Print
প্রচ্ছদ » অর্থনীতি

ঝুঁকির মুখে আর্থিক খাতের ২৯ কোম্পানি




ঢাকা, ০২ নভেম্বর ২০১৭:

দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) অনিয়ম-দুর্নীতি ও ব্যবস্থাপনা ত্রুটির কারণে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ খাতের ৩৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩০ জুন ২০১৭ শেষে ২৯টিই সমস্যাগ্রস্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ সময়ে গ্রিন জোন বা নিরাপদ স্থানে রয়েছে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১২টি রেড জোন বা নাজুক পরিস্থিতিতে এবং ১৭টি ইয়েলো জোনে অবস্থান করছে।অথচ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ শেষে রেড জোনে পড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৭। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট ৩০ জুন-২০১৭-তে এ তথ্য উঠে এসেছে।


আর্থিকখাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান বা স্প্রেড কমে যাওয়া, কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতি বৃদ্ধি পাওয়া, প্রত্যাশা অনুযায়ী ঋণ বিতরণ করতে না পারা এবং শেয়ারবাজারে দুর্বল পারফরম্যান্সের কারণেই এনবিএফআই খাতে দুর্বলতা বেড়েছে। তবে গ্রিন জোনে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা ও আর্থিক সক্ষমতা দুটোই বাড়ছে।


বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি তিন মাস পর দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ফিন্যান্সিয়াল অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট তৈরি করে। ওই রিপোর্টের তথ্যমতে, ২০১৫ সাল শেষে ৩২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গ্রিন জোনে ছিল চারটি। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৮টি ইয়েলো ও ১০টি রেড জোনে ছিল।


এরপর ২০১৬ সাল শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সূচকে কিছুটা উন্নতি হয়। তখন গ্রিন জোনে ছিল পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ২১টি প্রতিষ্ঠান ইয়েলো ও সাতটি প্রতিষ্ঠান রেড জোনে ছিল। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানেই ১২টি প্রতিষ্ঠান রেড জোনে চলে গেছে।


উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও আর্থিক স্বাস্থ্য বিবেচনায় গ্রিন, ইয়েলো ও রেড— এ তিন শ্রেণীতে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক।


প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, ঝুঁকি সহনশিলের সক্ষমতার (স্ট্রেস টেস্টিং) ভিত্তিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিন ভাগে চিহ্নিত করা হয়। যারা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে তাদের রেড জোনে রাখা হয়। এসব প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকে। তবে গাহকের স্বার্থে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঝুঁকি কাটিয়ে উঠার জন্য তাদের নাম প্রকাশ করা হয় না।


গত সাত বছরের মধ্যে ২০১৬ সালে সর্বনিম্ন নিট মুনাফা করে দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত। গত বছর দেশের ৩৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান মোট নিট মুনাফা করেছে ৪৭০ কোটি টাকা। অথচ ২০১৫ সালেও ৯৭০ কোটি টাকার নিট মুনাফায় ছিল দেশের এনবিএফআই খাত। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা ৫১ শতাংশের বেশি কমে গেছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা ও মুনাফায় উচ্চপ্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখলেও অন্য কয়েকটি কোম্পানির লোকসানের কারণে পুরো খাতটিই পিছিয়েছে।


ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টের তথ্যমতে, ২০০৯ সালে ৪৩৬কোটি টাকা নিট মুনাফা করে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত। এর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এ খাতের মুনাফা। ২০১০ সালে ৬১০ কোটি, ২০১১ সালে ৭০০ কোটি, ২০১২ সালে ৬১০ কোটি, ২০১৩ সালে ৮০০ কোটি, ২০১৫ সালে ৯৫০ কোটি টাকা নিট মুনাফায় ছিল দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত। এরপর ২০১৫ সালে খাতটি ৯৭০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করলেও ২০১৬ সালে তা ৪৭০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।


২০১০ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ইকুইটির বিপরীতে গড় আয় (আরওই) ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। কিন্তু ছয় বছরের ব্যবধানে ২০১৬ সাল শেষে এ খাতের গড় আরওই ৪ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। তবে জুন ২০১৭ শেষে আরওই হয়েছে ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। একইভাবে ২০১০ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে সম্পদের বিপরীতে আয় (আরওএ) ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬ সালে এ খাতের আওএ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। মার্চ শেষে আরওএ নেমেছে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশে। তবে ৩০ জুন ২০১৭ শেষে আরওএ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ শতাংশে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৬ সাল শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ২ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। অথচ এ সময়ে খাতটিতে ১ হাজার ৯৮০ কোটি টাকার সঞ্চিতি সংরক্ষণ করা হয়েছে। সে হিসাবে ২০১৬ সাল শেষে ৫৪০ কোটি টাকার সঞ্চিতি ঘাটতি রয়েছে। গত বছর শেষে এ খাতের বিতরণকৃত ঋণের ৭ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল খেলাপির খাতায়। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে খেলাপির হার বেড়ে ৮ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মার্চ শেষে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর ৩০ জুন ২০১৭ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ হয়েছে ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা।


২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যরত ছিল ৩৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে তিনটি সরকারি ও ২০টি দেশী বেসরকারি কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাকি ১০টি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাইসেন্স নিয়েছে। চলতি বছরে আরো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ২৩টি বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত। ২০১৬ সালে এর মধ্যে নয়টির মুনাফা কমেছে। এছাড়া পুঁজিবাজারের বাইরে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা খুবই শোচনীয় বলে জানা গেছে।





শেয়ারনিউজ/