ঢাকা, জানুয়ারি ২৯: পুঁজিবাজারের লেনদেন খরা ও চলমান অস্থিতিশীল অবস্থার কারণ খুঁজতে সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকের মাধ্যমে ডিএসই সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সমাধানের কিছু উপায়ও বের করেছে। সোমবার ডিএসইতে বাজার স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত বিশেষ বৈঠকে ডিএসই’র পক্ষ থেকে লিখিতভাবে এ উপায়গুলো উপস্থাপন করা হয়। বৈঠক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বৈঠকে বাজার স্থিতিশীল করতে ডিএসই’র দেয়া লিখিত প্রস্তাবগুলো শেয়ারনিউজ২৪ডটকমের পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো।
লিখিত প্রস্তাবে ডিএসইর প্রেসিডেন্ট রকিবুর রহমান জানান, ডিসেম্বর ২০১২ তারিখ পর্যন্ত ২ হাজার জন বিনিয়োগকারীর কাছে মার্জিন লোন রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা।
মন্দা বাজারের কারণে তারা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের শেয়ার নিয়মানুযায়ী ফোর্স সেল করা হলে লোনের ২৫ শতাংশ টাকা ফেরৎ আসবে না। অর্থাৎ এতে একটি বিষয় ষ্পষ্ট যে, মার্জিন ঋণ গ্রহণকারীরা নেগেটিভ ডিপোজিটে রয়েছেন।
এমতাবস্থায় বাজারের পরবর্তী নিম্নমুখীতা ঠেকাতে স্টক ব্রোকার এবং মার্চেন্ট ব্যাংক কর্তৃক ফোর্স সেল স্থগিত রাখা জরুরি। যাতে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরো বাড়ানো যায়।
যেহেতু মার্জিন ঋণ গ্রহীতারা বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং বর্তমান বাজারে মার্জিন রুল বিধিমালা ১৯৯৯ এর ৩ (৫) উপধারা অনুযায়ীবিনিয়োগকারীরা লেনদেন করতে পারছেন না। এজন্য ৪টি বিষয় বিবেচনা করলে তা বাজার স্থিতিশীল করতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে ডিএসই। বিষয়গুলো হলো-
১. যেসব বিনিয়োগকারীর পোর্টফলিও নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে মার্চেন্ট ব্যাংক এবং স্টক ব্রোকারদের ডিসক্রিশনারী সক্ষমতায় তাদের পোর্টফলিও পুর্ণগঠন অথবা পুণবির্ন্যাস করা।
২. ডিসক্রিশনারী একাউন্টের অধীনে স্টক ব্রোকার/মার্চেন্ট ব্যাংক মার্জিন ঋণগ্রস্ত (যাদের ইক্যুইটি মাইনাস) বিনিয়োগকারীদের হিসাব পরিচালনা করবে। তবে যে কোনো করপোরেট ঘোষণা যেমন ক্যাশ ডিভিডেন্ড, স্টক ডিভিডেন্ড, রাইট শেয়ার ইস্যু, রিপিট পাবলিক অফার ইত্যাদি বিনিয়োগকারীর অনুকূলে যাবে।
৩. বিনিয়োগকারীর পোর্টফলিও পুর্ণগঠন অথবা পুণবির্ন্যাসের পর মার্জিন লোনের ১৩৫ শতাংশ আদায়যোগ্য না হওয়া পর্যন্ত মার্জিন রুল বিধিমালা ১৯৯৯ এর ৩ (৫) উপধারা স্থগিত রাখা যেতে পারে।
৪. ডিসক্রিশনারী একাউন্ট পরিচালনাকালীন বিনিয়োগকারীর পোর্টফলিওতে মূলধনের পরিমান ডেবিট ব্যালন্সের (মার্জিন লোন) ১৩৫ শতাংশের উপরে না উঠা পর্যন্ত স্টক ব্রোকার/মার্চেন্ট ব্যাংক কিংবা বিনিয়োগকারী কেউই সিকিউরিটিজ বিক্রি করে টাকা উত্তোলন করতে পারবেন না।
তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ভূমিকা:
লিখিত প্রস্তাবে বলা হয়- উন্নত কার্যক্রমের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। তালিকাভূক্ত কোম্পানিগুলো যেসব দায়িত্বপালনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে তা হলো-
১. উন্নত মানের আর্থিক প্রতিবেদন তৈরীর মাধ্যমে। ২. আর্ন্তজাতিক একাউন্টিং স্টান্ডার্ড অনুসরণের মাধ্যমে। ৩. সঠিকভাবে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে। ৪. সিকিউরিটিজ সংক্রান্ত নিয়মকানুন যথাযথ পরিপালনের মাধ্যমে। ৫. করপোরেট গাইডলাইন্স যথাযথ পরিপালনের মাধ্যমে। ৬. কোম্পানির উন্নয়নে অধিকতর গুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমে। ৭. কোম্পানিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ৮. লিস্টিং রেগুলেশন যথাযথ পরিপালনের মাধ্যমে। ৯. কোম্পানিতে পেশাদার লোকবল নিয়োগের মাধ্যমে। ১০. বিনিয়োগকারীদের সন্মান ও তাদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার মাধ্যমে।
