২ দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশ রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তাই আগামী বাজেটেও ভ্যাট হার চলতি বাজেটের মতো অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। তবে ভ্যাট আইন সংশোধনের বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দেয়া হবে বাজেটে। ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে আইনটি সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আইএমএফের পরামর্শ না নিয়ে বরং বাস্তবতার নিরিখে এদেশের ব্যবসায়ী সমাজের কথা বিবেচনায় নিয়ে আইনটি কার্যকর করতে হবে। এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি মোঃ জসিমউদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, ভ্যাটের বিষয়টির চূড়ান্ত কোন সুরাহা হয়নি। ব্যবসায়ীদের দাবি বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আইনটি দুই বছরের জন্য স্থগিত করেছেন মাত্র। এ কারণে আগামী বাজেটের পর কিভাবে ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে ব্যবসায়ী সমাজের উদ্বেগ রয়েছে। তিনি বলেন, আইনটি কার্যকর করতে হলে এটি আরও যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী হতে হবে। এজন্য আইনটিতে বড় ধরনের সংশোধনী প্রয়োজন। তিনি বলেন, আইনটি কিভাবে কি প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন হবে সেটি নিয়ে এখনই এনবিআরকে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বসা উচিত। একই সঙ্গে যারা বিশেষজ্ঞ রয়েছেন তাদেরও মতামত নেয়া প্রয়োজন। এজন্য সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে এনবিআরকে বসতে হবে। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা সরকারকে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

দারিদ্র্যবিমোচন ও কর্মসংস্থানের বাজেট

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রূপকল্প-২১ সালের মধ্যে অতি দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। গত ২০০৫ সালে দেশে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ, সেখানে ২০১৩ সালে এ সংখ্যা কমে এসেছে ২৬ দশমিক ২ শতাংশে। একই সময়ে অতি দারিদ্র্যের সংখ্যা ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসে। বর্তমান এ হার ২২ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। আগামী ২০২১ সালের পর এই দারিদ্র্য জনগোষ্ঠীর হার ১৩ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার সরকারী উদ্যোগ রয়েছে। মূলত ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর পরিকল্পনা করে দারিদ্র্যবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণের কারণে দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমেছে। একই সঙ্গে দূর হয়েছে বৈষম্যও।

এ প্রসঙ্গে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, গত ২০১০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ দরিদ্রতা কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হয়েছে, যা ২০১৫ সালে করার কথা ছিল। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দরিদ্রতার হার ৩ শতাংশে নামিয়ে আনতে হলে প্রবৃদ্ধির গড় হার ৮ শতাংশের উপরে থাকতে হবে। ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে দরিদ্রতা কমে ০.৯৪ শতাংশ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দরিদ্রতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হলে অগ্রাধিকার নির্ণয়, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের দিকে নজর দিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। এছাড়া আগামী বাজেটে কর্মসংস্থানে বিশেষ পদক্ষেপ থাকবে। এ লক্ষ্যে সরকারী-বেসরকারী খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল নেয়া হচ্ছে।