Print
প্রচ্ছদ » অর্থনীতি

১০ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ব ২৫ সংস্থার লোকসান ৯৪ হাজার কোটি টাকা




এইচ কে জনি:

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার কথা। কিন্তু আমাদের দেশের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। রাষ্ট্রের উন্নয়নে ভূমিকা তো রাখছেই না, বরং অধিকাংশ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানই এখন রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের পর বছর লোকসানের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান।


অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের হিসেবে, গত ১০ বছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় পরিচালিত ২৫টি প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনেছে ৯৪ হাজার ৩০৪ কোটি টাকারও বেশি। এরমধ্যে ২০১১-১২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ৪৩১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে।

এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ১২ হাজার ২৩৪ কোটি ৪ লাখ টাকা, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ২ হাজার ৯৯৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩৫১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, ২০১০-১১ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৩১১ কোটি ২৫ লাখ টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০ হাজার ৭৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১০ হাজার ৩৭৯ কোটি ৩ লাখ টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৮ হাজার ৬৫০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (৩০ এপ্রিল ২০১৭ পর্যন্ত) ৭ হাজার ৭৬১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা লোকসান গুনেছে।


আলোচ্য সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ব কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারি কোষাগারে লভ্যাংশ জমা দিলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, আমলাতন্ত্রের লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও দুর্নীতির কারণে লোকসানের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। আর এ লোকসানের কারণে ব্যাহত হচ্ছে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন। এ প্রতিষ্ঠানটিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রেখে লাভজনক করা সম্ভব হবে না বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারি মালিকানায় থাকলে সেখানে দুর্নীতি হবে এটা স্বাভাবিক। বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক দেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যবস্থাপনা পরিষদের পরিবর্তন হয়, যে কারণে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা থাকে না। বরং রাজনৈতিক কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি আর লুটপাট শুরু হয়। এতে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারায়, আর শেষ পর্যন্ত সেই লোকসানের দায় রাষ্ট্রকেই বইতে হয়। তারা মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। এ কারণে প্রতিবছর উৎপাদনের তুলনায় অপচয় হচ্ছে বেশি। রাষ্ট্রায়ত্ত এসব প্রতিষ্ঠানে অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করা গেলে সংস্থাগুলোকে লাভজনক করা সম্ভব। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, রাষ্ট্রায়ত্ব এ সংস্থাগুলো চরম অব্যবস্থাপনা, নজরদারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতির রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতির কারণে লোকসানের বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসতে পারছে না। বছরের পর বছর ধরে লোকসানের থাকার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর রাষ্ট্রীয় মালিকানা ছেড়ে দেয়ার দাবি উঠছে। বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হলে সরকারকে আর লোকসানের বোঝা বইতে হবে না।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানাভাবে লাভজনক করার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেশি দায়ী। তিনি বলেন, অতীতের তুলনায় ঋণ ও ভর্তুকি কিছুটা কমেছে। তবে এটা আরো কমা উচিত। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো সেক্টর সরকারি মালিকানায় থাকলে তাতে দুর্নীতি হবে- এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো গনতান্ত্রিক দেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ব্যবস্থাপনা পরিষদের পরিবর্তন হয়ে থাকে। এতে করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে না। শুরু হয় দূর্নীতি আর লুটপাট। এতে করে সরকার বড় অংকের রাজস্ব হাঁরায় তো বটেই। পাশাপাশি সে প্রতিষ্ঠানের লোকসানের বোঝা সরকারকেই বহন করতে হয়। যার পরিণতিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা খাতে এবং দেশের কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় না।


তারা বলেন, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার কথা, সেখানে উল্টো এদের ঘাটতি পূরনে বাজেটে বিশাল অংকের বরাদ্দ রাখতে হয়। এছাড়া তাদের কাছে এ বিশাল পরিমাণ অর্থ আটকে থাকায় ব্যাংকগুলোতেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। পরিণতিতে দেশের অতীব গুরুত্বপূর্ন খাতের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যহত হয়। কাজেই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নসহ সকল দিক বিবেচনা করে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেয়ার পক্ষে মত দেন তারা।




শেয়ারনিউজ/ঢাকা, ০১ জুলাই ২০১৭