লিখিত প্রস্তাবে বলা হয়, বেশিরভাগ কোম্পানি আইপিও, আরপিও, প্রেফারেন্স শেয়ার, কোম্পানি একীভূতকরণ, লোন কনভারসেশন, রাইট অফার ইত্যাদির মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করেছে। ২০০৯ সালের পর থেকে মূলধন সংগ্রহে প্রিমিয়ামও নেয়া হয়েছে। এমতাবস্থায় আর্থিক প্রতিবেদনে সংগৃহীত মূলধনের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে কোম্পানির উন্নয়ন সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরা জরুরি। পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতায় সংগৃহীত ফান্ডের যথাযথ ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।
এতে আরো বলা হয়, তালিকাভুক্তির পর কতিপয় কোম্পানি ক্রমাগত আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু একই গ্রুপের বা একই উদ্যোক্তা পরিচালকের অন্য কোম্পানি আর্থিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে। এ ধরণের কর্মকান্ড বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশার জন্ম দেয়। তাই পুঁজিবাজারের বৃহত্তর স্বার্থে এ ধরণের কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির উপর গুরুত্ব দেয়া জরুরি।
পাশাপশি উদ্যোক্তা পরিচালকরা তাদের শেয়ারের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে।
বাজারের স্থিতিশীলতায় ডিএসই এবং বিএসইসির ভূমিকাঃ
১. মনিটরিং অ্যান্ড সার্ভিল্যান্স জোরদার। ২. সিকিউরিটিজ সংক্রান্ত নিয়মনীতি পালনে কঠোরতা আরোপ। ৩. আইপিও অনুমোদন প্রদানের পূর্বে কোম্পানির প্রসপেক্টাস ভালোভাবে যাচাই। ৪. লিস্টিং চুক্তির শর্ত পরিপালনের কঠোরতা আরোপের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা। ৫. কোম্পানির একাউন্টিং স্টান্ডার্ড যাচাই। ৬. করপোরেট গর্ভনেন্স গাইডলাইন পরিপালনে নজরদারি বৃদ্ধি। ৭. কোম্পানির নিজ্স্ব সক্রিয় ওয়েবসাইটে বিনিয়োগকারীদের তথ্য সংযোজন নিশ্চিতকরণ। ৮. আর্থিক প্রতিবেদন পুর্ণমূল্যায়ন। ৯. বিএসইসি কর্তৃক ড্রাফট প্রসপেক্টাস পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই।
ডিএসইর ভূমিকা:
১. স্টক ব্রোকার এবং স্টক ডিলারদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় নজরদারি বৃদ্ধি। ২. ডিএসই ম্যানেজমেন্টের অধিক পেশাদারী ভূমিকা পালন এবং স্বাধীনভাবে কাজ করা। ৩. সিকিউরিটিজ সংক্রান্ত নিয়মকানুন যথাযথ পরিপালনে নজরদারি। ৪. রিসার্চ, প্রকাশনা এবং সিজিএফআরসি কার্যক্রম বৃদ্ধি।
অন্যান্যদের ভূমিকা-
১. বাজারবান্ধব মূদ্রানীতি প্রণয়নের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সহযোগীতা এবং বাজারের স্থিতিশীলতায় বাজারবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। ২. বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর যথাযথ ভূমিকা পালন। ৩. অর্থমন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক ভূমিকা পালন।
স্টক ব্রোকারদের পক্ষ থেকে একটি ইনভেস্টমেন্ট কমিটি (আইসি) গঠিন করা যেতে পারে। কমিটি বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে ক্লিয়ার ধারণা দেবে বিনিয়োগকারীদের।
স্টক এক্সচেঞ্জ সদস্যদের জন্য ব্যাংক লোনে শিথীলতা আরোপ:
লিখিত প্রস্তাবনায় বলা হয়, স্টক ডিলাররা যেহেতু বাজারের উন্নয়নে কাজ করে সেহেতেু তাদের তারল্য সংকট নিরসনে লোন সুবিধা বাড়ানো যেতে পারে।
স্টক ডিলারদের সক্ষমতা বাড়াতে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংক ঋণের সীমা বৃদ্ধিরও আহ্বান জানানো হয়।
ডিএসই মনে করে, স্টক ডিলাররা পুঁজিবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা কমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের (ডিওএস) ১৫ জুন ২০১০ তারিখের ০৪ নং সার্কুলারের ৩(১) (ঙ) নং ধারা অনুযায়ী ব্যাংক থেকে স্টক ডিলারদের জন্য ১ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার (‘এ’ এবং ‘বি’ ক্যাটাগরির শেয়ার/ডিবেঞ্চার লেনদেনের ক্ষেত্রে) যে বিধান রয়েছে তা পরিবর্তন করে ঋণসীমা ২০ কোটি টাকায় উন্নীত করা উচিত। এতে করে স্টক ডিলারদের সক্ষমতা বেড়ে যাবে এবং এসব প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান বাজার পরিস্থিতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে।
এতে আরো বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেহেতু বিভিন্ন উন্নয়নমুলক খাতে যেমন এসএমই, পাট খাত, কৃষি খাত ইত্যাদিতে শিথীল শর্তে লোন দেয় সেহেতু পুঁজিবাজারের স্বার্থে ব্রোকারেজ হাউজ এবং মার্কেট মেকারদের লোন দেয়া যেতে পারে বলে ডিএসই মনে করে।
ব্যাংকের বিনিয়োগের বিষয়ে বলা হয়, পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ মূলধনের ৪০ শতাংশ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ দেখা দিয়েছে। কারণ, টায়ার-১ অনুযায়ী ক্যাপিটাল মানে কোর ক্যাপিটাল আবার টায়ার-২ অনুযায়ী তা সাপ্লিমেন্টারি ক্যাপিটাল। সুতরাং এ বিষয়টি পরিস্কার করা দরকার।
বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে পরিস্কার করা দরকার বলে ডিএসই মনে করে। এবং ক্যাপিটাল বলতে টায়ার-১ ও টায়ার-২ অনুযায়ী টোটাল মূলধন হওয়া উচিত। সে অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ৪০ শতাংশ হওয়া উচিত।
মার্চেন্ট ব্যাংক এবং ব্রোকারেজ হাউজগুলোকে প্যারেন্ট কোম্পানিগুলোর ঋণ প্রদানের দাবি জানিয়ে বলা হয়, বাজারের নাজুক মুহূর্তে সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোকে ঋণ প্রদান করা জরুরি বলে ডিএসই মনে করে। কারণ, বাজারের দুর্দিনে এসব প্রতিষ্ঠান যথাযথ সার্পোট দেয়। এমতাবস্থায় এসব কোম্পানির অর্থ সংকট পড়লে তা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে না রেখে অতিরিক্ত ঋণ দেয়া জরুরি। এছাড়া বাজার ঘুরে না দাঁড়ানো পর্যন্ত লোনের টাকা ফেরৎ নেয়ার ব্যাপারে প্যারেন্ট কোম্পানিগুলোর অপেক্ষা করা দরকার।
বাজারের নাজুক মুহূর্তে অতিরিক্ত লোনের টাকা এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ হিসাবে বিবেচনা করার কথাও বলা হয় ডিএসইর পক্ষ থেকে। আর অপেক্ষাকৃত কম সুদ হারে এসব প্রতিষ্ঠানকে প্যারেন্ট কোম্পানিগুলো লোন দেয়া উচিত বলে ডিএসই মনে করে।
স্টক ডিলার, স্টক ব্রোকার ও অনুমোদিত বিধিমালা, ২০০০ এর বিধি ৪ (আ) অনুযায়ী প্রত্যেক স্টক ডিলার এবং স্টক ব্রোকারের পরিশোধিত মূলধনের অন্তত: অর্ধেক সার্বক্ষণিক নীট সম্পদ থাকতে হবে। সম্প্রতি এনবিএল সিকিউরিটিজ চলতি অর্থ বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে ২০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ আমলে নেয়ার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে আবেদন করে। আবেদনের একটি অনুলিপি ডিএসইতেও প্রেরণ করা হয়। যার উদাহরণ তুলে ধরে ডিএসইর পক্ষ বলা হয়, বর্তমানে এনবিএল সিকিউরিটিজের নেগেটিভ ইক্যুইটি ১২৫ কোটি টাকা। যেখানে প্রতিষ্ঠানটির মোট ইক্যুইটি ১০০ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এমতাবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি নিয়মানুযায়ী ৫০ শতাংশ প্রভিশন রাখতে পারছে না। এমতাবস্থায় মার্চেন্ট ব্যাংকের মার্জিন লোনের টাকা মার্চেন্ট ব্যাংকের ইক্যুইটিতে রূপান্তরের পক্ষে ডিএসই।